আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। একসময় ‘লোকায়ত’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তিনি সমাজবিশ্লেষক, সাহিত্য সমালোচক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবে বেশি পরিচিত। ৫ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কয়েক বছর আগে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, যা অপ্রকাশিত রয়ে গিয়েছিল। আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি আজ ছাপা হলো। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর ছাত্রজীবন থেকে পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক সক্রিয়তাসহ নানা বিষয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মাসুদ রানা।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের ঘটনা একরকম। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কয়েক বছর, বিশেষত ষাটের দশকের রাজনীতি দ্বারাই মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়। সেইখানে আমি প্রগতিশীল চিন্তাধারা অবলম্বন করতাম। মার্ক্সবাদের প্রতি আমার অনুরাগ ছিল। আমি মার্ক্স, এঙ্গেলসের লেখা পড়েছি, পরবর্তীকালে লেনিন ও মাও সে-তুংয়ের বই যখন আমাদের দেশে আসতে শুরু করেছে, তখন এঁদের লেখাও খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রতিও আমার আকর্ষণ ছিল। জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ—এই ব্যাপারগুলোও বুঝতে চেষ্টা করতাম। এর মধ্যে আমার রাজনৈতিক চিন্তার পরিচয় আছে। আমার ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ এবং তার পরবর্তী লেখাগুলোতে পাকিস্তান আমলে আমার চিন্তার পরিচয় পাওয়া যাবে। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আমি দৃঢ় ছিলাম। তখন যারা ছাত্র ইউনিয়ন করত, তাদের মধ্যে দৃঢ় আগ্রহ ছিল। পরবর্তী সময়ে মস্কোপন্থীরা একরকম আওয়ামী লীগ সমর্থক হয়ে গেছে, আর যারা পিকিংপন্থী বলে পরিচিত হয়েছে, তারাও কোনো স্পষ্ট কর্মসূচি অবলম্বন করেনি। এটা তাদের দুর্বলতা। তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পূর্ব বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ হোক, এই আকাঙ্ক্ষাটা এসব সংগঠনের মধ্যে ছিল। আমি কমরেড তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার—তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম গভীরভাবে। লক্ষ করেছি যে তাঁরা শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রশ্নে কঠোর সমালোচক ছিলেন। মোটামুটি কাছাকাছি বয়সের তাঁরা মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শ অবলম্বন করে চিন্তা করতেন। শেখ মুজিব সম্পর্কে তাঁদের মন্তব্য ভালো ছিল না। তাঁদের বক্তব্য ছিল—শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ যাবে না। একটা সুবিধাবাদী লাইনে দেশ চলে যাবে। কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে যে একটা দৃঢ়তা ছিল ৬ দফা কর্মসূচি নিয়ে, এই দৃঢ়তাটা তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। এটা ছিল একটা দিক।
দ্বিতীয়ত, পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এই চেতনা আমার মধ্যে ধীরে ধীরে দেখা দিয়েছিল। আমরা যে কথাটা বলতাম—‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’। স্বাধীন, সমাজতন্ত্র অভিমুখী গণতন্ত্র অবলম্বনকারী পূর্ব বাংলা—এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নানাভাবে আমার তখনকার লেখায় এসব কথা আছে। সিরাজ সিকদার একাডেমিক্যালি আমার এক বছরের জুনিয়র ছিলেন এবং আমরা একসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নও করেছি। তো, তিনিও মাও সে-তুং চিন্তাধারা অবলম্বন করে এই স্বাধীন পূর্ব বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কথা বলতেন, এমনকি লিন পিয়াও-এর চিন্তাধারাকেও সিরাজ সিকদার তখন খুব গুরুত্ব দিতেন। স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সিরাজ সিকদারেরও একটা দৃঢ়তা ছিল, আনকম্প্রোমাইজিং। তবে সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র লাইন আমি কখনো সমর্থন করিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে যে এটা বাস্তবসম্মত নয়।
মাও সে-তুংয়ের কথায় গণলাইনের কথা বলা আছে। জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে, জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করতে হবে, সংগঠন করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান দেখা দিলে সেই গণ-অভ্যুত্থানের সুযোগ নিতে হবে। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এই গণলাইন আমি সব সময় সমর্থন করেছি এবং এই পথ চেয়েছি। কিন্তু সিরাজ সিকদারেরা এই পথ ছেড়ে বললেন, গণসংগঠন মানে সুবিধাবাদের দিকে যাওয়া, গণসংগঠন বিলুপ্ত করে কাজ করতে হবে। এই গণসংগঠন বিলুপ্ত করে কাজ করার নীতি আমি সমর্থন করতে পারি না। কিন্তু স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমাদের মত এক ছিল এবং এই মতের সমর্থক দেবেন সিকদারও ছিলেন। দেবেন সিকদার, আবুল বাশার, তাঁরা একটা সংগঠন ভেঙে বহু দল হয়ে গেলেও তাঁদের মধ্যে একটা প্রশ্নে মিল ছিল। দেবেন সিকদারের সঙ্গেও আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তাঁর মতও আমাদের অনেকের মতের সঙ্গে মিলত।
পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে সিরাজ সিকদারের আচ্ছন্নতা ছিল না। মত স্পষ্ট ছিল। কমরেড আব্দুল হক, কমরেড তোয়াহা—তাঁরাও এমনটাই চাইতেন, আমার ধারণা। কখনো কখনো তাঁরা সেটা বলতেনও। কিন্তু যেহেতু শেখ মুজিব এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন, তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন মাঝপথে নষ্ট হয়ে যাবে এবং এই ধরনের নানা কথা বলে তাঁরা একটা অস্পষ্টতা রাখতেন বক্তব্যের মধ্যে। আর শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর কমরেড তোয়াহা যেসব বিবৃতি দিয়েছেন, এগুলো আমি সমর্থনযোগ্য মনে করি না। এগুলো আমি উচ্চারণও করতে চাই না। আমার মনে হয় যে সম্পূর্ণ একটা ভুলের মধ্যে তিনি পড়ে গিয়েছিলেন। কমরেড আব্দুল হক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও দীর্ঘদিন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ কথাটা তাঁর দলের নামের সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন, এটাকেও আমি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বাস্তবতাবিরোধী মনে করি।
হ্যাঁ, আমি ছাত্র ইউনিয়নে ছিলাম। তা ছাড়া ওই সময়টাতে বিভিন্ন গ্রুপ দাঁড়িয়েছিল, তার কোনো কোনোটার সঙ্গে ছিলাম। আমাকে সভাপতি করে একটা দল করেছিলেন শামসুজ্জোহা মানিক, আমজাদ হোসেন। আব্দুল মতিন বলে একজন ছিলেন, আব্দুস সাত্তার, এ রকম সাত-আটজন ছিলেন ওই দলে। যাঁরা মোটামুটি পরিচিত ছিলেন তখন অন্তত বামপন্থী ধারায়। আমি সেটার সঙ্গে ছিলাম। আমারও উৎসাহ ছিল।
পূর্ব বাংলার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি। এই দলটা মাও সে-তুং চিন্তাধারার অনুসারী ছিল। আমার ধারণা, আমজাদ হোসেনের বইয়ে এই দলের কিছু বিবরণ আছে। আরও কারও কারও লেখায় তা পাওয়া যাবে। এগুলো নিয়ে আমরা কোনো দাবি করতে চাইনি। কারণ যে স্বপ্ন, যে কল্পনা, যে আশা এবং যে কাজ আমাদের ছিল, এটা সংগঠন হিসেবে দানা বাঁধেনি। কারণ, নানাভাবে কেবল ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। আর আমাদের বয়সও তখন কম। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ৩১ বছর। কাজেই আমাদের চাইতে যাঁরা প্রবীণ ছিলেন, তাঁদের প্রভাব বেশি ছিল।
একে একে উল্লেখ করেছি অনেকের কথাই, যাঁদের সান্নিধ্যে থেকে কাজ করেছি। তখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ছিল। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যাঁরা ছিলেন ওই সময়ে, তাঁদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদ একজন নেতা ছিলেন। নুরুল হুদা কাদের বক্স একজন নেতা ছিলেন, যাদু মিয়া ছিলেন। তারপরে কাজী জাফর আহমদও ন্যাপে মোটামুটি নেতৃস্থানীয় ছিলেন। আরও অনেকে ছিলেন। ন্যাপের উদ্দেশ্য ছিল, পেটি বুর্জোয়া শ্রেণির একটা গণসংগঠন দরকার এবং সেই সংগঠন মার্ক্সবাদ সমর্থক হবে। নেতৃত্ব মার্ক্সবাদী হবে। কিন্তু সাধারণভাবে মার্ক্সবাদের বাইরেও লোকের সমর্থন অর্জন করবে। ন্যাপ তো সেভাবে গঠিত হয়ে উঠল না। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি করা হয়। ভাসানী সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেছে। অনেক সময় পেটি বুর্জোয়া, সুবিধাবাদী বলে দূরে সরিয়ে রেখেছে। অনেক সময় তাঁকে অবলম্বন করেই বিপ্লব সমর্থন করতে হবে, এই রকম মতও প্রকাশ করেছে।
৬ দফা আন্দোলন কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে উঠল, শেখ মুজিব জেল থেকে বেরিয়ে আসলেন, তখন মণি সিংহের নেতৃত্বে যে কমিউনিস্ট পার্টি, তা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক হয়ে গেল। সমর্থক যেভাবে তাঁরা হয়েছেন—যদি এমন হতো যে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, শ্রমিক ফেডারেশন, কৃষক সমিতি এইসব সংগঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠন করছে, তাহলেও হয়তো সেটা সমর্থনযোগ্য হতে পারত। যেখানে নিজেদের বক্তব্য কিছুটা স্থান পাবে। আর আওয়ামী লীগ যদি গণধারা ত্যাগ করে, তাহলে আমরা গণধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাব—এই রকম চিন্তাও হতে পারত। কিন্তু সেই রকম চিন্তা, বলিষ্ঠতা, পরিচ্ছন্নতা ছিল না। মণি সিংহের বিরাট সম্ভাবনা ছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ হওয়ার। কিন্তু মণি সিংহ তো সেই যোগ্যতার পরিচয় দেননি। মণি সিংহ আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা ছিলেন। তাঁর প্রতি এখনো শ্রদ্ধা পোষণ করি। কিন্তু আমাদের দুঃখের অন্ত নেই, যে বিরাট সম্ভাবনা ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেল। কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক—এরা আমাদের নেতা ছিলেন। আমরা আশা করেছি, কিন্তু তাঁরা হতাশ করেছেন। দেবেন সিকদারের নেতৃত্বে সেই ক্যালিভার ছিল না। আমি মনে করি দেবেন সিকদারের অনেক বেশি সততা ছিল। বদরুদ্দীন উমর শেষ দিকে এসেছিলেন। বদরুদ্দীন উমরকে তো পার্টি ভালোভাবে গ্রহণই করেনি। সব সময়ই বলেছে যে উনি পেটি বুর্জোয়া, বুদ্ধিজীবী। লিখিত সমালোচনাও করেছে। বদরুদ্দীন উমরকে যদি পার্টি সেভাবে গ্রহণ করত এবং নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চেষ্টা করত, তাহলে তাঁর চিন্তাধারাও আরও সঠিকতার দিকে যেতে পারত।
একটু আগে বললাম যে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক তাঁদের বক্তব্য অস্পষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ তো কয়েক বছর ধরেই আমাদের হয়েছে। তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তা থেকে আমি মনে করি, সমাজতন্ত্র অভিমুখী স্বাধীন পূর্ব বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁদের সমর্থন ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের কোনো আস্থা ছিল না। তাঁরা শেখ মুজিবের সমবয়সী। সমবয়সীদের মধ্যে নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি একজন অন্যজনেরটা অনেক বেশি দেখে। সেই হিসেবে শেখ মুজিবের ত্রুটিগুলো তাঁরা খুব ভালোভাবে নির্দেশ করতেন। কিন্তু বাংলাদেশ যে প্রতিষ্ঠা হবে, এটা ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। আর এই অনিবার্যতাকে বাস্তবসম্মত করে তোলা এবং সমাজতন্ত্র অভিমুখী করা—এটা ছিল তখন পার্টির দায়িত্ব। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পার্টির ধারণা সব সময়ই দোদুল্যমান এবং ভুল ছিল। একটা জাতীয় পর্যায়ে তো কাজ করতে হবে। মাও সে-তুং চীনা জাতি অবলম্বন করে চীনের পরিসরে কাজ করেছেন। লেনিন রুশ জাতি অবলম্বন করে রাশিয়ার কনটেক্সটে আলোচনা করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়াকে অবলম্বন করে গঠিত হয়েছে। পরে এর মধ্যে অন্য রাষ্ট্র যুক্ত হয়ে এটা বড় হয়েছে। আমাদের দেশেও তো, গোটা পাকিস্তানব্যাপী আন্দোলনের বাস্তবতা ছিল বলে আমার মনে হয় না যে প্রকৃতপক্ষে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক কিংবা অন্য কেউ মনে করতেন। চিন্তাভাবনা ষোলো আনা পূর্ব বাংলাভিত্তিক। কিন্তু এই কথাটা তাঁরা যুক্তিসংগতভাবে লিখিতভাবে, স্পষ্টভাবে বলেননি। তাঁদের লেখার মধ্যে সব সময় একটা অস্পষ্টতা থেকেছে। কথাবার্তা বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন। কিন্তু সব সময় তাঁরা বলতেন এর জন্য তো একটা প্রস্তুতি লাগবে। আমাদের দল সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো অগ্রগতি ছিল না। বরং তাঁদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য ছিল না। কমরেড তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক দুজনের মধ্যে বিবাদ তো আমরা প্রকাশ্যভাবেই দেখেছি। নেতৃত্ব নিয়েই বিবাদ ছিল। বাইরে আদর্শগত পার্থক্য বলছেন। তো, এরকম দুর্বলতা ছিল অনেক বামপন্থী দলের মধ্যে। কিন্তু একটা বিরাটসংখ্যক মানুষ, তরুণ, জীবন উৎসর্গ করে এই আন্দোলনে এসেছিল। যদি মণি সিংহের নেতৃত্বে গোটা জিনিসটা ধরা হয় তাইলেও তো বিরাট শক্তি। আর যদি মণি সিংহ মস্কোপন্থী বলে বাদ দিয়ে বাকিটাকে ধরা হয়, তাহলেও একটা বিরাট শক্তি। বিরাট সম্ভাবনা ছিল।
মওলানা ভাসানীর মতো সংগ্রামীকে কীভাবে কাজে লাগাবেন, এই বিষয়টা তাঁরা স্থির করতে পারেননি। ভাসানীকে অবলম্বন করেই এগোনো যেত। অথবা ভাসানীকে একজন সামাজিক নেতা হিসেবে রেখে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্যভাবে করা যেত। কিন্তু এইসব বিষয় তাঁরা পারেননি। আমি বলব একধরনের ভুল ছিল। আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। তাত্ত্বিক জ্ঞানেরও অভাব ছিল। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে কমরেড তোয়াহা তো মার্ক্স-এঙ্গেলসে ‘হাফেজ’ ছিলেন। কথা উঠলেই তাঁদের লেখা উদ্ধৃত করে কথা বলতেন। তাঁর প্রখর বুদ্ধিও ছিল। কিন্তু কেন জানি স্পষ্ট রাজনীতি করেননি।
অত্যন্ত বড় প্রতিবন্ধক। সোসাইটিটা এলিয়েনেটেড। মানে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। মানুষের মধ্যে সংহতি নেই। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নেই। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। পরিবারের মধ্যে সমস্যা সব সময় থাকে। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছর ধরে যে ঘটনা দেখা যাচ্ছে, পরিবার ধসে যাচ্ছে। মেয়েদের প্রতি যে মনোভাব সমাজের থাকা উচিত, ঠিক তার বিপরীতে অবস্থান করছে। যে রকম ধর্ষণের খবর—হয়তো নানান দিক থেকে এই খবর দেওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আসছে। পরিবার ভেঙে যাওয়া, ধর্ষণ এবং আরও নানান অসামাজিক কার্যকলাপে সমাজটা ভরে গেছে। এগুলো ভালো লক্ষণ না। আমি বলছি না যে নারী-পুরুষ একই ধারণা নিয়ে চলবে দীর্ঘকাল। নারী-পুরুষ সম্পর্কের ধারণার মধ্যেও পরিবর্তন হবে। কিন্তু ধারণা পরিবর্তনের জন্য তো লেখালেখি দরকার, চিন্তা দরকার, বক্তব্য দরকার। এটা তো কোনো রাজনৈতিক নেতা, কোনো বুদ্ধিজীবী করছেন না। করতে পারছেন না। এই নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা দরকার। পার্লামেন্টের কোনো সদস্য পার্লামেন্টের ভেতরে বা বাইরে ভুলেও সামাজিক বিভক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা করছেন না। গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনাও নেই, সে জন্য এগুলো বাড়ছে।
প্রথমত, উত্তরণের উপায় কারা চায়, তাদের ওপর নির্ভর করে। ঠিক চাওয়ার মতো চাওয়া যদি দেখা দেয়, তাহলে উপায় বের করা যাবে। প্রথমে স্টাডি সার্কেল (পাঠচক্র) করা, চিন্তা প্রকাশ করা, প্রচার করা; যদি জনগণের সমর্থন পাওয়া যায় তাহলে সাংস্কৃতিক সংগঠন করা, রাজনৈতিক দল করা। অথবা প্রচলিত কোনো দলকে সমর্থন দিয়ে এটা গড়ে তোলা। এই প্রক্রিয়াই অতীতে-ইতিহাসে আমরা পাই। কিন্তু এখন জনগণও সমর্থন দেয় না, জনগণের চেতনাও বিনষ্ট হয়ে গেছে, যাঁরা বুদ্ধিজীবী তাঁরাও আত্মবিক্রীত, দলদাস। ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে তাঁরা পরিবেশ নষ্ট করেছেন। ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তাঁরা সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদির দ্বারা তাঁরা পরিবেশ নষ্ট করে রাখছেন। এবং এই নষ্ট লোকদেরই কর্তৃত্ব।
ভিন্ন চিন্তাকেন্দ্র, ভিন্ন কর্মকেন্দ্র যত ছোট করেই হোক, আরম্ভ করার দরকার। আমি চেষ্টা করি, কিন্তু সাড়া পাই না। হয়তো আরও কেউ কেউ চেষ্টা করেন। ওই রকম চিন্তার ভিন্ন কেন্দ্র, মতপ্রকাশের ভিন্ন কেন্দ্র, তারপরে সংগঠন গঠন করা যায়। আমার সমর্থক নেই। আমি যে বক্তব্য বলি, এটাই যে সমর্থন করতে হবে, তা না। সত্যনিষ্ঠা নিয়ে আরও কেউ কেউ যদি মত প্রকাশ করতেন, তাহলে আমাদের একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা দাঁড়াত। কিন্তু চিন্তা কোথায়? টাকার সামনে তো অসহায় আমাদের বাঘা বাঘা সব বুদ্ধিজীবী। আর রাজনীতিবিদদের কথা কী বলব? সবাই লক্ষ করছেন যে রাজনীতি মানেই ব্যবসা, টাকাপয়সা আয় করা, ক্ষমতা করা, বিদেশে ছেলেমেয়েকে পড়ালেখার জন্য পাঠানো, তাদের বিদেশি নাগরিক করে নেওয়া। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটাকে গড়ে তুলতে চায়, এ রকম ব্যক্তি কোথায়? আমি তো দেখি না খোঁজ করে, পাই না। যাঁরা বাংলাদেশের নেতৃত্ব করছেন, কর্তৃত্ব করছেন, মীর জাফরও তো এর থেকে একটু উন্নত চরিত্রের ছিলেন। যখন ক্লাইভের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন নাকি মীরজাফর বলে উঠেছিলেন, দেশটা কি বিক্রিই করে দিলাম? এ রকম একটা আক্ষেপবোধ। আমাদের এই বুদ্ধিজীবীদের, রাজনীতিবিদদের তো সে আক্ষেপবোধটুকুও নেই। তাঁরা তো মীর জাফরেরও অধম। মীর জাফর ক্ষমতায় গেছেন, দেশ রাখতে পারেননি। নিয়ে গেছে ইংরেজরা। এদের কি কোনো আক্ষেপ হবে, যদি আমেরিকান বা ইন্ডিয়ানরা নিয়ে নেয় দেশ?
জনগণের মধ্যে চেতনা দরকার। প্রকৃত গণজাগরণ চাই। যার মধ্যে মানুষের মহৎ গুণাবলির প্রকাশ ঘটবে। যার মধ্যে মহৎ কিছু অর্জন করার লক্ষ্য থাকবে। যার মধ্যে ভালো নেতৃত্ব থাকবে। যার মধ্যে জ্ঞানের কার্যকারিতা থাকবে। এর কোনোটাই তো আমাদের নেই। এই সবই হলো একটার পর একটা হুজুগ।
আমি বিচার চাই না আমার ছেলের হত্যার। আমি কোনো অস্পষ্টতা না রেখে, স্পষ্টভাবে বলছি। কেন চাই না, এই কথা আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন। আমি উত্তর দিইনি। আমি বলেছি, দেশের বাস্তবতা লক্ষ করুন। দেশের বাস্তবতায় বিচার আছে, এটা আমার কাছে মনে হয়নি। কতজনের সন্তান নিহত হয়েছে, কতজনের বাবা নিহত হয়েছে, কতজনের মা নিহত হয়েছে, কতজনের স্ত্রী-স্বামী নিহত হয়েছে, এগুলোর বিচারের যে অবস্থা দেখেছি টেলিভিশনের পর্দায়; কান্নাকাটির কিছু দৃশ্য দেখেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে যে বিচার চাওয়ার চাইতে না চাওয়া ভালো। এটাই কারণ।
কিন্তু আমি সেই সঙ্গে এ কথাও বলছি, বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। কারণ, দেশে আইনের শাসন রাখতে হলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার দরকার। আমি আমার সন্তানের লাশ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া মানে সরকারের হাতেই তুলে দেওয়া। আমি চাই দেশে আইনের শাসন। আইনের শাসনের জন্য সরকার বিচার করবে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত; আবার আমরাই টাকা খরচ করে, মামলা করে, বিচার করতে গিয়ে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিচার কবে শেষ হবে কে জানে। এই কথাগুলো আমার মনে ছিল, আমি এরকম একটা কথাও বলিনি। এটা হলো আমার একটা দিক। দ্বিতীয় হলো, আমাকে অপছন্দ করেন—এ রকম লোকের সংখ্যা প্রচুর। আমি দেখি, বিশেষত পাওয়ারফুল লোকজন, বড় বড় বুদ্ধিজীবী, অনেকেই আছেন। আমি চিন্তা করি, কেন তাঁরা আমায় অপছন্দ করেন? আর যেখানেই সুযোগ পান আমার ক্ষতি করেন। এবং সেই ক্ষতি স্বীকার করে নিয়েই তো আমি চলছি। আমি যেটা বুঝতে পারি, আমার মতামত তাঁরা সহ্য করতে পারেন না। আমার মতামতকে তাঁরা মনে করেন তাঁদের ক্ষমতার জন্য, তাঁদের টাকাপয়সার জন্য, তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য অসুবিধাজনক। তা ছাড়া ঈর্ষা বলেও একটা ব্যাপার আছে। আমার কিছু কিছু কাজকে তাঁরা ঈর্ষা করেন। এগুলোই আমার বিরুদ্ধে প্রচারণার কারণ।
আমার ছেলে দীপন, তার বিরুদ্ধে প্রচার করার কিছু আছে? সে কোনো খারাপ কাজ করেছে? আমাকে একদল বলছে—তিনি তো অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ। আমি কি অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ? আওয়ামী লীগের সমালোচনা করি। আওয়ামী লীগ দেশের একটি রাজনৈতিক দল। এই হিসেবে আওয়ামী লীগের মঙ্গল আমি কামনা করি। আমি কি অ্যান্টি বিএনপি? বিএনপি যেমনই হোক, আমার দেশের একটি দল। বিএনপি ভালো হোক, সেটা আমি চাই। বামপন্থী দলগুলো ভালো কাজ করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাক। একটা ভালো প্রসেস ডেভেলপ করুক। এটুকুই তো আমার কথা। কিন্তু তা সহ্য করতে পারেন না অনেকেই। বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র তো অত্যন্ত নিকৃষ্ট। এখন তাঁরা পুরস্কারের লোভে, সংবর্ধনার লোভে তা করছে, তা অপরাধমূলক কাজ। যাঁরা সমাজে পুরস্কৃত হওয়া উচিত, তাঁরা অবহেলিত। যাঁরা পুরস্কৃত হওয়া উচিত না, তাঁদেরকেই সমাজ নমস্কার করছে, পুরস্কার দিচ্ছে। এ সমাজের মঙ্গল কী করে হবে? ভালো-মন্দের ডিস্টিংশন আছে না? যে অবস্থায় চলছে সমাজ, এ অবস্থায় থাকবে না। মানুষের মধ্যে যে শুভবুদ্ধির উদয়ের কথা বলছিলাম, শুভবুদ্ধি এখন পরাজিত, অবদমিত। সেই অবদমিত, পরাজিত শুভবুদ্ধি ধীরে ধীরে জাগবে। তারা সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইবে। এবং সেই চাওয়াটা যখন দেখা দেবে, তখনই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরম্ভ হবে।