বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা যখনই মানোন্নয়নের কথা বলি, তখন পাঠ্যক্রম, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য প্রায়ই আড়ালে থেকে যায় যে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান শেষ পর্যন্ত অনেকটাই নির্ভর করে সেখানে কারা শিক্ষক হচ্ছেন এবং কার হাতে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যাচ্ছে তার ওপর। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগে সামান্য ভুলের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর বছরের পর বছর ধরে তার প্রভাব থেকে যেতে পারে।
এ কারণেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কাছ থেকে আবার ম্যানেজিং কমিটির কাছে কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবকে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত বাংলাদেশের শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থা কোন দিকে যাবে—মেধা ও প্রতিযোগিতার দিকে, নাকি স্থানীয় প্রভাবনির্ভর ব্যবস্থার দিকে, সেই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এনটিআরসিএ-সংক্রান্ত এক সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ্যে আসার পর বিতর্কটি জোরালো হয়। সেখানে ২০০৫ সালের আইন অনুযায়ী, এনটিআরসিএকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে সীমাবদ্ধ রেখে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিয়ে মতামত উঠে আসে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। সরকার এখনো ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দর করার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে; ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এই বক্তব্য আশাব্যঞ্জক।
কারণ, নীতিনির্ধারণের আগে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। কেন এনটিআরসিএ-ভিত্তিক নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ? একসময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। নিবন্ধন সনদ থাকলেও একজন প্রার্থীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পৃথকভাবে আবেদন করতে হতো এবং শেষ পর্যন্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় কমিটির সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। এই ধরনের ব্যবস্থায় স্থানীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক তদবির, স্বজনপ্রীতি কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠার সুযোগ ছিল।
একজন শিক্ষক যখন যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে নিয়োগ পান, ক্ষতিটা শুধু একজন চাকরিপ্রার্থীর হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী। এই কারণেই একটি কেন্দ্রীয়, প্রতিযোগিতামূলক ও পরীক্ষাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এত বেশি। স্থানীয় কমিটি বা রাজনৈতিক প্রভাব নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করলে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত, অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়তে পারে—এ উদ্বেগটি মোটেই অমূলক নয়।
বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পর্যায়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএর পরীক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। অন্যদিকে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের মতো পদে নিয়োগও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং লিখিত পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি মাঝপথে পরিবর্তন করা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, তাঁরা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর ওপর আস্থা রেখেই পরীক্ষা দিয়েছেন। নিয়োগের নিয়ম বারবার পরিবর্তিত হলে শুধু প্রার্থীদের আস্থা নয়, পুরো নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সহকারী শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা যেমন প্রয়োজন, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগে তার প্রয়োজন আরও বেশি। একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধান শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন। তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক পরিবেশ, পরীক্ষার মান, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই প্রভাবিত হয়। একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও অদক্ষ বা পক্ষপাতদুষ্ট নেতৃত্ব পুরো পরিবেশকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এনটিআরসিএর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অর্থ এই নয় যে বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা নেই। দীর্ঘসূত্রতা, শূন্য পদের তথ্য হালনাগাদে সমস্যা, সুপারিশ পাওয়ার পর যোগদানসংক্রান্ত জটিলতা, দূরবর্তী এলাকায় নিয়োগ এবং প্রার্থীর পছন্দের সঙ্গে কর্মস্থলের অসামঞ্জস্য—এ ধরনের বাস্তব সমস্যা রয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি হলো, নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর কাছে থাকবে, না ম্যানেজিং কমিটির কাছে থাকবে—বিষয়টি এত সরল হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে এনটিআরসিএভিত্তিক নিয়োগকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ, মানবিক ও কার্যকর করা যায়। প্রথমত, শূন্য পদের তথ্য সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে কতটি পদ নেই? অথচ অনলাইনে শূন্য দেখানো, কিংবা পদ থাকা সত্ত্বেও তথ্য না পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগ ও বদলি সফটওয়্যারভিত্তিক হলে ব্যক্তিগত তদবির কমানোর পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পদায়নও সম্ভব।
শিক্ষক নিয়োগকে অনেক সময় চাকরিপ্রার্থীদের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি তারচেয়ে অনেক বড়। আজ যিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন, আগামী ২০ বা ৩০ বছর ধরে তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পড়াবেন। আর যিনি প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ হবেন, তাঁর সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব অসংখ্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একজন প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী তরুণও শুধু নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষক হতে পারবেন; তাঁকে কোনো নেতা, কমিটির সদস্য কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে যেতে হবে না। একইভাবে কোনো প্রভাবশালী পরিবারের অপেক্ষাকৃত অযোগ্য প্রার্থীও শুধু পরিচয়ের কারণে একজন মেধাবী প্রার্থীকে পেছনে ফেলতে পারবেন না। মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার বাস্তব পরীক্ষা এখানেই। এনটিআরসিএর বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলে তার সংস্কার করতে হবে।
কিন্তু সমস্যার সমাধান হিসেবে এমন একটি ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না, যেখানে নিয়োগের ওপর স্থানীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। সাম্প্রতিক বিতর্কের ইতিবাচক দিক হলো, সরকার জানিয়েছে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করার।
প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক—সব ক্ষেত্রেই নীতিটি হওয়া উচিত পরিষ্কার: পরীক্ষা হবে প্রতিযোগিতামূলক, মূল্যায়ন হবে নিরপেক্ষ এবং নিয়োগ হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। শিক্ষা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের জন্য স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক পরীক্ষানির্ভর নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এনটিআরসিএকে দুর্বল করা নয়; প্রয়োজন আরও স্বাধীন, আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা। শিক্ষক নিয়োগে আমাদের পথ হওয়া উচিত সামনে যাওয়ার, কোনোভাবেই পেছনে ফেরার জন্য নয়।
ড. মো. শফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়