২০২৬ সালের ২১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে ভাসমান একটি এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এই ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)-এর দুটি বয়লারের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে টার্মিনালটির দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সরবরাহক্ষমতা কার্যত অর্ধেকে নেমে আসে। প্রথম কয়েক দিন কর্তৃপক্ষ দ্রুত মেরামতের আশা করলেও যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসার পরও নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা। এর মধ্যেই যুক্ত হয় দ্বিতীয় শক—মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কাতার এনার্জি ফোর্স মেজর বাংলাদেশে চুক্তিবদ্ধ এলএনজি সরবরাহের প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয়—যে কাতার বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সরবরাহ করে। এর ফলে আগস্টের মাঝামাঝি জাতীয় গ্রিডে দৈনিক চাহিদার প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ২,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানা, বিএসআরএমের ইস্পাত কারখানাগুলো, নরসিংদীর প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল-ডাইং মিল—সবই বন্ধ হয়ে যায়। শিল্পমালিকদের হিসাবে, শুধু নরসিংদী শিল্পাঞ্চলেই দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা।
এই সংকট শুধু একটি প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনার গল্প নয়, এটি জ্বালানি-নিরাপত্তা তত্ত্বের একটি ক্ল্যাসিক ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। এশিয়া-প্যাসিফিক এনার্জি রিসার্চ সেন্টার (এপিইআরসি) ২০০৭ সালে জ্বালানি-নিরাপত্তা মূল্যায়নের জন্য যে ‘ফোর-এ’ কাঠামো প্রস্তাব করে—প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, সাশ্রয়িতা ও গ্রহণযোগ্যতা—তা আজও জ্বালানিনীতি বিশ্লেষণের মান-কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংকট এই চারটি মাত্রাকেই একযোগে ব্যর্থ করে দিয়েছে। প্রাপ্যতার দিক থেকে, দেশে মাত্র দুটি এফএসআরইউ থাকায় একটির বিকল হওয়া মানেই গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থায় বিপর্যয়। প্রকৌশল ও অবকাঠামো তত্ত্বে যাকে বলা হয় ‘এন-মাইনাস-ওয়ান’ মানদণ্ডের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি, অর্থাৎ একটি একক উৎস বিকল হলেও ব্যবস্থা সচল থাকার ন্যূনতম জরুরি সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। সাশ্রয়িতার দিক থেকে, স্পট মার্কেট থেকে জরুরি কার্গো কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত গুনতে হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে গ্যাসের দাম ছিল এর অর্ধেকের কম। প্রবেশাধিকারের দিক থেকে, শিল্প-সংযোগের জন্য অপেক্ষমাণ প্রায় ১,৮৫০টি আবেদন আটকে রেখে নতুন সংযোগ পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আর গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে, সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যেভাবে বেড়েছে, জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামো তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
বাংলাদেশ একা নয়, একই ধরনের আকস্মিক সরবরাহ-বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে বিশ্বের একাধিক দেশ। তাদের প্রতিক্রিয়া তুলনা করলে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা যখন হঠাৎ বিপর্যস্ত হয়, জার্মানি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা মোকাবিলা করে। বার্লিন একটি বিশেষ আইন (এলএনজি অ্যাকসেলারেশন অ্যাক্ট) দ্রুত পাস করে পরিবেশগত সমীক্ষা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া সাময়িকভাবে সহজ করে দেয়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পাঁচটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ইজারা নিয়ে স্থাপন করে।
এই দ্রুত-স্থাপিত অতিরিক্ত অবকাঠামোর কারণেই ইউরোপ পরবর্তী যেকোনো নতুন শক মোকাবিলায় অনেক বেশি প্রস্তুত ছিল—এটাই হলো রিডানডেন্সি বা অপ্রয়োজনীয় বাড়তি সক্ষমতার প্রকৃত মূল্য, যা সংকটের আগে বিনিয়োগ না করলে সংকটের সময় কেনা যায় না।
মিসরের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে মিসর সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সার কারখানা ও মিথানল প্ল্যান্টে সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দিয়ে গৃহস্থালি ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়। দেশটি একটি স্পষ্ট, পূর্বনির্ধারিত অগ্রাধিকার-তালিকা অনুসরণ করে, যা শিল্পমালিকদের অন্তত জানার সুযোগ দেয় কোন খাত কতটা ঝুঁকিতে থাকবে। একই সঙ্গে মিসর অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির কাছ থেকে অতিরিক্ত একটি ভাসমান টার্মিনাল দ্রুত ইজারা নেয় এবং নতুন সরবরাহ চুক্তি করে মাত্র দুই-তিন মাসের মধ্যে সংকট প্রশমিত করে। কিন্তু বাংলাদেশে অগ্রাধিকার ব্যবস্থাপনা এখনো অস্বচ্ছ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তনির্ভর—কোন শিল্প কখন কতটা গ্যাস পাবে তার কোনো প্রকাশিত, পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা করতে পারছেন না।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে আরও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কারণ, একই কাতার-নির্ভরতা ও একই আঞ্চলিক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল দেশটি। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার সময় পাকিস্তানও একই রকম সরবরাহ ঘাটতির মুখে পড়ে। তবে দেশটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন যে সমস্যাটি নিছক সরবরাহ-ঘাটতির নয়, বরং পুরো বাজার-কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো একই সঙ্গে একচেটিয়া ক্রেতা, বিক্রেতা, সঞ্চালনকারী ও ভর্তুকি-বাহক হিসেবে কাজ করে, যা কাঠামোগতভাবে সংকটপ্রবণ। এই একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাংলাদেশেও স্পষ্ট—পেট্রোবাংলা একাধারে আমদানিকারক, বিতরণকারী ও ভর্তুকি-গ্রহীতা, যেখানে জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা সীমিত।
এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করলে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দুর্বলতা চোখে পড়ে, যেগুলোর আলোচনা না করলে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া কঠিন হবে। প্রথমত, মেরামতের সময়সীমা নিয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন যে নির্দিষ্ট কোনো সময় বলা সম্ভব নয়—এমনকি বিদেশি প্রযুক্তিবিদ দল আসার পরও। এই ধরনের অনির্দিষ্টতা শিল্পমালিকদের জন্য পরিকল্পনা করা অসম্ভব করে তোলে; জার্মানি বা মিসর কোনোটিই এই মাত্রার তথ্য-শূন্যতায় ভোগেনি। দ্বিতীয়ত, নতুন গ্যাস সংযোগ সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত, যদিও স্বল্প মেয়াদে সরবরাহ সংরক্ষণের যুক্তিসংগত পদক্ষেপ মনে হতে পারে, প্রকৃতপক্ষে একটি প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা মাত্র, বাজারভিত্তিক কোনো সমাধান নয়। ইতিমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা শিল্প-স্থাপনা বছরের পর বছর সংযোগের অপেক্ষায় থাকলে তা রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত এফএসআরইউ সক্ষমতা বাড়ানোর যে পরিকল্পনা সরকার ঘোষণা করেছে, পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে তিনটি নতুন টার্মিনাল থেকে জ্বালানি পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ২০২৯ সাল। ফলে এসব থেকে চার-পাঁচ বছর পর জ্বালানি পাওয়া যাবে। জার্মানি যেখানে কয়েক মাসে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করেছিল, বাংলাদেশ সেখানে বছরের পর বছর সময় নিচ্ছে বিনিয়োগকারী খুঁজতে ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালাতে, যা সংকটের তীব্রতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চতুর্থত, ইউরোপের মতো কোনো সমন্বিত, লক্ষ্যভিত্তিক চাহিদা-হ্রাস কর্মসূচি (যেমন ইইউর নির্দিষ্ট শতাংশ ব্যবহার কমানোর অঙ্গীকার) বাংলাদেশে দেখা যায়নি; বরং সিদ্ধান্তগুলো এসেছে বিক্ষিপ্তভাবে, প্রতিদিনের সরবরাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী।
প্রথমত, মেরামত ও সরবরাহ পুনরুদ্ধারের একটি স্বচ্ছ, নিয়মিত হালনাগাদকৃত সময়সূচি জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। অনিশ্চয়তা নিজেই একটি সমস্যা, যা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে পঙ্গু করে দেয়। দ্বিতীয়ত, মিসরের অনুকরণে একটি স্পষ্ট, প্রকাশিত অগ্রাধিকার-নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত, কোন শিল্প খাত (রপ্তানিমুখী পোশাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, সার) সংকটকালে কী পরিমাণ অগ্রাধিকার পাবে, তা আগে থেকেই জানা থাকলে শিল্পমালিকেরা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতেন। তৃতীয়ত, বন্ধ থাকা নতুন সংযোগ অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্থগিত না রেখে অন্তত রপ্তানিমুখী ও ইতিমধ্যে বিনিয়োগ সম্পন্ন হওয়া কারখানাগুলোর জন্য একটি সীমিত, শর্তসাপেক্ষ ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। চতুর্থত, স্পট মার্কেট-নির্ভরতা কমাতে একাধিক সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার আলোচনা দ্রুততর করা দরকার, যাতে একটিমাত্র উৎস (কাতার) বন্ধ হলে পুরো ব্যবস্থা বিপর্যস্ত না হয়। পঞ্চমত, ডিজেল বা এলপিজি-নির্ভর বিকল্প উৎপাদনে সাময়িকভাবে ঝুঁকতে বাধ্য হওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সাময়িক ভর্তুকি বা করছাড় বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ ডিজেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি।
দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশকে জার্মানির অভিজ্ঞতা থেকে শিখে একটি ন্যূনতম ‘এন-মাইনাস-ওয়ান’ মানদণ্ড গ্রহণ করতে হবে।—অর্থাৎ যেকোনো একটি একক টার্মিনাল বা উৎস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলেও জাতীয় সরবরাহব্যবস্থা ন্যূনতম চালু রাখার মতো বাড়তি সক্ষমতা থাকতে হবে এবং তা ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুততর সময়সূচিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি একটি কৌশলগত মজুতব্যবস্থা—এলএনজি বা বিকল্প জ্বালানির ন্যূনতম কয়েক সপ্তাহের রিজার্ভ গড়ে তোলার কথা বিবেচনা করা দরকার, যা বর্তমানে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সবশেষে, জ্বালানি বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি স্থায়ী জরুরি সমন্বয়কাঠামো তৈরি করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ সংকটে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনের বদলে পূর্বনির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করে হয়। একটি টার্মিনালের আগুন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যেভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে জ্বালানি-নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিল্পনীতি, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং একে সেভাবেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।