হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অরক্ষিত সমাজে উন্নত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়

স্বপ্না রেজা

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, ঘটনাটা এক হিন্দু পরিবারের, যারা সংখ্যালঘু হিসেবে এ দেশে বসবাস করে। তারা একবারও ভাবছেন না যে এই পরিবারের পরিচয় আর দশটা পরিবারের মতোই বাংলাদেশি। যারা বাংলাদেশকে শুধু মুসলমানদের দেশ হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে, তারা বাংলাদেশের হিন্দুধর্মাবলম্বী নাগরিকদের গণনায় আনে না, আনতে চায় না। কেউ চায় বা নাই-ই চায়, রাষ্ট্রকে কিন্তু চাইতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে সবার সমান অধিকার এবং নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের কাছে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার সমান অধিকার রয়েছে। পবিত্র সংবিধানে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান অর্থাৎ বাংলাদেশি সব নাগরিকের জন্য রয়েছে রাষ্ট্রের সমান অধিকার। অথচ মুসলিম উগ্রপন্থীরা বাংলাদেশকে শুধু মুসলমানদের রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছে, দেখে আসছে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে এবং কখনোসখনো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কথাটা অস্বীকার করবার উপায় নেই।

গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিনজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করার বিষয়টি শুধু ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এমন বক্তব্য নিয়ে হাজারো সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, পরিবারটি হিন্দুধর্মাবলম্বী। ইতিপূর্বে রংপুরে হিন্দুদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট নিয়ে নানান অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় ও সারা দেশের সাধারণ মানুষের ভেতর অনেক শঙ্কা জেগেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এটা সাম্প্রদায়িক কোনো ঘটনা নয় তো?

দ্বিতীয়ত, গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের একজন সম্মানিত সাবেক শিক্ষক। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের আচরণ নিয়ে স্থানীয়দের রয়েছে শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিব্যক্তি। এমন একজন ব্যক্তির পরিবারকে নির্মূল করার কারণটা শুধু ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া হতে পারে না বলে ইতিমধ্যে অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

তৃতীয়ত, ইয়াবা সেবনকারী দুজন তরুণের পক্ষে পরপর চারজন মানুষকে এক এক করে হত্যা করা সম্ভব কি না। সাধারণত যারা মাদকাসক্ত হয় তারা শারীরিকভাবে দুর্বল থাকে। এই অবস্থায় চার-চারটা মানুষকে ঠান্ডা মাথায় দুইজন ইয়াবাসেবী এক এক করে হত্যা করতে পারে না বলে অনেকেই ধারণা পোষণ করছেন। তাঁদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে এবং এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।

চতুর্থত, গণপতির বাসার বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই এমন প্রস্তুতি ছিল বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় দুইজন তরুণ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করবে, এমনটা অনেকেই বিশ্বাস করছেন না। উপরন্তু সংশয় প্রকাশ করে চলেছেন।

পঞ্চমত, শার্টকাণ্ড। গণপতি চক্রবর্তীর বাসায় একজন তদন্তকারী অফিসারকে যে শার্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে, সেই একই শার্ট একজন অভিযুক্তের পরনে পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে। এ বিষয়ে সেই তদন্তকারী কর্মকর্তা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটাও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কারণ, অভিযুক্তের বাবা বলেছেন, ছেলেকে যখন নিয়ে যাওয়া হয় তখন তার পরনে টিশার্ট ছিল। সেই টিশার্টের রংও তিনি উল্লেখ করেছেন। এদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা আড়ংয়ের একই শার্টের যে অনেক কপি থাকতে পারে এবং কাকতালীয়ভাবে যে দুইজনের শার্ট মিলে যেতে পারে, সেই বিষয়ে যে হাসিমিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। উপরন্তু তাঁরা সংশয় প্রকাশ করেছেন, অভিযুক্তের যে পেশা ও পারিবারিক স্ট্যাটাস, তাতে হয়তো আড়ংয়ের পোশাক পরিধান করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা থাকার কথা নয়।

ষষ্ঠত, দুই নারীর মৃতদেহ সিঁড়িতে পড়ে থাকার ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যায় যে গণপতির কন্যা পার্থী চক্রবর্তী আগামীর দেহের নিচের অংশ বিবস্ত্র। এদিকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট যেটা এসেছে, সেটার সঙ্গে ডোমের বক্তব্যের অমিল দেখা গেছে। রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলা হলেও ডোম বলেছেন, দুই নারীর দেহ থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জনগণের মাঝে হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও শঙ্কা ও সংশয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে আবার তদন্তভার নতুন টিমকে দেওয়া হয়েছে।

যাহোক, ঘটনাটি সত্যি লোমহর্ষক ও নৃশংস। বীভৎস তো বটেই। কেউ কেউ বলছেন, হিন্দু আসামি দ্বারা ঘটনাটি মুসলিম পরিবারের ঘটলে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসত এবং তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠত। যেহেতু পুলিশ হিন্দু পরিবারের চারজন হত্যার দায়ে দুইজন হিন্দু ‘আসামি’ ধরেছে, সুতরাং ঘটনাটি নিয়ে সমাজের সব পর্যায়ে প্রতিবাদের তেমন তীব্রতা নেই। সাধারণ মানুষের এমন শঙ্কার পেছনে বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তৎপরতাকেই কারণ হিসেবে অনেকে মনে করে থাকেন। সংখ্যালঘুদের অধিকারের কথা, নিরাপত্তার কথা বলা হলেও সেই অর্থে তা কার্যকর হতে দেখা যায়নি। ফলে সংখ্যালঘুদের জীবনযাত্রা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো সহজ হয়নি, হয় না। বিশেষ করে শহর বাদে অন্যান্য অঞ্চলে।

গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যার তদন্ত সঠিকভাবে না করা গেলে প্রকৃত আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে, সঠিক কারণ উদঘাটন হবে না এবং পরবর্তী সময়ে এই ধরনের পাশবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, যা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক ধারণা পোষণের যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব লেগেই থাকবে, জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগ্রত হবে না। বলাবাহুল্য যে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে না। প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তদের বিচরণ ঘটছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। অতীতের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে অনেকে মনে করেন এবং কখনো তা তার সীমা অতিক্রম করে ফেলছে।

সরকার যদি এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তদন্ত কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে না পারে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনতে না পারে, তাহলে জনগণের মাঝে যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হবে তা কোনোভাবেই সরকারের পক্ষে যাবে না। অরক্ষিত সমাজে কোনো উন্নত পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ইতিহাস কিন্তু সেই রকমই ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে যেভাবে অপরাধীরা ছাড়া পেয়েছে, তা কিন্তু এখন বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক আবেগ, স্বার্থচিন্তা কখনোই দেশ ও জাতির কল্যাণে আসেনি, আসবে বলে মনেও হয় না।

পরিশেষে বলব, যে গণপতির যে সুদর্শনা কন্যা আগামীকে মেরে ফেলা হলো, তা যেন আগামীর বাংলাদেশের চেহারা না হয়, আশা করি বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক