ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাতকে শুধু ব্যর্থ শান্তি আলোচনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা যাবে না। গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বরং এমন এক গভীর কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে তেহরান ধীরে ধীরে শান্তির সম্ভাবনার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রকাশ্যে ইরানের কূটনীতিকেরা আলোচনা চালাচ্ছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ খুঁজছেন এবং যুদ্ধাবসানের কথা বলছেন। কিন্তু একই সময়ে দেশটির নিরাপত্তাকাঠামো পুনর্গঠিত হচ্ছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির ক্ষমতা বাড়ছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে এবং আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর মনে হয়েছিল সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুলেছে। কিন্তু সমঝোতার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করতে, আর ইরান চেয়েছিল এর নিরাপত্তা ও চলাচলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে। এই বিরোধই যুদ্ধবিরতির কাঠামোকে দুর্বল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে ইরান হামলা শুরু করে। এতে তেহরান দেখিয়ে দেয়, হরমুজ তার হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সামরিকভাবে পরাজিত করা কঠিন হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আঘাত এবং ওয়াশিংটনের মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানো ইরানের জন্য তুলনামূলক কম ব্যয়ের কৌশল।
এখানেই আইআরজিসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি এই বাহিনী ইরানের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাকাঠামোর কেন্দ্রীয় শক্তি। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাবও বেড়েছে। পুরোনো যুদ্ধকমান্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, নিয়মিত বাহিনীর ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং নতুন নেতৃত্বকে ‘আক্রমণাত্মক অভিযান’ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে ইরান প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের দিকে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। এভাবে তেহরান ভবিষ্যৎ যুদ্ধকে নিজের ভূখণ্ডে আটকে রাখতে চায় না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করতে চায়।
এটি ইরানের দীর্ঘদিনের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশলের আরও আক্রমণাত্মক রূপ হতে পারে। শত্রুকে ইরানের সীমান্তে আসতে না দিয়ে যুদ্ধের খরচকে তার ঘাঁটি, মিত্র ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফের কৌশলগত উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মাদির ব্যবহৃত ‘মহাসংঘাত’ ধারণাটিও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ নাও হতে পারে। বরং এমন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, যেখানে প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি প্রক্সি যুদ্ধ, সামুদ্রিক অবরোধ, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার ও গোয়েন্দা তৎপরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা একসঙ্গে চলবে। লক্ষ্য হবে একবারে জয় নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেওয়া।
ইরানের সামরিক প্রস্তুতিতেও এর ছাপ রয়েছে। তবে ইরানের ভেতরে শান্তি ও যুদ্ধের হিসাব এক নয়। অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপ বহনের মতো শক্তিশালী নয়। নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে বাধা, অবকাঠামোর ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সীমাবদ্ধতা অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বাস্তববাদী নেতৃত্বের একটি অংশ জানে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া অর্থনীতি স্থিতিশীল করা কঠিন। তাই তারা যুদ্ধ শেষ করে সমঝোতার পথ খুঁজতে আগ্রহী।
কিন্তু নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতৃত্বের হিসাব ভিন্ন।
তাদের আশঙ্কা, দুর্বল অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই যুদ্ধবিরতি তাদের কাছে স্থায়ী শান্তি নয়, সাময়িক বিরতি।
যুক্তরাষ্ট্রও সংকটকে আরও জটিল করছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে। ইরানের তেল ক্রেতা, জাহাজ, বিমা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, অস্ত্র সংগ্রহ নেটওয়ার্ক এবং চীনের ছোট শোধনাগারগুলোর ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা রয়েছে। ওয়াশিংটনের হিসাব, অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে তেহরান আলোচনায় ফিরবে।
কিন্তু এখানেই দুই পক্ষের কৌশলগত হিসাবের সংঘর্ষ। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে চাপ ইরানকে দুর্বল করবে, আর ইরান মনে করছে চাপ যত বাড়বে, যুদ্ধকালীন অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকাঠামোর প্রয়োজন তত বাড়বে। ফলে একই চাপ দুই পক্ষের কাছে বিপরীত ফল তৈরি করতে পারে। চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেলের বড় অংশ চীনে যায়। চীনা ছোট শোধনাগারে নিষেধাজ্ঞা দিলে ইরানের রাজস্ব কমতে পারে, কিন্তু এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনাও বাড়তে পারে, যা তেহরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
ইরানের কৌশলের ঝুঁকিও কম নয়। হরমুজে অতিরিক্ত হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচে ঠেলে দিতে পারে। প্রক্সি যুদ্ধ ছড়িয়ে দিলে ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আঞ্চলিক জোট গড়ে উঠতে পারে। তখন ইরানের ‘নিয়ন্ত্রিত সংঘাত’ কৌশলই বুমেরাং হতে পারে।
তাই ইরান সরাসরি শান্তির বদলে ‘মহাসংঘাত’ বেছে নিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনো অতিরঞ্জিত হবে। বরং তেহরান এমন একটি কৌশল নিয়েছে, যেখানে যুদ্ধের আশঙ্কাকে ভয় না পেয়ে সেটিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। হরমুজ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা ধরে রেখে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে এমন চুক্তিতে আনতে চাইছে, যা তার কাছে আত্মসমর্পণ বলে মনে হবে না।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন বিশ্বাস করছে অর্থনৈতিক অবরোধ, সামুদ্রিক চাপ ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে বাস্তবতার মুখোমুখি করা যাবে। এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ ভুল হিসাব। ইরান যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্র বড় হামলা করবে না, আর ওয়াশিংটন যদি ধরে নেয় তেহরান সামরিকভাবে ভেঙে পড়েছে, তাহলে একটি সীমিত ঘটনা দ্রুত বড় যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
সুতরাং বর্তমান সংকটকে শুধু ‘শান্তি বনাম যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আসল সংঘাত দুটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র চায় অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরান তার আঞ্চলিক ও সামরিক আচরণ বদলাক। ইরান চায় এমন রাষ্ট্র হয়ে থাকতে, যে নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও সামরিক হামলা সহ্য করেও প্রতিপক্ষকে বহু ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখতে পারে। এই দুই লক্ষ্য প্রায় পরস্পরবিরোধী।
ইরান এখনই শান্তির দরজা বন্ধ করেনি, কিন্তু সেই দরজার সামনে অস্ত্র সাজিয়ে রেখেছে। এই কৌশল তেহরানকে শক্তিশালী দর-কষাকষির অবস্থানে নিয়ে যাবে, নাকি ভুল হিসাবের মাধ্যমে এমন এক যুদ্ধে ঠেলে দেবে, যার নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কারও হাতে থাকবে না, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।