হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি কি এড়াতে পারল বিশ্ব

রাজিউল হাসান

বর্তমানে বিশ্বে দুটি বড় যুদ্ধ চলছে একসঙ্গে। ছবি: এএফপি

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী অস্ত্র দিয়ে হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি ও পাথর দিয়ে।’ তিনি এই মন্তব্য কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা লেখায় করেননি। জনশ্রুতি আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা দেখে সাংবাদিক ও লেখক লোরেন আইসনারের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় এ মন্তব্য করেছিলেন আইনস্টাইন।

আইনস্টাইনের এই ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ, পুরো মানবজাতির ভবিষ্যৎ। পরাশক্তিগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের পুরোটা সময় এই প্রতিযোগিতা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে পুরো বিশ্বই। অবশ্য এ কথা নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায় যে সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভাঙলেও এই অবস্থায় পৌঁছাতাম আমরা।

ইরানে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা, সেটারও প্রকাশ্য কারণ কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অভিযোগ, ইরান তার জনকল্যাণমূলক পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও ইরান সব সময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে যে পারমাণবিক কোনো বিপর্যয় ঘটবে না, তা কে বলতে পারে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার আঘাতে কী ঘটে গেছে, তা কারও অজানা নয়। সেই বিভীষিকা আজও জাপানকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তারপর পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন রহিত ও পারমাণবিক শক্তিকে শুধু জনকল্যাণে ব্যবহার করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকে সক্ষম দেশগুলোকে আটকানো যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত কীভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হলো কিংবা পাকিস্তান কীভাবে পরোক্ষ মার্কিন মদদে পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হলো, তা কারও অজানা নয়। পাকিস্তান যখন পারমাণবিক বোমা বানাল, তখন স্নায়ুযুদ্ধের কাল। প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র এই কর্মসূচি আটকাতে নানা তৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটন কিছুটা হলেও ‘চোখ বন্ধ’ করে ছিল।

ইতিহাসের পাঠ এখানেই শেষ করতে চাই। এবার একটু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিচার-বিশ্লেষণ করলে যে কেউ স্বীকার করবেন যে, আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে আছি। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বিশ্বে দুটি বড় যুদ্ধ চলেছে একসঙ্গে। ইউরোপ মহাদেশে রাশিয়া-ইউক্রেন এবং এশিয়া মহাদেশে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এশিয়ার যুদ্ধে আবার পরোক্ষভাবে জড়িয়েছিল রাশিয়া ও চীন। ছোট-বড় অন্য দেশগুলোও নানাভাবে জড়িয়েছে। সে হিসেবে ইরান যুদ্ধে কেবল অক্ষশক্তি আর মিত্রশক্তি তৈরি হওয়াই বাকি ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধেও বহুপক্ষ জড়িয়ে গেছে। রাশিয়ার মিত্ররা মস্কোর সারিতে দাঁড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউক্রেনের যত মিত্র আছে, তারা দাঁড়িয়ে এক সারিতে। সারিবদ্ধ হয়ে শুধু বাগ্‌যুদ্ধ চলছে না, বরং ঘোষণা দিয়ে ইউক্রেনের মিত্ররা দেশটিকে সামরিক নানা সহায়তা দিচ্ছে।

আমরা যদি শুধু ইরান যুদ্ধকে বিবেচনায় নিই, তা-ও বলা যায়, এই একটি যুদ্ধই বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এখন সব পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও নতুন করে সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। আর এর সঙ্গে কোনোভাবে যদি ইউক্রেন যুদ্ধের যোগসূত্র তৈরি হয়, তাহলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণা দেওয়া যাবে। ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের যোগসূত্র এরই মধ্যে তৈরি হতে শুরু করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইরানি ড্রোন ঠেকাতে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে। এই বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইরান ও রাশিয়া ভালোভাবে নেবে না। বরং এতে ইরান ও রাশিয়া আরও কাছে আসতে পারে, তাদের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বৈরিতা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিষয়ে আরও বেশি বৈরী। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী নীতি খুব সহজেই দেশটিকে মার্কিনবিরোধী শিবিরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা স্পষ্ট। এই নীতি অব্যাহত থাকলে কিংবা আরও জোরদারভাবে প্রয়োগ শুরু হলে চীন প্রকাশ্যে ইরান ও রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাইওয়ান ইস্যু বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দিনে দিনে তাইওয়ানকে সহযোগিতার মাত্রা বাড়াচ্ছে, তাতে চীনের জমাট ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে খুব বেশি দিন লাগবে না। চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং তারা স্বপ্ন দেখে, কোনো একদিন তাইওয়ান তাদের হবে। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নীতি যেভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তাতে ২০২৭ সাল বা তার কাছাকাছি সময়ে বেইজিং তাইওয়ানের বিষয়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। সেই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র তাতে সরাসরি জড়িয়ে যেতে পারে। তাতে এশিয়ায় আরেকটি যুদ্ধের জন্ম হবে। আর সে যুদ্ধের জন্ম না হলেও ওয়াশিংটন-বেইজিং বৈরিতা যে দিনে দিনে বাড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এভাবে নানা ঘটনাপ্রবাহে যদি সত্যিই অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি তৈরি হয়ে যায়, সেই সংঘাতই হবে আনুষ্ঠানিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ববাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার দেখেছে। কাজেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেও যে ব্যাপক হারে গণবিধ্বংসী এই অস্ত্রের ব্যবহার হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বরং পারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে ব্যবহার হতে পারে জীবাণু অস্ত্রসহ আরও নানা ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র।

ডাইনোসরদের বিলুপ্তির নানা তত্ত্ব আমরা জানি। এর মধ্যে জনপ্রিয় দুটি তত্ত্বের একটি হলো উল্কাপিণ্ডের আঘাত। অপরটি ডাইনোসররা নিজেরাই নিজেদের খেয়ে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে। মানবজাতিও ডাইনোসরদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। হোমো সেপিয়েন্স বা জ্ঞানী মানব বলে যে মানুষ এখন পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, সে মূলত বৃহৎ মানবসমাজের একটি অংশ। বিজ্ঞানীদের গবেষণার কল্যাণে আমরা জানি, মানুষের আরও অনেক প্রজাতি ছিল। হোমো সেপিয়েন্স যেখানেই গেছে, সেখানেই আগে থেকে অবস্থানরত মানুষের অন্য প্রজাতিগুলো কয়েক হাজার বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই বিলুপ্তির কারণ সম্পর্কেও নানা তত্ত্ব আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বটি হলো, হোমো সেপিয়েন্স দেখতে ছোটখাটো নিরীহ প্রকৃতির মানুষ হলেও সে ভেতর থেকে দানব। সে নিজের প্রাধান্য ছাড়া আর কিছু মেনে নিতে পারে না। এ কারণেই হোমো সেপিয়েন্সের ‘তাণ্ডবে’ বিলুপ্ত হয়ে গেছে মানুষের অন্য প্রজাতিগুলো।

মানুষরূপী এই ‘ডাইনোসররা’ যদি সত্যিই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তাহলে যে তারাও ‘নিজেদের খেয়ে’ ধ্বংস করে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সেই যুদ্ধের পর যদি হোমো সেপিয়েন্সের কিছু অংশ টিকে যায়, তারা মূলত ফিরে যাবে পাথর যুগে। কারণ, আধুনিক সব সরঞ্জাম তারা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস করে ফেলবে, না হয় খরচ করে ফেলবে। লাঠিসোঁটা ছাড়া তার আর সম্বল বলে কিছু থাকবে না। কাজেই আইনস্টাইনের সুরে সুর মিলিয়ে বলতেই হয়—চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধে মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে যুদ্ধ করবে।

লেখক: উপ বার্তা সম্পাদক আজকের পত্রিকা

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রভাব

ইরানের হাতে আর কী অস্ত্র আছে

পরিমাণগত পরিমাপই উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ নির্ণায়ক নয়

অমানবিক বিশ্বরাজনীতি

অস্ত্র ব্যবসার উন্মাদনা বনাম ডুমস ডে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও উত্তরণের পথ

বিশ্বরাজনীতির উত্তাপ ও বাংলাদেশের কৃষি

গণভোট অবৈধ হলে গণভোটের রায় কীভাবে বৈধ

সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার