হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মাছ চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে

শাইখ সিরাজ

ফিশটেক লিমিটেডের সহ-ব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলামের সঙ্গে আরএএস নিয়ে কথা বলছেন লেখক। ছবি: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ

বিশ্বে মিঠাপানির মাছ চাষে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে মাছের আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে যে গুণগতমানের চর্চার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা এখনো অর্জিত হয়নি। মাছচাষিদের উত্তম কৃষিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় ময়মনসিংহের তারাকান্দায় স্থাপন করা হয়েছে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতিতে মাছ চাষ কেন্দ্র। গত সপ্তাহে সেটি দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।

বাংলাদেশের মৎস্য খাতের আজকের যে বিশাল ব্যাপ্তি, তার শিকড় প্রোথিত আছে আজ থেকে প্রায় বছর ৪০ আগের এক নীরব বিপ্লবে। গত শতাব্দীর নব্বই দশকের প্রথম দিকে মাছ চাষ মূলত প্রাকৃতিক জলাশয় বা সাধারণ পুকুরনির্ভর ছিল। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও প্রতিবেদন হাকিম আলীর মৎস্য খামারের গল্প হাজার হাজার তরুণের মনোজগতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই অনুপ্রেরণা থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, শম্ভুগঞ্জ, তারাকান্দাসহ পুরো অঞ্চলে শুরু হয় মাছ চাষের এক অনন্য বিপ্লব। এ শুধু কথার কথা নয়। আজকের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সেই বিপ্লবের বিশালত্ব আঁচ করা যায়। শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মৎস্যচাষি রয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে প্রতি অর্থবছরেই মাছ উৎপাদনে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে এই জেলা। বর্তমানে এখানে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই বিপুল উৎপাদন কেবল স্থানীয় মানুষের আমিষের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় গতির সঞ্চার করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জগুলোও বদলাচ্ছে। আর সেই নতুন চ্যালেঞ্জের উত্তরই হলো তারাকান্দার এই আরএএস কেন্দ্র।

আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। পৃথিবীর জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, কিন্তু দিনে দিনে কমে আসছে আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল আর প্রাকৃতিক জলাশয়। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের আগ্রাসনে সংকুচিত হচ্ছে আবাদি জমি। তার ওপর রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং চারপাশের ভয়াবহ দূষণ। ভবিষ্যতের এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য নিরাপদ আমিষ বা এত মাছ আসবে কোথা থেকে? এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর খুঁজতে গিয়েই জন্ম হয়েছে ‘রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ বা আরএএস। এটি এমন এক যুগান্তকারী ব্যবস্থা, যেখানে বিশাল কোনো পুকুর, বিল বা নদীর প্রয়োজন নেই। খুব অল্প জায়গায়, একটি বদ্ধ চৌবাচ্চার ভেতরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তৈরি করা যায় মাছের এক বিশাল সাম্রাজ্য। বাইরের রোদ, বৃষ্টি, বন্যা বা খরা—কোনো কিছুরই প্রভাব এই মাছের ওপর পড়ে না। একটুকরো বাড়ির ছাদ কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের ভেতরে সারা বছর ধরে উৎপাদন করা যায় স্বাস্থ্যকর মাছ।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে জাপান ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা যখন গবেষণাগারে জলজ প্রাণীদের দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন, মূলত সেখান থেকে বদ্ধ পানিকে বারবার ব্যবহার করার এই ধারণার জন্ম। তবে আসল যুগান্তকারী পরিবর্তনটি আসে আশির দশকে।

মাছের মল ও উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে পানিতে অত্যন্ত বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হয়, যা বদ্ধ পরিবেশে মাছের মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিজ্ঞানীরা এর এক প্রাকৃতিক সমাধান খুঁজে পেলেন। তাঁরা আবিষ্কার করলেন ‘বায়োফিল্টার’। এই ফিল্টারে কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া নীরবে কাজ করে যায় বিষাক্ত অ্যামোনিয়াকে ধ্বংস করে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর নাইট্রেটে পরিণত করার জন্য।

আরএএসে মাছের ট্যাংকের পানি যখনই ময়লা হয়, তা বাইরে ফেলে দেওয়া হয় না, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধিত হয়। এর রয়েছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপ। প্রথম ধাপে মেকানিক্যাল ফিল্টার বা ছাঁকনির সাহায্যে পানির ভেতর থেকে মাছের মল ও উচ্ছিষ্ট খাবারের মতো কঠিন বর্জ্যগুলো আলাদা করে ফেলা হয়। দ্বিতীয় ধাপে সেই পানি প্রবেশ করে বায়োফিল্টারে, যেখানে উপকারী ব্যাকটেরিয়া পানির অদৃশ্য বিষ (অ্যামোনিয়া) ধ্বংস করে দেয়। এরপর আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি বা ওজোন গ্যাস ব্যবহার করে পানিকে ক্ষতিকর প্যাথোজেন বা ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করা হয়। সবশেষে, এই বিশুদ্ধ পানিতে কৃত্রিমভাবে বা অ্যারেটরের সাহায্যে মিশিয়ে দেওয়া হয় প্রচুর অক্সিজেন।

সতেজ ও পরিশোধিত এই পানি পুনরায় চৌবাচ্চায় ফিরিয়ে আনা হয়। এই চক্র অনবরত চলতে থাকে। সাধারণ পুকুরে মাছ চাষ করতে যে পরিমাণ পানি লাগে, এই পদ্ধতিতে তার মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ পানি দিয়েই কাজ হয়ে যায়। ফলে এটি চরম মাত্রায় পরিবেশবান্ধব এবং পানির অপচয় একেবারেই কমিয়ে ফেলে।

দেশের বাজারে আমাদের মাছের বিশাল চাহিদা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমরা এখনো বেশ পিছিয়ে। ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো উন্নত বাজারগুলোতে মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। সনাতন পদ্ধতির পুকুরে চাষ করা মাছে প্রায়ই রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটে, পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকে এবং রোগ সারাতে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ফলে এই মাছগুলো রপ্তানির মানদণ্ডে টিকতে পারে না।

ঠিক এখানেই আরএএস আমাদের জন্য বিশ্ববাজারের দরজা খুলে দিতে পারে। আরএএসে সেন্সর ও অটোমেশনের মাধ্যমে পানির গুণাগুণ, যেমন অক্সিজেন, পিএইচ মাত্রা, তাপমাত্রা ও অ্যামোনিয়ার পরিমাণ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে

রাখা যায়। ফলে মাছ থাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও সতেজ। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন হয় না, যা ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের প্রধান শর্ত।

আধুনিক বিশ্ববাজারে ক্রেতারা জানতে চায় তারা যে মাছটি খাচ্ছে, সেটি কোথায়, কীভাবে এবং কোন পরিবেশে উৎপাদিত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই খামারগুলোতে প্রতিটি ব্যাচের ডেটা সংরক্ষণ করা সম্ভব। কোন দিন কী খাবার দেওয়া হয়েছে, পানির মান কেমন ছিল, সবকিছুর ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় রপ্তানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর ছাড়পত্র পাওয়া সহজ হয়।

স্বয়ংক্রিয় খাবার প্রদান যন্ত্রের সাহায্যে সঠিক সময়ে পরিমিত খাবার দেওয়া যায়। এতে খাদ্যের অপচয় যেমন রোধ হয়, তেমনি মাছের বৃদ্ধিও দ্রুত হয়। সনাতন পদ্ধতির চেয়ে আরএএসে এফসিআর (ফুড কনভারশন রেশিও) অনেক উন্নত, ফলে উৎপাদন খরচ দীর্ঘ মেয়াদে কমে আসে এবং বিশ্ববাজারে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়।

বদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশ হওয়ায় বাইরের কোনো সংক্রামক ব্যাধি খামারে প্রবেশ করতে পারে না। প্রযুক্তির সাহায্যে মাছের যেকোনো অস্বাভাবিক আচরণ দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ফলে মাছের মৃত্যুহার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

ইউরোপ-আমেরিকায় আবিষ্কৃত এই ব্যয়বহুল প্রযুক্তিকে চীন তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতায় অনেক সহজলভ্য করেছে। ২০১৮ সালে চীনের গুয়াংডং প্রদেশ এবং ২০২৩ সালে সাংহাইয়ের সুজুতে আমরা আধুনিক আরএএস মাছ চাষ কেন্দ্র স্থাপনের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখেছি, তারাকান্দার এই কেন্দ্র তারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইয়োরিস ভ্যান বোমেলের উপস্থিতিতে এই প্রকল্পের যে সূচনা হয়েছে, তা স্থানীয় সাধারণ চাষিদের মনে ব্যাপক আশা জাগিয়েছে।

তবে সাধারণ মৎস্যচাষিরা চাইলেই রাতারাতি এই প্রযুক্তিতে যুক্ত হতে পারবেন না। কারণ, এর প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশ উচ্চ। এই প্রযুক্তিকে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আরএএস সেটআপ তৈরির সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং খামারিদের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেন্টার অব এক্সিলেন্সগুলোর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তা ও চাষিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অটোমেশন ও সেন্সর পরিচালনার জন্য কারিগরি জ্ঞান অপরিহার্য। আরএএস পুরোটাই বিদ্যুৎনির্ভর। তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা অথবা সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারি ভর্তুকি প্রয়োজন।

আমাদের জমি বাড়ছে না, কিন্তু চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না করে উৎপাদন বাড়াতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মাছ চাষে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। নব্বইয়ের দশকে যেমন হাকিম আলীর খামার দেখে দেশের তরুণেরা পুকুরে মাছ চাষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তেমনি তারাকান্দার এই আরএএস কেন্দ্রটি হতে পারে নতুন প্রজন্মের জন্য ‘স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার’-এর বাতিঘর।

বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তরুণসমাজকে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে যুক্ত করতে হবে। আর এই উৎপাদিত মানসম্পন্ন মাছকে যদি আমরা সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারি, তবে পোশাকশিল্পের মতোই মৎস্য খাতও হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। নিশ্চিত হতে পারে চাষের মাছের এক টেকসই ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি।

লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই