হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গালিগালাজ, মব আর অপরাজনীতি

স্বপ্না রেজা

আগেও ছিল, তবে বর্তমানে গালিগালাজ বিষয়টির প্রচলন বেশ বেড়েছে। বর্তমানে তা কানে আসে, চোখে পড়ে মাত্রাতিরিক্তভাবে। আগে মানুষজনের মধ্যে গালিগালাজ করতে সংকোচবোধ দেখা গেলেও এখন সেটার কোনো বালাই দেখা যাচ্ছে না। গালিগালাজ করার প্রবণতা কম-বেশি অনেক ব্যক্তির মধ্যে বিরাজমান আছে। পরিবারের মধ্যেসহ অলি-গলি, মহল্লা থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে, রাষ্ট্রের আনাচ-কানাচে, রাজনৈতিক মাঠে-ময়দানে গালিগালাজের রীতি প্রচলিত আছে। সমাজটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে বলে যাঁরা মনে করেন, উপলব্ধি করেন তাঁদের এই সম্পর্কে অভিমত হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিই এই গালিগালাজের সংস্কৃতি প্রবর্তনের জন্য দায়ী, এমনকি শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারও বটে!

যখন একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষমতাকেন্দ্রিক আবহে চলে যায় অর্থাৎ রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হতেই জনগণের সমর্থন নিতে মরিয়া হয়, গণতান্ত্রিক বুলিতে নিজেদের প্রকৃত চেহারা আড়াল করে কৃত্রিমতায় জনগণের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে, সাম্যের কথা বলে, জনগণকে সম্মোহন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শ বলতে কিছুই দেখা যায় না। আর যা দেখা যায় সেটা হলো দলীয় স্বার্থে অরাজকতা। পরিণতিতে সমাজে দেখা মেলে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বা ঘাটতি। রাজনীতিতে এতটাই প্রতিহিংসার কাজকারবার চলে এবং সেটা অত্যন্ত সুকৌশলে যে তা কতটা ভয়ংকর হয়ে ওঠে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যে জনগণের সমর্থন নিয়ে রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতায় বসে, সেই জনগণকেই তারা বোকা ভেবে ব্যবহার করে থাকে। বিরোধী দলও বসে থাকে না। ক্ষমতাসীনরা যেমন বিরোধীদের ওপর অতীত অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয়, বিরোধীরাও তেমন ওত পেতে থাকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পাল্টা জবাব দিতে। রাজনীতির এই পারস্পরিক নিকৃষ্ট আচরণের বলি হয় গোটা জাতি ও দেশ এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নতুন প্রজন্মও সেই ধারায় বেড়ে ওঠে এবং তারা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধিমত্তায় কিংবা জ্ঞানে নয়, রাজনীতিতে সমালোচনা হয় গালিগালাজ, অশ্লীল, অশ্রাব‍্য ভঙ্গিমা আর অর্থহীন বাক্য দিয়ে, যা দেশ ও জাতির কল্যাণে তো আসেই না, উপরন্তু দেশ ও দেশের মানুষকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই জাতির স্বার্থে, দেশের স্বার্থে এক হয়নি, বরং নিজেদের স্বার্থে জাতিকে বিভ্রান্ত, বিভাজিত করেছে। একটা কথা না বললেই নয় যে তরুণদের একটা অংশের ভেতর যে শিক্ষাবিমুখতা এবং নৈতিকতার অভাব দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও সুবিধাভোগী রাজনীতির চর্চার ফল। দিন যতই যাচ্ছে, রাজনীতিতে গালিগালাজ ততই বাড়ছে। বাড়ছে অশ্লীল, অশ্রাব্য ভাষার প্রচলন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎ মেলে না যিনি অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কথা বলেন। এমন কোনো উদাহরণ নেই যে এর বিরুদ্ধে দুটি কথা বলেছেন কিংবা তাঁর বা তাঁদের নিজের লোকদের এমন আচরণ থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। আজ এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, যারা শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ তারা ভালো কিছু প্রত্যক্ষ করছে না, ভালো কিছু শিখছে না। যতই কেউ শিক্ষিত জাতির স্বপ্ন দেখুক, বড় বড় বুলি আউড়িয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেতনায় জাতিকে জাগ্রত করতে তৎপর হোন না কেন, রাজনীতির ভাষা ও আচরণ সভ্য, শালীন ও গ্রহণযোগ্য না হলে কখনোই শিক্ষার আলো জ্বলবে না এ রাষ্ট্রে। বিশ্বে এমন কোনো নজির নেই।

শুধু গালিগালাজ নয়, রাজনীতিতে মব নামক এক ভয়ংকর দৈত্যের আবির্ভাব ঘটেছে। যে দল বা গোষ্ঠী এই ভয়ংকর আচরণ দিয়ে তাদের প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতে ব্যতিব্যস্ত হয়েছে বা হচ্ছে, তারা কিন্তু বুঝতে পারছে না বা পারেনি যে প্রকৃতি কখনোই তার সুস্থতা লঙ্ঘনকারীকে প্রশ্রয় দেয় না। বরং সমাজের সেসব মানুষকে ন্যায়সংগত হতে একটা শিক্ষণীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর সেটা হলো মব উদ্বুদ্ধকারীদের একদিন মবেরই শিকার হতে হয়। নিঃসন্দেহে মব সভ্য, আইনসিদ্ধ সমাজের কাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয় নয়। এটা প্রচলিত রাজনীতির প্রতিশোধের এক রূপ মাত্র, যা দেশকে অস্থিতিশীল করবার জন্য একটি বড় হুমকি।

বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে বেশ কটি বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য অপরিণত ও আদর্শচ্যুত রাজনীতিই দায়ী। একটা অংশ মনে করে, তাদের দলনেতা যা-ই বলেন, সেটাই উত্তম ও সত্য। এই অংশের লোকজন সাধারণ অর্থে সুবিধাভোগী এবং সেটা প্রকাশ্যে। তেল দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তারা তৎপর থাকে। এরা কঠিনতম প্রতিশোধের পথে চলে। সাধারণ মানুষ এদের চিনতে পারে। আরেকটা অংশ মনে করে, প্রকাশ্যে থাকার দরকার নেই, বরং কৌশলে দলকে সমর্থন করা যায় এবং গোপনে সুবিধা গ্রহণ করা যায়। এরা মূলত নির্দিষ্ট কোনো দলকে মনেপ্রাণে সমর্থন করে না। যে রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতাসীন হয়, এই অংশের লোকজন তখন সেই দলেই কেন্দ্রীভূত হয়, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। এই অংশের লোকজন সমাজে ‘সুশীল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে থাকে। আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো কেবল তার দলের কর্মী, সমর্থকদেরই টানে না, দলের কৃত্রিম সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এমন সুশীলদের আপ্যায়ন ও আতিথেয়তায় ব্যস্ত থাকে এবং সুশীলরা সুবিধাপ্রাপ্ত হন।

সমাজে সাধারণ মানুষ বা অপর রাজনৈতিক দলের কেউ যখন ক্ষমতাসীন দলের কারোর দ্বারা নির্যাতিত হন, ক্ষতিগ্রস্ত হন, তখন এই সুবিধাভোগী সুশীল কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। কিন্তু যখন ক্ষমতাসীনদের কেউ অপর দলের কারোর দ্বারা নির্যাতিত হন, তখন তাঁরা সেই অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, বিবৃতি দেন। রাষ্ট্রের সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা তাঁরা ভাবেন না, দু-চারটি কথাও বলেন না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই কথিত সুশীলদের রাজনীতিতে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। দেখা যায় যে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কেউ কেউ যখন যে দল ক্ষমতাসীন থাকছে, তখন সেই দলকে বিবেচনা ও চেতনার ঊর্ধ্বে থেকে সমর্থন করছেন এবং সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন।

রাষ্ট্রে যখন যেকোনো অপরাধ নির্মূলে দলমত-নির্বিশেষে সবার মধ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ার চেতনা দৃশ্যমান হয় না, সবার কাছে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে একমত পোষণ করা হয় না, তখন কিন্তু যে কোনো অপরাধই কমে না, বরং বাড়ে এবং নতুন নতুন অপরাধের জন্ম হয়। মবের মতো একটা ঘটনা সমাজে যখন ঘটে, তখন তার প্রতিবাদ না করে, দ্বিতীয় মবের ঘটনার প্রতিবাদ করাটা রীতিমতো হাস্যকর এবং বোকামি তো বটে।

মব শুরু থেকে প্রতিরোধ করার প্রয়োজন ছিল। তাহলে আজ তা এভাবে ডালপালা ছড়াতে পারত না। সমাজে অপরাধ যত দ্রুত ছড়ায়, ন্যায়সংগত কাজ তত দ্রুত ছড়ায় না। আর বৈষম্যমূলক সমাজ হলে তো কথাই নেই, সুবিধাভোগীদের জন্য অপরাধময় সমাজব্যবস্থাই কায়েম হয়।