বাংলাদেশে এখন সচরাচর যেকোনো রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয় ২০২৪-এর আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান স্মরণ করে। কিন্তু শেষ হয় একটা অস্পষ্ট আশাবাদের মাধ্যমে এবং গোঁজামিলে ভরা কথাবার্তা দিয়ে। আসলে লেখকেরা বলতে শরমিন্দা বোধ করছেন যে এই গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। আরও সঠিক ও সরাসরি বললে তাকে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ের শহীদের প্রত্যাশাগুলোর সামান্যই পূরণ হয়েছে। যদিও প্রত্যাশাগুলো ইতিহাসে জীবন্ত হয়ে থাকবে।
গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শক্তিগুলোর রাজনৈতিক অপরিপক্বতা ও বিভেদবাদী উচ্ছ্বাসের করুণ শিকার ২৪ মাস আগের ‘৩৬ জুলাই’। কিন্তু এসব শক্তি এখনো ‘জুলাই’কে নিজেদের রাজনৈতিক পণ্য করে রাখতে পেরেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের এ রকম রাজনৈতিক পণ্যায়ন শিগগির থামবেও না। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের বেলাতেও একই রকম ঘটেছিল।
২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান শেষে পুরোনো বন্দোবস্তে ফেরত যেতে দুই বছর লাগলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশায় হাতুড়ি পড়েছিল পরের বছরই। সে সময় চোরাকারবারি, মজুতদারি, রাজনৈতিক খুনোখুনিতে অস্থির হয়ে পড়ে জনজীবন। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন সমাজ কীভাবে পুনর্গঠিত হবে, সে বিষয়ে যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। বিভক্তিও দেখা দেয় নানান আদর্শের যোদ্ধাসমাজে। খোদ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে অপমানজনকভাবে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামগঞ্জে হত্যা শুরু হয় পরিবর্তনবাদী সমাজতন্ত্রীদের। এভাবে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১-এর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তৈরি হওয়া একটি রাজনীতিমনস্ক মেধাবী প্রজন্ম ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এই ফাঁকে উত্থান ঘটতে থাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতাকারীদের। একই সঙ্গে পুনর্বাসন ঘটে যায় ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের।
অনেকে এখন চব্বিশের সঙ্গে একাত্তরের মিল খোঁজেন। মিল কিছু আছে বৈকি। প্রথম মিল জনতার ঐক্যে ও প্রত্যাশায়। একাত্তরে সামান্য একদল বিরোধিতাকারী ছাড়া পুরো দেশ যুদ্ধে নেমেছিল। চব্বিশেও একটি দল ছাড়া পুরো দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল—বিশেষ করে, সমাজের মধ্য ও নিম্নবিত্ত সমাজ, শ্রমিক-ছাত্র-নারী এবং খুদে ব্যবসায়ী সমাজ। এ রকম শক্তিগুলোর বড় অংশই এখন আর সমাজে রাজনৈতিক-চালকের আসনে নেই। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে বড় ব্যবসায়ী, আমলা, বিদেশি নানান শক্তি এবং ইউটিউবের তারকা বয়ানবিদেরা।
২৪ মাস আগের অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে ব্যাপক বিভেদ ঘটে গেছে। বহু বুদ্ধিজীবী, বহু সেমিনার, বহু ফেসবুকার মিলে একটু একটু করে সেই বিভেদে জ্বালানি ঢেলেছেন দিনের পর দিন। অভ্যুত্থানের ‘মালিকানা’ থেকে প্রথমে তাড়ানো হয় নারীদের, তারপর পেটানো হয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ছেলে-মেয়েদের, তারপর বামপন্থীদের...এভাবে একের পর এক বাছাইপর্ব চলছে এবং ‘অভ্যুত্থানে’র এজেন্সি নিয়ে বাক্যবিনিময় জারি আছে এখনো। নানান সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ শেষে বুদ্ধিজীবী দল এখন অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করে হাত পরিষ্কার করারও চেষ্টা করছেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ পুনর্গঠনের ব্যর্থতা এবং যোদ্ধাদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধে সে সময় রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকদের পুনরুত্থান ঘটেছিল। এবার গণ-অভ্যুত্থানের পর উত্থান ঘটল দক্ষিণপন্থার। শুধু উত্থানই ঘটল না—সমাজে প্রভাব বিস্তারের পালা শেষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের দিকে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে গেল তারা। গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ-যোদ্ধাদল দক্ষিণপন্থার উত্থানের সিঁড়ি হলো—হয়তো সচেতনভাবে, হয়তো অসচেতনভাবে। তবে যা ঘটার, তা রাজনৈতিকভাবেই দেখতে হবে। যে ‘পন্থা’ই জোরদার হোক, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের যৌথ সাধারণ ইচ্ছাই একটি দেশের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে—তার পরিণতি যা-ই হোক। সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মোহভাবে আমাদের বাংলাদেশের আগামীকে কল্পনা ও অনুমান করতে হবে।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, আজকের শাসক দল বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কী? প্রথম চ্যালেঞ্জ নিশ্চয় নিজের সুরক্ষার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা প্রমাণের। টিম-বিএনপির প্রধান ক্রমাগত বার্তা দিচ্ছেন মধ্যপন্থার দিকে। কিন্তু ‘মধ্যপন্থা’ যদি হয় প্রশাসন ও অর্থনীতিতে পুরোনো বন্দোবস্ত রেখে দেওয়া এবং কথিত ‘স্থিতিশীলতা’ ফিরিয়ে আনা, তাহলে চলতি ‘নবযাত্রা’র কোনো নতুন মানে নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে চরম ধনবৈষম্য ও আয়বৈষম্য তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়ে বিএনপিকে সচেতন মনে হয় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিতে তার জোর দেওয়া থেকে। বৈষম্য যে গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়, সেটা বিএনপি দেখেছে। কিন্তু এই ‘টাইম বোমে’র সমাধান ‘আড়াই হাজার টাকা’ নয়। দারিদ্র্য একটা কাঠামোগত প্রক্রিয়া। সংশোধন ও সংস্কার দরকার সেই কাঠামোর। বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশে প্রায় ২৮ ভাগ মানুষ দরিদ্র ছিল। এটা কমার বদলে বাড়ছে। কারণ, প্রকৃত মজুরি বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার হার বেশি হয়ে গেছে।
মধ্যপন্থার মানে যদি হয় দারিদ্র্য সৃষ্টির কাঠামো অক্ষত রেখে ভাতা দিয়ে দরিদ্রদের বোবা করে রাখা, সেটা সমাজকে আবারও ক্রমাগত আরেকটি ‘গণ-অভ্যুত্থানে’র দিকে নিয়ে যাবে। নতুন সংসদ, নতুন সরকার এবং নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে এবং দরিদ্র মানুষ সৃষ্টি করা বিদ্যমান কাঠামোতে হাত না দিলে বোবা মুখগুলো কবে যে বোমার আকার নেবে, রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা তা টেরও পাবেন না।
রাজনৈতিক বোমা কিন্তু এক চেহারায় তৈরি হয় এবং অন্য প্রচ্ছদে বিস্ফোরিত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের তৈরি হওয়া এবং বিস্ফোরিত হওয়ার ধরনের দিকে খেয়াল করলেই সেটা বুঝতে পারব আমরা।
ধর্মকে ব্যবহারকারী ‘মব’ থামানোর ব্যাপারেও বিএনপি সরকার আত্মবিনাশী পথ নিয়েছে। তারা এটা থামাতে পারছে না বা থামাতে চাইছে না। যা আপাতত জনতুষ্টিবাদী ‘মানিয়ে চলা’ পদ্ধতি মনে হলেও একসময় এটাই আত্মঘাতী প্রমাণিত হবে। এগুলো হলো অনেক গুপ্তশক্তির প্রস্তুতিপর্ব— বিশেষ করে যাদের ‘মধ্যপন্থা’ও পছন্দ নয়।
তারেক রহমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বাংলাদেশের ধর্মাশ্রয়ী ‘মব’ স্যাবোটাজধর্মী ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি রামের মূর্তির ছবিতে মিছিল আয়োজন করে জুতা নিক্ষেপ এবং উল্লাসের ঘটনা নিশ্চিতভাবে ভারতের সংখ্যাগুরু সমাজে ক্ষোভ তৈরি করবে এবং বিজেপির বাংলাদেশনীতিকে প্রভাবিত করবে সে ঘটনা।
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায় হিন্দুত্ববাদী শক্তি ক্ষমতায়। তারা পুশ ইনের মতো আগ্রাসী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চাইছে। ঠিক এ সময় বাংলাদেশে রামের মূর্তির ছবির অবমাননা ভারতে বৈধ-অবৈধ সব সংখ্যালঘুর দুর্দশা বেশ বাড়িয়ে তুলবে এবং পুশ ইনের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারের মানবিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে এ রকম একটা স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটেছে। এসব কি সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা? নাকি পরিকল্পিত ‘জনতুষ্টিবাদ’ বা সংখ্যাগুরু তোষণ? এই পথ কিন্তু এক অন্ধ গলির মতো।
সরকার পুরোনো আমলাতন্ত্রের সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ এখনো নেয়নি। ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের নিষ্ঠুরতম উপায় হিসেবে এ দেশে গুমের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেটা আইনগতভাবে বন্ধের লক্ষ্যে কোনো সংস্কারও হয়নি এখনো। বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণও বহাল রাখতে চাইছে সরকার। স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নও আগের মতো ঝুলে আছে।
এসবে ‘পুরোনো অবস্থা’ আপাতত সরকারের হাতকে ‘শক্তিশালী’ করলেও ক্রমে জনরোষ এবং সামাজিক হতাশা এ রকম শক্তি উধাও করে দেয়, ক্ষয়ে ফেলে। এসব অতীতের শিক্ষা। অতীতে যারাই সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের শক্তিতে দেশ চালাতে গেছে, পুরোনো বন্দোবস্ত এবং কথিত ‘স্থিতিশীলতা’ খুঁজে বেড়িয়েছে, তারা শেষমেশ নিজেরাই অস্থিতিশীলতায় পড়েছে। ‘শক্তিধর শাসক’-এর দেশ ছেড়ে পালানোর ঘটনা আমাদের সামনেই রয়েছে। সুতরাং গণতন্ত্রের ‘নবযাত্রা’য় প্রতিনিয়ত জনগণের সঙ্গে শাসকদের সংলাপ দরকার। এই সংলাপ শুধু দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে হলে সঠিক ও মেঠো বার্তা মিলবে না। সংলাপ হতে হবে ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গেও।
বিএনপি সংসদে ৩০০ আসনেই বিজয়ী হয়নি, কিন্তু এখন তাদের সরকার পুরো দেশের অভিভাবক। ফলে পুরো দেশের কথাই তাদের শুনতে হবে। পুরো জনসংখ্যাই তাদের সুদৃষ্টির দাবিদার। একইভাবে বিরোধী জোটকেও সমগ্র জনগোষ্ঠীর হয়ে সরকারের কাছে চাওয়া-পাওয়ার কথা বলতে হবে। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে মিলিতভাবে যেমন সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তেমনি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বঞ্চনাবোধের কাঠামোগত সমাধানও এখন জরুরি।
সর্বশেষ নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অনেক সুষ্ঠু হলেও এই সংসদে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব খুব কম। সংখ্যাগুরুদের প্রতিনিধিরা এটা অগ্রাহ্যও করতে পারেন, আবার একে মনোযোগ দিয়ে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে আইনগত সংস্কার করে বাংলাদেশকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারেন। সবারই হয়তো মনে আছে, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’ ছিল চব্বিশের বড় স্লোগান। যদিও অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দ শুনলেই কোনো কোনো মহল চটে যান। কারণ, এটা তাঁদের একচেটিয়াতন্ত্রের পতন ঘটাবে।
একটা দেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা যায় অর্থনৈতিকভাবে, লৈঙ্গিকগতভাবে, শ্রেণিগতভাবে, ধর্মীয়ভাবে, ভৌগোলিকভাবে এবং প্রতিবেশগতভাবে। এর মধ্যে ভৌগোলিক, প্রতিবেশগত এবং লৈঙ্গিকগত ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নবযাত্রায় অনেক পদক্ষেপ নেওয়ার আছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও ‘৩৬ জুলাই’ নারীদের যেভাবে রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে এসেছিল, সেটা এখন সামান্যই অবশিষ্ট আছে। দক্ষিণপন্থা তাদের শুধু রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়নি, আইনি সংস্কারের অ্যাজেন্ডা থেকেও বিতাড়ন করেছে।
নারী অধিকার বিষয়ে সংস্কারধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি; বিশেষ করে ভবিষ্যতে সংসদের সাধারণ আসনে নারীদের সরাসরি ভোটের পরিসর বাড়াতে হবে। এটা সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মাঝে অন্তর্ভুক্তিমূলক বোধ তৈরি করবে।
প্রতিবেশগতভাবেও বাংলাদেশ চরম ঝুঁকিতে আছে এখন। প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে দেশজুড়ে যেসব বন্য কাজ চলছে—পাহাড় ধ্বংস, বন ধ্বংস, নদী-জলাশয় ভরাট ও দূষণ—এসব বন্ধে কঠোর আইন ও তার প্রয়োগ দরকার। প্রশ্ন হলো, দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পুরোনো সুবিধাভোগীদের স্বার্থ ও বাধা অতিক্রম করে তারেক রহমান এসব পারবেন কি না? মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস সময় গেল। মানুষ আশায় আছেন, তিনি পারবেন! কিন্তু বাধা বিপুল এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নিশ্চয় ‘২৪ ঘণ্টা’ও অপচয় করতে চাইবে না।
লেখক: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক; altafparvez@yahoo.com