গ্যাস নগরজীবনের এমন এক অপরিহার্য জ্বালানি, যার ওপর নির্ভর করে একটি পরিবারের রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা ও গণপরিবহনের বড় একটি অংশ। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ক্রমেই দুর্বিষহ করে তুলছে। কোথাও চুলায় আগুন জ্বলছে না, কোথাও দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। ফলে একটি মৌলিক নাগরিক সেবা পরিণত হচ্ছে নিত্যদিনের ভোগান্তির কারণ।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ পরিবারগুলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নার প্রস্তুতি নিলেও চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের সময়মতো বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি পরিবারের সকালের স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেখানে গ্যাসের অপেক্ষাতেই চলে যাচ্ছে মূল্যবান সময়।
গ্যাস-সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবহনব্যবস্থাও। জ্বালানিনির্ভর যানবাহন যখন তেল বা গ্যাসের সংকটের মধ্যে পড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো নগরজীবনে। যানবাহনের সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং দীর্ঘ অপেক্ষা, সব মিলিয়ে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
পাশাপাশি গ্যাস-সংকট শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে। গ্যাসের কারণে অনেক শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই করতে হচ্ছে।
উৎপাদন ব্যাহত হলে বাড়ে খরচ, কমে উৎপাদনশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে পণ্যের দামেও। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট কেবল একটি জ্বালানিসংকট নয়। এটি ধীরে ধীরে অর্থনীতি ও জনজীবনের নানা স্তরে প্রভাব বিস্তার করে।
প্রশ্ন হলো, একটি দেশে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এমন দীর্ঘস্থায়ী অসামঞ্জস্য কেন তৈরি হচ্ছে? গ্যাসের উৎপাদন, আমদানি, বিতরণব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ, অপচয় ও বিতরণব্যবস্থার অনিয়ম বন্ধ করাও প্রয়োজন। শুধু সংকট দেখা দিলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হতে পারে কার্যকর সমাধানের পথ। এলএনজি টার্মিনাল ঠিক হওয়ায় কিছুটা দুর্ভোগ কমলেও, ঘটতির তুলনায় তা খুব নগণ্য।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান করতে দুই বছর প্রয়োজন। তাঁরা সাময়িক সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটছেন। তাঁরা গ্যাস থেকে বের হয়ে এসে জ্বালানি খাতকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নিয়ে যেতে চান। আর পরবর্তী তিন-চার বছরের তার উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি টার্মিনাল বৃদ্ধি করা, যেন বাইরে থেকে আসা গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকদেরকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে?
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের ঘরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চুলা জ্বলবে, মানুষ স্বাভাবিকভাবে কর্মস্থলে যেতে পারবে এবং শিল্প-কারখানা নির্বিঘ্নে চলবে। এগুলোও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তাই গ্যাস-সংকটকে আর নিছক সাময়িক দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চুলা থেকে চাকা—জনজীবনের প্রতিটি স্তরে গ্যাসের প্রভাব রয়েছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, গ্যাসের সংকট যত দীর্ঘ হবে, মানুষের ভোগান্তির পরিধিও তত বিস্তৃত হবে।