ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দুই মাসে গড়াতে চলল। এরই মধ্যে এক দফার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির মধ্যে একবার আলোচনার টেবিলেও বসেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যস্থতায় ছিল পাকিস্তান। কিন্তু সে আলোচনা ফলপ্রসূ তো হয়ইনি, বরং যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ শুরু করেছে। অপরদিকে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইরান হরমুজ বন্ধ করেছে। দ্বিতীয় দফার আলোচনা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কেন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারছে না।
এই প্রশ্নের উত্তর যদিও সোজাসাপ্টা দুই পক্ষের শর্তাবলিতে পাওয়া যায়। তারপরও পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ, ইসরায়েল। তবে প্রধানতম কারণ খোদ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে মূলত উভয় পক্ষই বিপরীত পক্ষকে দুর্বল ভাবতে শুরু করেছে। ফলে তারা কেউই ছাড় দিতে চাইছে না।
ইরানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই শক্তি দেখাতে গিয়ে প্রকটভাবে মার্কিন মিত্রদের নিষ্ক্রিয়তা ও দূরে সরে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। গোটা ইউরোপ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে নেই। বরং তারা যুদ্ধের প্রভাব থেকে নিজেদের বাঁচাতে ইরানের সঙ্গে ভিন্ন চ্যানেলে কাজ করার চেষ্টা করেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বে মার্কিন মিত্ররাও খানিকটা দুই নৌকায় পা দিয়ে আছে। তারা জোর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও কথা বলছে না, আবার ইরানের বিরুদ্ধেও দাঁড়াচ্ছে না। বরং যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান যখন উপর্যুপরি প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাচ্ছিল, তখন তারা বলেছে, ইরানে হামলার জন্য তাদের মাটি তারা ব্যবহার করতে দেবে না। সৌদি আরবসহ এই দেশগুলো মূলত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেদের বাঁচাতেই বেশি মনোযোগী।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, চীন ও রাশিয়া নীরবতা পালন করলেও তারা ভেতরে ভেতরে ইরানকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য যুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়াই লাভজনক। তেলের দাম বাড়লে রাশিয়ার অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যত কোণঠাসা হবে, আন্তর্জাতিক বাজার তত চীনের দখলে যাবে।
এদিকে ইসরায়েল কখনোই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চুক্তি মেনে নেবে না। কারণ, এই দুই বৈরী দেশ কোনো চুক্তিতে গেলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে দেশটি, সেটা হলো ইসরায়েল। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের ‘গায়ের জোর’ দেখানোর প্রবণতা কমে যাবে। ইরান অর্থনীতি ও সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে তারা হয়তো ভবিষ্যতে ইসরায়েলের দখল করা এলাকাগুলো উদ্ধারে তৎপর হবে। সরাসরি সংঘাতে না জড়ালেও ওই অঞ্চলে ইসরায়েলবিরোধী বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তেহরানের মদদ পাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র ইসরায়েলও শান্তি উদ্যোগে নেই।
ফলে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একা হয়ে পড়েছে। এদিকে প্রচণ্ড মার খেলেও ইরান এই দুই মাসে দেখিয়ে দিয়েছে, তারা ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। বরং যত বেশি তারা মার খাবে, তত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও ও মার্কিন মিত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরানের হামলায় এরই মধ্যে ওই অঞ্চল থেকে তেল-গ্যাসের সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার মাশুল গুনতে হচ্ছে গোটা বিশ্বকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির টুঁটি তারা চেপে ধরতে পারে।
এসব কারণে ইরান এখন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ভাবার অবস্থানে চলে গেছে। আর এই অবস্থান থেকে নমনীয়তা প্রদর্শনের মানসিকতা না থাকাই স্বাভাবিক। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ব্যাপক হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছে, তাদের পাশে কেউ না থাকলেও সামরিক শক্তিতে তারা এক নম্বরেই রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও ছাড় দিতে নারাজ।
কিন্তু দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে বিশ্ব এক জটিল সমস্যায় পড়ে গেছে। অর্থনীতি খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশ্বের প্রতিটা কোনায় ছড়িয়ে পড়েছে এই যুদ্ধের প্রভাব। যত দিন যাচ্ছে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জীবন তত কঠিন হচ্ছে যুদ্ধের কারণে। ফলে সবাই এখন মনেপ্রাণে চাইছে, দুই পক্ষের মধ্যে জমাট বাঁধা বরফ গলে যাক দ্রুত, শান্তিচুক্তিতে গিয়ে তারা শান্ত হোক।
শান্তির উদ্যোগ যে থেমে নেই, তা-ও না। অনড় দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পাকিস্তান বেশ ঘাম ঝরাচ্ছে। পেছন থেকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে উভয় পক্ষের মিত্ররাও। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দাবিটিই ইরান পূরণ করতে নারাজ। পারমাণবিক কর্মসূচি তারা বাদ দেবে না। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান সম্ভবত অনুধাবন করেছে, হরমুজ প্রণালিতে আসলেই তারা বড় একটি পক্ষ। ফলে অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতি এত বছর ধরে ইরান স্বীকার করে এসেছে, তা তারা হরমুজে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে পুষিয়ে নিতে চাইবে। ফলে যত দিন গড়াচ্ছে, তত ইরানের দাবি বড় হচ্ছে, জোরালো হচ্ছে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগায় কিছুটা নাজুক অবস্থানে চলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজের দেশেই বিক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন। কারণ, তাঁর দেশের মানুষও তো শান্তিতে নেই। তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদেরও দৈনন্দিন জীবন কঠিনতর হয়ে উঠছে। আবার হুট করে সব গুটিয়ে বিদায় নেওয়াও যুক্তরাষ্ট্রের ধাঁতে নেই। সাড়ম্বরে যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়েছে, সেখান থেকে ‘লেজ গুটিয়ে পালানো’র অর্থ মার্কিন মোড়লগিরির সমাধি রচনা। ফলে ইসরায়েলের উসকানিতে হোক কিংবা নিজ তাগিদে, যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জড়িয়ে কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছে। ‘আমেরিকাকে মহান’ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প দিনে দিনে হয়ে উঠছেন ‘খলনায়ক’।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কি যুদ্ধ বন্ধ হবে না, দুই পক্ষ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। সে ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। ইরানকে হয়তো তার উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক কর্মসূচির দৃশ্যমান লাগাম টানতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্ব মেনে নিতে হবে। মোটা দাগে দুই পক্ষ এই দুই শর্তে রাজি হলেই শান্তিচুক্তির পথ অনেকটা প্রশস্ত হবে।
কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ইসরায়েল এই সংকটের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। তাদের উসকানিতেই যুক্তরাষ্ট্র এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। কাজেই ইসরায়েল যে সহজে এই শান্তিচুক্তি হতে দেবে, তা ভাবার কোনো উপায় নেই। এরই মধ্যে আমরা একবার দেখেছি, যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি বাহিনী কীভাবে লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। উদ্দেশ্য সম্ভবত দুটি ছিল—লেবাননের কিছু এলাকা দখল করে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করা, যার ফলে হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর জন্য হুটহাট ইসরায়েলে রকেট ছোড়া কঠিন হয়ে পড়ে; আর দ্বিতীয়টি হলো, যেভাবেই হোক যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দেওয়া। তারা কিন্তু সফলও হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের চাপে ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে ইরানের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার সুযোগ পেয়েছে। এখন দেখতে হবে, এই যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে হাঁটে। তারা যদি আবারও সংঘাতে জড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে, গোটা বিশ্বে বিপর্যয় নেমে আসার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
লেখক: উপ বার্তা সম্পাদক আজকের পত্রিকা