অসময়ে রাষ্ট্রপতিকে বিদায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির ট্র্যাক রেকর্ড বেশ সমৃদ্ধ। বিচারপতি সায়েম, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী—তাঁরা বেশ অপমানিত হয়েই বিদায় নিয়েছিলেন। আর এবার বিদায় নিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। প্রতিযোগিতামূলকভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, তাদের চেয়ে আওয়ামী লীগ অনেকটাই পিছিয়ে আছে। তাদের আমলে আবদুর রহমান বিশ্বাস কিংবা ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করতে হয়নি। তাঁরা দুজনই যাঁর যাঁর মেয়াদ পূর্ণ করে বিদায় নিতে পেরেছিলেন। তবে এত কিছুর পরও সদ্য বিদায় নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনকে আমি কিছুটা ভাগ্যবানই বলব। বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে যে পরিমাণ অপমান করে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল, তার কিছুই ভোগ করতে হয়নি সাহাবুদ্দিন সাহেবকে। উনি বরং আপসেই, মোটামুটি সসম্মানে বিদায় নিতে পেরেছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের অধিষ্ঠান ছিল অভাবিত, চমকে ভরপুর। কিন্তু বিদায়টা ছিল খুবই প্রত্যাশিত। উনি যে রাষ্ট্রপতি হবেন, আমি নিশ্চিত, আগের দিনও তিনি তা কল্পনা করতে পারেননি। ছোটবেলায় গল্পে পড়েছি, খলিফা হারুন অর রশিদ নাকি ‘এক দিনের বাদশাহ’ নির্বাচনের জন্য বাগদাদের রাস্তায় হাতি ছেড়ে দিতেন। হাতি গিয়ে যাকে শুঁড় দিয়ে তুলে নিয়ে পিঠে বসাত, সে-ই হতো বাদশাহ, এক দিনের জন্য। এটা ছিল খলিফা হারুন অর রশিদের একধরনের খেয়াল, খেলা। পুঞ্জীভূত ক্ষমতার শিখরে বসে শেখ হাসিনাও বোধ করি তেমনই কোনো খেয়াল চরিতার্থ করতে এই ভদ্রলোককে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন। সে বিচারে এটা ছিল তাঁর জন্য অনেকটা লটারিতে কোটি টাকা পাওয়ার মতো অভাবিত।
তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, সেটাও বিরল। তিনি তাঁর এই আংশিক মেয়াদেই তিন-তিনটা সরকারকে শপথ পড়িয়েছেন। ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারকে, ২০২৪ সালেই আবার ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে, আর সবশেষে ২০২৬-এ এসে বিএনপি সরকারকে। এমন অভিজ্ঞতা অন্য কোনো রাষ্ট্রপতির নেই। আবার এই তিনটি সরকার চরিত্রের দিক দিয়েও দারুণ ভিন্ন ভিন্ন। ইউনূসের সরকারটি এসেছিল একটা গণ-আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। তাদেরকে সাংবিধানিক রূপ দিতে রাষ্ট্রপতিকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সেসব করতে গিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক, এমনকি সন্দেহও তৈরি হয়েছে। যেমন ধরা যাক, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টি। বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চ নাকি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য। সন্দেহটা এ কারণে যে যখন এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, ঠিক সেই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে ছিল যে এতজন বিচারপতি একত্র হওয়ার মতো বাস্তবতা ছিল না। তারচেয়েও বড় কথা, পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যখন তাদের কাছে আটক থাকা ভিআইপিদের তালিকা প্রকাশ করা হয়, সেখানে দেখা যায় ঠিক ওই সময়ে প্রধান বিচারপতি সেনা আশ্রয়ে সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। তাহলে ফুল বেঞ্চ বসল কীভাবে, পরামর্শ এলইবা কী করে? এসব সন্দেহের দায় কিন্তু আলটিমেটলি গিয়ে রাষ্ট্রপতির ওপরই পড়বে। ঠিক যেমনটি পড়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি আদৌ পেয়েছেন কি পাননি—সে বিষয়টি। তাঁর দুর্ভাগ্য হচ্ছে—যে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এত এত বিতর্ককে তিনি আলিঙ্গন করেছেন, সেই সরকারই কিন্তু তাঁকে কখনোই আপন বলে বিবেচনা করেনি। সেই সরকারের পুরো দেড়টি বছর তাঁর কেটেছে এই বিরোধ আর বিতৃষ্ণার মধ্যেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা শপথ নিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে। আবার সবচেয়ে বেশি দুর্ব্যবহারও করেছেন তাঁরই সঙ্গে। সংবিধানকে সমুন্নত রাখার শপথ নিয়ে, পরমুহূর্ত থেকে একের পর এক সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাঁরা কোনো কিছুকেই পাত্তা দেননি, গণ-আন্দোলনের অজুহাতে সবকিছুর বৈধতা দাবি করেছেন। ওই সময় সরকারের প্রশ্রয়ে ছাত্ররা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন পর্যন্ত করেছে। আজকে যাঁরা এনসিপি করছেন, তাঁদেরই নেতৃত্বে হয়েছে সেই আন্দোলন। তাঁরা গিয়ে বঙ্গভবনের সামনে জড়ো হয়েছেন। নানা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেছেন। বিএনপি এবং সামরিক বাহিনীর দৃঢ়তার কারণেই তাঁদের সেই আন্দোলন সফল হয়নি। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসার পর সেসব নিয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন খোলামেলা কথাও বলেছেন মিডিয়ার সঙ্গে।
নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এ সময়ে দেখা গেছে, সারা জীবন আওয়ামী লীগ করা মো. সাহাবুদ্দিন যেন রাতারাতি বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণে তার প্রতিফলন ভালোভাবেই দেখা গেছে। এ কথা ঠিক যে রাষ্ট্রপতি আসলে নির্দলীয় একটা পদ। যাঁরাই রাষ্ট্রপতি হন, তাঁরা আগে যে দলই করুন না কেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নেন। এটাই নিয়ম। কিন্তু সেই নিয়মটা কি আসলেই সেভাবে পালিত হয়? আবদুর রহমান বিশ্বাস, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ—তাঁরা কেউই রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন নিজ নিজ দলীয় আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন? অনেকে হয়তো বলবেন, আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাইবা কতটুকু দেওয়া আছে? তাঁরা চাইলেই কি স্বাধীনভাবে নিজস্ব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেন? এটা ঠিক, হয়তো পারেন না। কিন্তু তারপরও নিরপেক্ষতার চেষ্টা তো করতে পারেন। কিন্তু সেটাও অনেক সময় সহ্য হয় না রাজনৈতিক দলগুলোর। বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পরিণতির দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
আমার মতে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি একেবারে বিদায়ের সময়েও নিজের মেরুদণ্ডহীনতার প্রকট একটা উদাহরণ রেখে গেছেন। ওনার পদত্যাগপত্রটি বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা গেছে। সেখানে পদত্যাগের কথা বলতে গিয়ে শুরুর দুই প্যারায় ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি কী কী করেছেন, তার সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন। একেবারে শেষের প্যারায় নিজের অসুস্থতার কথা লিখেছেন। এই যে বর্ণনা, এখানে তিনি তাঁর কর্মকাণ্ডের কথাই কেবল বলেছেন, কৃতকর্মের কথা বলেননি। তিনি তো তাঁর পুরো কার্যকালের কথা বলতে পারতেন। তা করেননি। ২০২৩-এর এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ থেকে তিনি রাষ্ট্রপতি। সেই সময় থেকে ২০২৪-এর আগস্ট পর্যন্ত তিনি কী কী করেছেন, সেসব একেবারেই ঊহ্য রেখেছেন। কেন? বিএনপিকে খুশি রাখার জন্য? ২০২৪-এর আগস্টের আগে তো জানুয়ারি এসেছিল। সেই সময়ে একটা জাতীয় নির্বাচনও হয়েছিল। জনগণ সেটাকে ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন বলে জানে। সেই নির্বাচনের সময় ওনার ভূমিকা কী ছিল? সে কথাও যদি পদত্যাগপত্রে লিখতেন, তাহলে তাঁর পুরো সময়কালটা হয়তো উঠে আসত। কিন্তু তিনি তা করেননি। যদি আওয়ামী লীগের সময়ের কথা লিখতে বিব্রত বোধ করবেন, তাহলে পরেরটুকুও না লিখলেই পারতেন। কেবল পদত্যাগের কারণগুলো লিখলেই তো চলত। আসলে তিনি বিএনপি, অর্থাৎ সরকারকে খুশি রাখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই লিখেছেন।
সরকারকে খুশি রাখার দরকারইবা কেন পড়ল? তার ইঙ্গিতও তাঁর পদত্যাগপত্রেই আছে। তিনি অসুস্থ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার। তিনি কি এবার তাহলে বিদেশে যাবেন? আমার সে রকমই মনে হয়। হয়তো খুব শিগগির যাবেন। এদিকে জামায়াত, এনসিপি চাইছে রাষ্ট্রপতিকে বিচারের আওতায় আনতে। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তাঁর কাজের জন্য হয়তো তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। সংবিধানের ৫১ ধারা এ ক্ষেত্রে তাঁকে দায়মুক্তি দেবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে যদি কোনো অন্যায়-অপরাধ করে থাকেন, সেসব নিয়ে নিশ্চয়ই বিচার হতে পারে। সেগুলোর ক্ষেত্রে তো আর দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। কী করেছেন আর কী করেননি—সেসব তিনি নিজে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভালো জানবেন। কর্মজীবনে নিজে তিনি একসময় জেলা পর্যায়ে বিচারক ছিলেন, দুদকের কমিশনারও ছিলেন। কোন অপরাধের কী শাস্তি—এসবও তিনি ভালোই জানেন। তাই চিকিৎসার জন্য গেলে কত দিন দেশের বাইরে থাকবেন—সে সিদ্ধান্তও হয়তো তিনি বুঝেশুনেই নেবেন।
একটা কথা বলে লেখাটা শেষ করি। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে ভালোভাবে নিইনি। আমার বিবেচনায়—রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ পদ। দলীয় বিবেচনায় এ পদে নিয়োগ যেমন প্রত্যাশিত নয়, ঠিক তেমন দলীয় রাজনীতির কারণে এ পদে থাকা ব্যক্তির অপসারণও তেমনি কাম্য নয়। রাষ্ট্রপতির যেহেতু ‘ওলটপালট’ করে দেওয়ার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই, আলংকারিক এই পদটি নিয়ে সে কারণে অকারণে নাড়াচাড়া করাও উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে ভারতের উদাহরণটার দিকে তাকানো যেতে পারে। কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল, ২০১২ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। প্রণব মুখার্জি সারা জীবন কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে রীতি অনুযায়ী তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন। দুই বছরের মাথায় কংগ্রেসকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। বিজেপি কিন্তু প্রণব মুখার্জিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি। প্রণব মুখার্জি ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত, পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যখন দৃঢ় হয়, তখন এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমাদের জন্য বিষয়গুলো এখনো প্রায়ই অভাবিত মনে হয়। আমাদের হয়তো আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক