হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

‘সুপার’ এল নিনো ও আমাদের কৃষি

শাইখ সিরাজ(পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই)

এল নিনোর প্রভাবে খরা হলে আমন রোপণ ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ছবি: পেক্সেলস

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সম্প্রতি একটি গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। এবারের গ্রীষ্মের ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি হতে পারে এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ। সার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে এমনিতেই আমাদের বৈশ্বিক ও দেশীয় খাদ্যব্যবস্থা একধরনের ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের বাজারের থলিতে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকবে না। বিশ্বজুড়ে উৎপাদক, খুচরা বিক্রেতা এবং প্রান্তিক কৃষকদের অর্থনীতিতে এটি বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এল নিনো’ আসলে কী, কেন এটি এবার এত ভয়ংকর এবং আমাদের বাংলাদেশের কৃষিতে এর প্রভাব কতটা পড়তে পারে।

এল নিনো (El Niño) হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। স্প্যানিশ এই শব্দের অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’ বা ‘যিশু শিশু’।

স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্য বায়ু (ট্রেড উইন্ডস) পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়, যা উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনো চলাকালীন এই বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মহাসাগরের পৃষ্ঠের উষ্ণ পানি উল্টো দিকে, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের দিকে জমা হতে থাকে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়—কোথাও তৈরি হয় তীব্র খরা, আবার কোথাও দেখা দেয় অতিবৃষ্টি বা বন্যা।

এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় (সাধারণত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি) বেড়ে যায়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বা গণমাধ্যমের ভাষায় ‘গডজিলা এল নিনো’ বলা হয়। এটি সাধারণ এল নিনোর চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী। ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোর প্রভাবে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় মারাত্মক খরা দেখা দিয়েছিল, আর দক্ষিণ আমেরিকায় হয়েছিল ভয়াবহ বন্যা।

এল নিনোর প্রভাবে সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ায় বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের কৃষিতে এর বহুমুখী প্রভাব পড়তে বাধ্য। আমন ধান পুরোপুরি বৃষ্টিনির্ভর। এল নিনোর কারণে বর্ষায় প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হলে আমন রোপণ ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। অন্যদিকে, খরা ও তীব্র তাপমাত্রার কারণে বোরো মৌসুমে সেচের পানির স্তর নিচে নেমে যাবে, ফলে কৃষকের সেচ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ফসলের পরাগায়ন, অঙ্কুরোদগম ও ফসল পাকার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ধানের শিষ চিটা হয়ে যাওয়ার যে সমস্যা আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখেছি, তা আরও বাড়তে পারে। বৃষ্টিপাত কম হলে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাবে, ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজমিতে লবণাক্ততা আরও ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে, যা ওই অঞ্চলের কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলবে।

বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে গরুর মাংস, দুধ, হাঁস-মুরগি এবং অন্যান্য আমিষ। অতিরিক্ত গরমে গবাদিপশুর শরীরে ‘হিট স্ট্রেস’ তৈরি হয়। এতে তাদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে যায় এবং বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। দুগ্ধ প্রদানকারী গাভিগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। এক দিনের তীব্র গরমে গরুর দুধ উৎপাদন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আমাদের দেশের পোলট্রি খামারিরা ইতিমধ্যেই তীব্র গরমে মুরগির মৃত্যুতে যে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, সুপার এল নিনোর প্রভাবে চারণভূমির অভাব, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ সেই সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।

বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা মূলত গম, চাল, ভুট্টা ও সয়াবিন—এই চারটি প্রধান ফসলের ওপর নির্ভরশীল, যা বিশ্বের মোট ক্যালরি চাহিদার ৬০ শতাংশ মেটায়। যেহেতু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের চাহিদা স্থিতিস্থাপক, তাই সরবরাহে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেও দামের বিশাল উল্লম্ফন ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের এল নিনোর কারণে প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর দাম ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে চাল, পাম তেল, আখ এবং কফির মতো ফসলগুলোর দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি বাড়তে পারে।

অতীতে যেকোনো সংকটে শুধু নির্দিষ্ট কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়ত। কিন্তু এবার একই সঙ্গে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভোক্তাদের নজিরবিহীন সংকটে ফেলবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারে আতঙ্ক, ফটকা বাণিজ্য় এবং সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এল নিনোর কারণে চাল উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো নিজেদের মানুষের কথা ভেবে চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজার থেকে লাখ লাখ টন চাল উধাও হয়ে যাবে এবং দাম আকাশচুম্বী হবে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার গম উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্কের কারণে অতিরিক্ত কেনাকাটা শুরু হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চাল উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো নিজেদের বাজার সামলাতে চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর বাজারগুলোতেও।

বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ কেবল আগামী দিনের কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অস্থিরতাই এখন স্থায়ী পরিস্থিতি। এই অস্থিরতা মোকাবিলায় দূরদর্শী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কেবল সংকট দেখা দিলে, তা সামাল দেওয়ার বদলে আগেভাগেই জলবায়ুগত সহনশীলতা (ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স) তৈরির দিকে ঝুঁকছে।

বিশ্বের বড় বড় খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করছে, তার কিছু উদাহরণ আমাদের পথ দেখাতে পারে। আইভরি কোস্টে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কফি উৎপাদনের জন্য তীব্র হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেসলে গবেষণার মাধ্যমে রোবাস্তা কফির খরা-সহনশীল ছয়টি জাতের মিশ্রণ তৈরি করেছে, যা উৎপাদন ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। তারা এখন এই জাতগুলো স্থানীয় কৃষকের মধ্যে বিতরণ করছে।

ইউনিলিভার সয়াবিন, পাম তেল, চাল এবং চায়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থায় ‘রিজেনারেটিভ অ্যাগ্রিকালচার’ বা পুনরুৎপাদনশীল কৃষিব্যবস্থা যুক্ত করছে, যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে, পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং ফলন স্থিতিশীল রাখে।

আমাদের দেশের কৃষকেরও এখন প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষির দিকে ঝুঁকতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতিমধ্যে বেশ কিছু খরা ও তাপ-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকের মাঝে দ্রুত এসব জাতের বীজ পৌঁছে দেওয়া, সেচের বিকল্প ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং পোলট্রি ও ডেইরি খামারের শেডগুলোকে তাপ-নিরোধক করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

শাইখ সিরাজ, পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

নিউমুরিং কি ভাগাভাগির ফেরে পড়ে গেল

প্রস্তাবিত বাজেট: বড় সংখ্যা কি বড় পরিবর্তন আনে

সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা

বাজেটে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি ও বাস্তবতা

আমরা কেন এমসিকিউ আর লিখিত পরীক্ষায় আটকে থাকব: কাজী মারুফুল ইসলাম

মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্বের দ্বন্দ্ব

বিশ্ব কাঁপে ফুটবলে

সংকটময় দেশে, আমরা কোন পথে

সুখবর কি আছে কোনো

শিশুশ্রম শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও