হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

হোমো সেপিয়েন্সের জন্য বিবর্তনের সতর্কবার্তা

আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

নিয়ান্ডারথালরা যথেষ্ট সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান ছিল। ছবি সৌজন্য: নিয়ান্ডারথাল মিউজিয়াম

আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে ইউরেশিয়ার বরফাবৃত হিমশীতল বনে হেঁটে বেড়াত একদল দূরদর্শী শিকারি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রচলিত শিক্ষায় ও সামাজিক ধারণায় এদের চিত্রায়িত করা হয়েছে হিংস্র, অসভ্য ও বুদ্ধিশূন্য এক গুহাবাসী প্রজাতি হিসেবে—যাদের আমরা বলি ‘নিয়ান্ডারথাল’। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের নিত্যনতুন গবেষণা আমাদের সেই ভুল ধারণাকে পুরোপুরি দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে।

গবেষকেরা এখন স্পষ্ট বলছেন, নিয়ান্ডারথালরা মোটেও তেমন ছিল না; তারা ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান, সংবেদনশীল ও কৌশলী এক প্রজাতি। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের খ্যাতনামা নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান লেখক টম শোনেম্যান ঠিক এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আজ যদি নিয়ান্ডারথালরা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকত, তবে আধুনিক মানুষের বুদ্ধিমত্তার যে বৈচিত্র্য ও বিস্তার আমরা দেখি, তারা খুব আরামেই সেই সীমানার মধ্যে একদম ফিট হয়ে যেত।

তবে এই নতুন উপলব্ধি আমাদের সামনে এক গভীর ঐতিহাসিক ধাঁধা ও সতর্কবার্তা এনে দাঁড় করায়—বুদ্ধিমত্তা, সংবেদনশীলতা ও প্রযুক্তিতে এত উন্নত হওয়া সত্ত্বেও যদি নিয়ান্ডারথালদের মতো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, তবে আধুনিক ‘হোমো সেপিয়েন্স’ হিসেবে আমরা কতটা নিরাপদ? কারণ, যে তিনটি প্রধান কারণে নিয়ান্ডারথালরা পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছিল—চরম পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন মহামারি বা রোগব্যাধির আবির্ভাব এবং সম্পদের তীব্র প্রতিযোগিতা—আজকের আধুনিক মানবজাতি ঠিক একই বিপদগুলোর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। পার্থক্য কেবল একটাই: নিয়ান্ডারথালদের বিপদ এনে দিয়েছিল প্রকৃতি আর আজকের প্রজাতিগত বিলুপ্তির ঝুঁকি আমরা নিজেদের হাতেই তৈরি করছি।

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও তা-ই বলে। স্পেনের গুহাচিত্র ও শঙ্খ-ঝিনুকের গয়না বানানোর শৈলী প্রমাণ করে তাদের উন্নত নান্দনিকবোধ ও রূপক চিন্তাভাবনা। গাছের ছাল ও রজন ফুটিয়ে আঠা তৈরি করে কাঠের সঙ্গে পাথরের ফাল জুড়ে জটিল অস্ত্র বানানো, পঙ্গু ও গুরুতর আহত স্বজনদের পরম মমতায় বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখা, ভেষজ উদ্ভিদের চিকিৎসা এবং মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সসম্মানে কবরদান—সবই প্রমাণ করে তারা কতটা সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান ছিল। তবে এই ঐতিহাসিক সত্য উদঘাটনের পর আজকের ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বা আধুনিক মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—এত বুদ্ধিমান, কৌশলী ও সংবেদনশীল হওয়া সত্ত্বেও নিয়ান্ডারথালরা যদি হারিয়ে যেতে পারে, তবে তাদের এই বিলুপ্তি থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কী?

আমরা বহু যুগ ধরে ভেবে এসেছি, কেবল আমাদের অনন্য বুদ্ধিমত্তা ও শ্রেষ্ঠত্বের জোরেই আমরা পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করেছি। কিন্তু নিয়ান্ডারথালদের ইতিহাস আমাদের চরম এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়—বিবর্তনের দৌড়ে টিকে থাকার জন্য কেবল বুদ্ধিমত্তা বা অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নয়। প্রকৃতির নিয়ম অতি নির্মম; পরিবেশগত বিপর্যয়, খাদ্যাভাব ও প্রজাতিগত অদূরদর্শিতা একটি অত্যন্ত উন্নত প্রজাতিকেও এক লহমায় ইতিহাসের গর্ভে বিলীন করে দিতে পারে। নিয়ান্ডারথালদের হারিয়ে যাওয়ার কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আজকের আধুনিক মানবজাতি ঠিক একই ধরনের চরম ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

