হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কবি সুকান্তের জন্মশতবর্ষ ও কিছু জিজ্ঞাসা

মামুনুর রশীদ

ছবি: সংগৃহীত

বেশি দিন আগের কথা নয়, এক দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক খুব আন্তরিকভাবেই আমাকে প্রশ্ন করলেন, বলুন তো কবিতার বই বিক্রি হয় না কেন? আমি জবাবে বলেছিলাম, এটি সাহিত্যের জন্য খুব খারাপ লক্ষণ। পাঠক যদি কবিতা পছন্দ না করে সে এক মারাত্মক পূর্বাভাস। আর আজকেই একজন প্রকাশকের কাছে জানতে পারলাম, গত দু-তিন বছরে সব ধরনের বই বিক্রি ভয়াবহভাবে কমে গেছে। তার মধ্যে কবিতা তো আছেই। একমাত্র বিক্রি হয় ধর্মীয় পুস্তক। কখনো কখনো তা টাকা দিয়েও কিনতে হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুইবার বইমেলা নিয়ে যে রকম খেলা হয়েছে, তাতে প্রকাশকেরা এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছেন যে লাখ লাখ টাকা তাঁদের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বইয়ের প্রতি মানুষের একটা আকর্ষণ বেড়েছিল। সব ধরনের বই যেমন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, জীবনী ইত্যাদি বইয়ের বিক্রি বেড়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন জেলা শহরে বইমেলা হতো, সেখান থেকেও প্রকাশকেরা খালি হাতে ফিরতেন না। একুশের বইমেলা বর্ধমান হাউসের চারপাশে ছোট্ট পরিসরে শুরু হলেও তা একসময় তার ব্যাপ্তি রমনা পার্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বইমেলার ভিড় এমন পর্যায়ে চলে যায়, তা সামাল দিতে রীতিমতো পুলিশ বাহিনীকে মোতায়েন করতে হয়। স্টল-প্যাভিলিয়নে এবং ছোট ছোট দোকানে ভরে যায় মেলা প্রাঙ্গণ। কোটি কোটি টাকার একটা বিপণন তৈরি হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের বইবিষয়ক খেলাটা অনেকাংশেই সফল হয়। আগামী দু-তিনটি বছরও মেলার সময় রমজান মাস থাকবে ও মার খাওয়া প্রকাশনাশিল্প আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শোনা যাচ্ছে, আগামী বইমেলাটা জানুয়ারি মাসেই অনুষ্ঠিত হবে। ভালো কথা। কিন্তু একুশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বইমেলা তাতে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।

প্রকাশনাশিল্প কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটালের কাছে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বইয়ের বিষয়টি নানাভাবেই বেঁচে ছিল। কিন্তু এর মধ্যে ঢুকে গেছে নানা ধরনের রাজনীতি। মানুষের সৌন্দর্য চেতনার একটা বড় শিল্প কাব্য। কাব্য দিয়েই আমরা পৃথিবীর সৌন্দর্যকে দেখতে পেয়েছি। বাংলা কবিতার উৎসস্থল চর্যাপদ এবং মঙ্গলকাব্যের পথ ধরে এই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাংলা কবিতার জন্ম হয়। মাইকেল মধুসূদনের হাত ধরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং আরও তিনজন গীতি কবি ডি এল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুলপ্রসাদের হাত ধরে তরতর করে এগিয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে অসংখ্য কবির জন্ম হয়। বাংলা কবিতা এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে পরে কথিত কবিদের ছাড়াও জীবনানন্দ দাশ এবং তিরিশের কবিদের সুখ্যাতি এবং প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বাংলার মানসভূগোলে। সেই সময়ে সাহিত্য রচনায় কবিদের প্রভাব ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

এই সময়ে ১৯২৬ সালে এক শিশুর জন্ম হয়। তাঁর নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর কাব্যে গণমানুষকে দেখা যায় নিবিড়ভাবে। এই কবি কিশোর বয়স থেকেই কবিতা লিখে পাঠকের কাছে একটা বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান এবং সমাজের অসাম্য—এসব নিয়েই তাঁর কবিতার যাপন। এমন সব উপমা তিনি তাঁর কাব্যে ব্যবহার করেছেন যাতে পাঠক বিস্মিত হয়েছেন। যেমন পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। পূর্ণিমার চাঁদকে তিনি ঝলসানো রুটি ভেবেছেন, যা দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনি নানা কাব্যসম্ভারে বাংলা কবিতার একটি ভিন্ন ধারার উন্মোচন করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। অসাম্যের বিরুদ্ধে কবিতা যেমন মানুষকে প্রভাবিত করে, তেমনি শ্রেণিসংগ্রামের কবি হিসেবে তিনি দ্রুতই বাংলা কাব্যে প্রবেশ করেন। এতকালের সৌন্দর্য চেতনার রীতিনীতিকে ভেঙেচুরে তিনি অসাধারণ সব কাব্য রচনা করেন, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

একটি মোরগের কাহিনী, সিগারেট, দুর্মর, রানার, ক্ষুধা ইত্যাদি নানা কবিতা তখনকার কমিউনিস্ট আন্দোলনে সর্বহারার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। এই কবির মৃত্যু হয় ১৯৪৭ সালে। মাত্র ২১ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু এই ২১ বছর বয়সেই তিনি জয় করে নিয়েছিলেন মধ্যবিত্তের হৃদয়। যে পোড় খাওয়া হৃদয় তখনকার কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক বড় ধরনের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ পূর্তি পালিত হচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও এই কবির কবিতা থেকে মানুষ বিস্মৃত হয়নি। আমরাও কৈশোরে তাঁর চটি কবিতার বই পড়েছি এবং যৌবনে পদার্পণ করেই ‘রানার’ কবিতায় সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবিনাশী গানটি শুনেছি।

এবারে আমার মনে পড়ল সেই সম্পাদকের কথা, কবিতার বই বিক্রি হয় না কেন? পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের যাঁরা কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী থেকে শুরু করে নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী—তাঁদের কবিতাসমগ্র তখনো প্রকাশ হয়নি, কিন্তু ছোট ছোট কবিতার বইগুলো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাঁরা বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়েছিলেন, কারণ তাঁদের বইয়ে ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রবল উত্তাপ খুঁজে পাওয়া যেত। এরপর আরও অনেক কবি বাংলাদেশের সাহিত্যে যুক্ত হয়েছেন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কথা মনে পড়ে। একুশের বইমেলায় তাঁদের বই বিক্রি হতো এবং তাঁরা কিছু অর্থও পেতে শুরু করেছিলেন। সত্তর-আশির দশকে বইমেলাগুলো যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এসব কবির বই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। নব্বইয়ের দশকে এসে স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে এই ধারা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে।

এই শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকেই কবিতার পাঠক কমতে শুরু করে। কবিতার পাঠক বাড়ার সঙ্গে একটা বড় সম্পর্ক আছে আবৃত্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর। আবৃত্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো কবিতাগুলো পাঠ করছে। কিন্তু নতুন কবিতার ভাষাগুলো তারা রপ্ত করতে পারেনি। অথবা এগুলো তাদের কাছে প্রয়োজন মনে হয়নি। পাঠকও নতুন কবিতা না পেয়ে বিমুখ হয়ে পড়েছেন।

একসময় শিল্পের অন্যান্য শাখা কবিতাক্রান্ত হতো। আবার আমাদের দেশে স্বাধীনতার পরে নাট্য আন্দোলন শুরু হলে কবিতা নাট্যাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তখনকার একজন বড় কবি সৈয়দ শামসুল হক নাটককে তাঁর প্রিয় শিল্প হিসেবে বিবেচনা করেন। সম্ভবত অন্য শিল্পের সঙ্গে কাব্যের যাতায়াত এর পর থেকেই কমতে শুরু করে। এটা একটা নতুন ধরনের সংকট।

সেই সম্পাদকের প্রশ্নে আরও উত্তর দিতে চাই, সমাজজীবনে কি কবিতার কার্যকারিতা কমে গেছে? মানুষ যত বেশি রাষ্ট্র নিয়ে ভাবনা শুরু করেছে, তত বেশি সংস্কৃতি নিয়ে নয়। ইতিমধ্যে একটা বড় ব্যাপার প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে আর তা হলো, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রত্যাবর্তন। সেখানে কবিতাপ্রিয় তরুণেরা একটা অন্ধকারের দিকে রওনা দিয়েছে। এদের আন্দোলনে কাব্যের কোনো স্থান নেই। অথচ এসব তরুণের সামনে কাহলিল জিবরান বা নাগিব মাহফুজের প্রভাব থাকতে পারত। ওয়াহাবিদের পথ বেছে নিয়ে সুফিদের দর্শনকে এরা গ্রহণ করেনি। সম্পাদক হয়তো নিরাশ হবেন। তবে এ কথাও ঠিক, পৃথিবীর কোনো অন্ধকারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সূর্যকে ঠেকিয়ে রাখার মন্ত্র এদের জানা নেই।

এবার এই প্রকাশকের কথায় আসি। তিনি প্রায় নিঃস্ব। তবু বাংলাবাজারের ঘরটিকে টিকিয়ে রেখেছেন একটা আশায় যে অন্ধকার কেটে যাবে। কিন্তু এ কথা ভাববার বিষয়, কাব্যের শক্তিটাও বাড়ানোর প্রয়োজন। বাৎসরিক কবিতা উৎসবের প্যান্ডেল যেমন সাংগঠনিকতায় পূর্ণ, সেখানে সৃজনশীলতার আহ্বান থাকা উচিত।

মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব