হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সাম্য প্রতিষ্ঠায় শিক্ষা সংস্কার

সাধারণ জনগণের বিবেচনায় যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা পথ হারিয়ে ফেলে, মানসম্মত হয় না, সেই দেশে যেকোনো উচ্চশিক্ষা কতটা মানসম্মত হতে পারে তা লাখ টাকার প্রশ্ন। দেশে প্রচলিত বহুধারার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিত্তবানদের সন্তানদের জন্য রয়েছে আলাদা ও অধিক সুযোগসমৃদ্ধ শিক্ষার ব্যবস্থা। সাধারণ জনগণের সন্তানদের সেই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে।

এম আর খায়রুল উমাম

সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে ২৬৬ দিনের জীবনপণ যুদ্ধের ফলাফল আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ দেশের সাধারণ মানুষের, কারণ আমজনতার স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এ পর্যন্ত যাঁরা নিয়েছেন তাঁদের কারোই জনতার সে স্বপ্নের কথা মনে থাকেনি একেবারেই। আসলে এই দায়িত্বপ্রাপ্তরা সব সময় নিজেদের স্বপ্নপূরণ নিয়ে এতটাই বিভোর ছিলেন যে আমজনতার স্বপ্ন পূরণের জন্য সামান্য সময়ও তাঁরা বরাদ্দ রাখতে পারেননি। ফলে সাম্যের সমাজ সৃষ্টির ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেশে একটা অভিজাত সমাজ সৃষ্টি হয়েছে। এবং সেই অভিজাত সমাজে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করতে ক্ষমতাবানদের মধ্যে একটা দৃশ্যমান প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েই চলছে। এ মানুষগুলো ন্যায়-অন্যায় বোধ হারিয়ে ছুটে চলেছে। জীবনের অর্জনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে। পরিবার থেকে কোনো বাধা আসলে একাই এগিয়ে যেতে পিছপা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের কঠোর ত্যাগ-তিতিক্ষাকে পাশে সরিয়ে রেখে ক্ষমতাসীনদের এমন পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান আজ খুবই জরুরি।

দেশের একজন সাধারণ সচেতন মানুষ হিসেবে একটা কথা বলতেই পারি—এই যে মাটি, মানুষকে ভুলে শুধু ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া, এর প্রধান কারণ দেশের অপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা। সত্যি বলতে কি, শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্তরা যে যখন যে স্বপ্ন দেখেছে সেটাই বাস্তবায়নে তাঁরা মরিয়া হয়ে পড়েছেন। ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা, শিক্ষার্থী-অভিভাবক, দেশ-জাতি কোনোটাই তাঁরা বিবেচনায় নিয়েছেন বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এমন কোনো সরকার পাওয়া যাবে না, যারা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি। একের পর এক কমিশন এসেছে, প্রতিবেদন দিয়েছে, সুপারিশ করেছে; কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংকট খুব একটা কাটেনি। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর ২০১০ সালে একটি জাতীয় শিক্ষানীতি পায় দেশ। কিন্তু দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো আমলাদের সময়ই হয়নি শিক্ষাবিদেরা কী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছেন, তা দেখার। নীতির অন্তর্নিহিত দর্শন ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও পরিকল্পনার বদলে দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ গ্রহণের দিকেই যেন তাদের আগ্রহ দেখা গিয়েছে বারবার। তাই তো শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে না হতেই এ নীতি বাস্তবায়নে সরকার কতটা আন্তরিক তার প্রকাশ ঘটানো হলো সংসদে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ পাস এবং ১০টা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবার ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

অথচ শিক্ষানীতি অনুমোদনের পর বাস্তবায়নের যে রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তা যে আজ পর্যন্ত খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি, সে ব্যাপারে সাধারণ জনগণের কোনো সন্দেহ নেই। তাই এই শিক্ষানীতি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশ ও জাতির মুক্তি আসত—এমন দাবি করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। বরং বলা যায়, সময়ের প্রয়োজনে বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষানীতিকে পরিমার্জন ও যুগোপযোগী করা গেলে মানসম্মত শিক্ষা, জনশক্তির উন্নয়ন এবং মানবধর্মী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারত। সেই সুযোগ আমরা কতটা কাজে লাগাতে পেরেছি, সেটিই এখন বড় জিজ্ঞাসা।

আমাদের এই ছোট দেশটা বিপুলসংখ্যক জনভারে ন্যুব্জ। ক্ষমতাসীনেরা জনসংখ্যাকে জনশক্তি রূপে দেখে যেমন তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়নি, ঠিক তেমনই এ বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের কোনো ব্যবস্থাও গড়ে তোলেনি। এই জনগণ দেশের অভিজাত শ্রেণির জন্য ওপরে ওঠার মই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠী রোদে পুড়ে ফসল উৎপাদন করেছে, শিল্পে ঘাম ঝরিয়েছে, বিদেশে শ্রম বিক্রি করেছে, তবে চূড়ান্ত বিচারে বলির পাঁঠাই রয়ে গিয়েছে। প্রয়োজনীয় মানসম্মত শিক্ষা যদি এরা পেয়ে যায় তাহলে এদের ঠকানো সহজ হবে না তা জেনেই ক্ষমতাবানেরা শিক্ষাক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলার চরম নমুনা রেখে চলেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ মোতাবেক দেশে এমন একটি জেলা রয়েছে যেখানে প্রায় ৩০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। শুধু তাই নয়, দেশে এমন একটা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পাওয়া যাবে না, যেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক আছে। অথচ শতভাগ পাসের শিক্ষা কার্যক্রম স্বমহিমায় ধাবমান।

এরই মধ্যে হঠাৎ করে স্বপ্নের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মনে হলো দেশে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ জরুরি। তাই অতীতের সব শিক্ষা প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে একীভূত করে তৎকালীন সরকার কারিগরি শিক্ষা বিষয়ে তাদের মনোভাব পরিষ্কার করল। যেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্তরা স্বপ্ন দেখেছে তাই ঘোষণা হয়ে গেল যে দেশের ২ শতাংশ পলিটেকনিক শিক্ষাকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। অথচ কেউ ভেবেই দেখল না পূর্ববর্তী ৪০ বছর সরকারি হিসাব মতে ২ শতাংশ পলিটেকনিক শিক্ষাকে মাত্র ১২ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বয়সের সীমারেখা উঠে গেল, এসএসসি পরীক্ষায় যেকোনো ফলাফল নিয়ে পাস করলেই ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হলো, ৫০০ বেসরকারি ঢাল-তলোয়ারবিহীন পলিটেকনিকে টাকার বিনিময়ে সনদ বিক্রির ব্যবস্থা হয়ে গেল, বৃত্তিমূলক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার ব্যবস্থা হলো, বিজ্ঞানের স্নাতকদের লেদ মেশিন চালাতে, মোটর বাইন্ডিং করতে, গাড়ির ইঞ্জিন মেরামত করতে, লেভেল মেশিন চালাতে প্রশিক্ষণ দিতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

১৯৫৫ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দেশে যে বিশ্বমানের পলিটেকনিক শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় তা ক্রমেই তার গৌরব হারিয়েছে। শিক্ষকস্বল্পতা, প্রশিক্ষণের অভাব, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকট, সময়োপযোগী পাঠ্যবইয়ের অনুপস্থিতি এবং মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতিতে পরিপূর্ণ ওয়ার্কশপ—সব মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি আজ অন্তসারশূন্য হয়ে পড়েছে। অথচ এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগই চোখে পড়েনি। তার ওপর এই জনশক্তি কোথায় ব্যবহৃত হবে তার কোনো পরিকল্পনাও এ পর্যন্ত করা হয়নি। বরং লোকসানের অজুহাতে একের পর এক বৃহৎ শিল্প ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের কাছে বিক্রির নামে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনশক্তি যারা দেশের সম্পদ হওয়ার কথা ছিল, তারা সনদ হাতে পথে পথে ঘুরছে।

সাধারণ জনগণের বিবেচনায় যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা পথ হারিয়ে ফেলে, মানসম্মত হয় না, সেই দেশে যেকোনো উচ্চ শিক্ষা কতটা মানসম্মত হতে পারে তা লাখ টাকার প্রশ্ন। দেশে প্রচলিত বহুধারার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিত্তবানদের সন্তানদের জন্য রয়েছে আলাদা ও অধিক সুযোগসমৃদ্ধ শিক্ষার ব্যবস্থা। সাধারণ জনগণের সন্তানদের সেই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার শুরুতেই তৈরি হচ্ছে সুযোগের বৈষম্য, আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সমাজের বৃহত্তর বৈষম্যের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা চায় না বলেই দিনে দিনে বৈষম্য মহিরুহে পরিণত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দেশের সাধারণ মানুষকে বৈষম্য থেকে মুক্তির একটি স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, কিংবা রাষ্ট্র ও সরকারের নীতিতে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নবগঠিত সরকারের গত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ডেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার খুব বেশি দৃশ্যমান প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় সরকারের তৎপরতা চোখে পড়লেও একই সময়ে সারা দেশে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী ও মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার দাবিতে যে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের দাবির প্রতি সরকারের দৃশ্যমান মনোযোগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না।

যুগোপযোগী শিক্ষার দাবি যেন আমাদের দেশে চলতেই পারে না। সাধারণ ধারা এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের অভিজাত সমাজে যেন কোনো স্থান নেই। অথচ দেশ এখনো বিশ্বে কোটিপতি তৈরির প্রতিযোগিতায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে।

অতীতের অর্থ পাচারের তালিকা দেখতে দেখতে বর্তমানে সেই তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়াদের আমরা দেখতে পারছি না। সব বিবেচনায় নতুন বোতলে পুরোনো মদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ জনগণের স্বপ্ন সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও আইনের শাসন সোনার হরিণ হয়েই ছিল, আছে, থাকবে।

বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে শিক্ষাক্রম পরিমার্জন, পাঠ্যপুস্তক সংস্কার, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব পদক্ষেপ কি সাম্যের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে যাচ্ছে, নাকি পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই নতুন কিছু সংযোজন করা হচ্ছে? বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকলে, কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ না থাকলে, দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ না থাকলে এবং শিক্ষা শেষে জনশক্তির কর্মসংস্থানের কোনো পরিকল্পনা না থাকলে সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কীভাবে?

সাম্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু নতুন বই, নতুন প্রতিষ্ঠান আর নতুন ঘোষণা নয়; শিক্ষার সুযোগ, মান, ব্যয়, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