যেমন, বরফ যুগের চরম বৈরী আবহাওয়া ও পরিবেশ পরিবর্তন নিয়ান্ডারথালদের খাদ্যাভাব ও বিলুপ্তির অন্যতম বড় কারণ ছিল। আজকের আধুনিক মানুষ কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং নিজের হাতেই অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন ও পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে আনছে। দ্বিতীয়ত, আমরা নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের চরম শিখরে মনে করে চরম আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। ধরে নিচ্ছি যেকোনো সংকট আমরা কাটিয়ে উঠব। বিবর্তন আমাদের শেখায়—এই ধরনের প্রজাতিগত অহংকারই সবচেয়ে বড় অন্ধত্ব। তৃতীয়ত, আফ্রিকায় তৈরি নতুন কিছু রোগব্যাধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব নিয়ান্ডারথালদের জনসংখ্যা দ্রুত কমিয়ে দিয়েছিল। আজকের ঘনবসতিপূর্ণ ও অতি-সংযুক্ত বিশ্বায়িত পৃথিবীতেও নিত্যনতুন ভাইরাস ও মহামারির আক্রমণ আমাদের অস্তিত্বকে ঠিক একইভাবে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

তবে নিয়ান্ডারথালদের এই ট্র্যাজিক ইতিহাস কেবল ভয়ের বার্তা দেয় না; বরং হোমো সেপিয়েন্স হিসেবে পৃথিবীতে আমাদের দীর্ঘকাল টিকে থাকার কার্যকর দিকনির্দেশনাও দেয়। এই প্রজাতিগত বিপদগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের অবিলম্বে কয়েকটি জরুরি উত্তরণের পথ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথমত, আমাদের এটি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে প্রকৃতিকে ‘জয়’ করার চিন্তাই বড় ভুল; বরং প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেকে খাপ খাইয়ে বা অভিযোজিত করাই টিকে থাকার মূল কৌশল। এ জন্য পরিবেশ দূষণ রোধ, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার চর্চা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

দ্বিতীয়ত, নিয়ান্ডারথালরা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দলে বিভক্ত ছিল বলেই হয়তো মহামারি ও পরিবেশগত বিপর্যয় এককভাবে সামলাতে না পেরে দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়। আজকের আধুনিক মানুষকেও জাতীয়তাবাদ, হিংসা ও হানাহানি ভুলে বৈশ্বিক সংহতি ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ, জলবায়ু সংকট কিংবা মহামারির মতো বৈশ্বিক মহামারিগুলো কোনো একক দেশ বা জাতির পক্ষে একা মোকাবিলা করা অসম্ভব।

তৃতীয়ত, আধুনিক জেনেটিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—আফ্রিকা মহাদেশের বাইরের মানুষের ডিএনএতে আজও ১ থেকে ২ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল জিনের উপস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ, আন্তপ্রজনন ও সংস্করণের মাধ্যমে তারা একেবারে হারিয়ে না গিয়ে আমাদের জিনের ভেতরেই বিলীন হয়ে গেছে। বিবর্তনের এই সত্য আমাদের শেখায়—সংঘাত নয়, বরং বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে নেওয়া এবং পারস্পরিক একাত্মতাই জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ইতিহাসের এক চিরন্তন সত্য হলো—সব সময় বিজয়ী প্রজাতিই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ইতিহাস রচনা করে। আমরাও বহু যুগ ধরে এই ধারণা পোষণ করে আসছিলাম যে হোমো সেপিয়েন্স হিসেবে কেবল আমরাই প্রকৃতির সেরা সৃষ্টি এবং আমাদের অনন্য প্রজ্ঞাই আমাদের টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু নিয়ান্ডারথালদের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের সেই ভুল ধারণা ভাঙিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়—হোমো সেপিয়েন্স প্রকৃতির একমাত্র বা চূড়ান্ত পছন্দ নয়; আমরা কেবল বিবর্তনের সুবিশাল ও দীর্ঘ বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের একটি অংশ মাত্র।

আজ যদি অলৌকিকভাবে কোনো নিয়ান্ডারথাল স্যুট-টাই পরে আধুনিক শহরের কোনো কোলাহলপূর্ণ কফি শপে এসে আপনার মুখোমুখি বসত, তবে রাজনীতি, জীবনবোধ বা শিল্প নিয়ে দীর্ঘ আড্ডা শেষে আপনার বিন্দুমাত্র টেরও পাওয়ার উপায় থাকত না যে বিপরীতের মানুষটি বরফ যুগের হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর বাসিন্দা। কিন্তু তার এই হারিয়ে যাওয়ার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক সত্য—প্রকৃতির দরবারে প্রযুক্তি বা বুদ্ধিমত্তার অহংকার ক্ষণস্থায়ী; বরং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন, সহমর্মিতা এবং বৈশ্বিক সহানুভূতির চর্চাই টিকে থাকার একমাত্র উপায়।