১. রাজনীতির মাঠ বড়ই পিচ্ছিল। যে কেউ যেকোনো সময় সে মাঠে হোঁচট খেতে পারে। কারও কারও পচা শামুকে পা কাটতে পারে। একদিন যাঁকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছে পুরো জাতি, তাঁকে অনায়াসে হত্যা করে ফেলে মানুষ। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্থানীয় রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচ। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্যানভাসটাকে ছোট করে নিয়ে এলে আলোচনা করা সহজ হবে। আমরা শুরু করব ১৯৪৮ সাল থেকে। সরকারপ্রধান অথবা রাজনীতিতে বিপুলভাবে প্রভাব বিস্তারকারী রাজনীতিবিদদের হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণও কিছুটা অনুসন্ধান করা হবে।
রাজনীতি নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, তাদের অনেকেরই মনে পড়ে যাবে এই হত্যাকাণ্ডগুলোর কথা। কেন কীভাবে সেগুলো সংঘটিত হয়েছিল, সে কথাও অনেকের মনে পড়বে, কেউ কেউ আরও বিশদভাবে সেগুলো পড়ার জন্য বইয়ের সাহায্য নেবেন।
২. ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি দেশের জন্ম হওয়ার মাত্র চার বছরের মধ্যেই দুটি বড় হত্যাকাণ্ড দেখেছে পৃথিবীবাসী। প্রথম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ভারতের অবিসংবাদিত নেতা মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী। রবীন্দ্রনাথ যার নাম দিয়েছিলেন মহাত্মা। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দিল্লির বিড়লা হাউসে প্রার্থনাসভায় যাওয়ার সময় নাথুরাম গডসে গান্ধীর কাছে গিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করেন। গান্ধী মারা যান কয়েক মিনিটের মধ্যেই।
গান্ধীকে হত্যা করেছেন যে নাথুরাম গডসে, তিনি একসময় ছিলেন আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একজন সদস্য। মহারাষ্ট্রের একজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মী। গান্ধীজি মুসলমানদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন, এটা ছিল হত্যাকাণ্ডের একটি কারণ। দেশভাগের চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানকে তার প্রাপ্য অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য গান্ধীজি ভারত সরকারকে চাপ দেন। এটাও উগ্র হিন্দুরা পছন্দ করেনি। ১৯৪৭-৪৮ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় দাঙ্গা বন্ধ ও মুসলমানদের নিরাপত্তার দাবিতে গান্ধীজি অনশন করেন। ভারতের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এসব কারণে গান্ধীর প্রতি নাখোশ ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল তারই ফল।
ভারতে কেউ মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করতে পারে, এ রকম চিন্তাও ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, রাজনীতির ইতিহাসজুড়েই রয়েছে এ রকম অবিশ্বাস্য সব হত্যাকাণ্ড।
এরপরের হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান জনসভায় বক্তৃতা করার সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানিবাগে এক জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে।
পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই আমলাতন্ত্র আর সেনাবাহিনীর ক্ষমতার গহ্বরে চলে যায়। পাকিস্তানের মূল নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দেশভাগের পর পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হন লিয়াকত আলী খান। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পাকিস্তান যে শাসনতন্ত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, তা ছিল মূলত সংসদীয় গণতন্ত্র। আরও পরিষ্কার করে বললে, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণপরিষদ বা পার্লামেন্ট ছিল সার্বভৌম এবং ক্যাবিনেট প্রথার শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সরকারি মুখপাত্র ও পরিষদের কাছে দায়ী। আর গভর্নর জেনারেল পদটি ছিল মূলত আলংকারিক, এখনকার রাষ্ট্রপতির মতো। কিন্তু পাকিস্তানে জিন্নাহ যখন নিজেই গভর্নর জেনারেল হয়ে গেলেন, তখন নিয়মতান্ত্রিকতা আর সচল থাকল না। জিন্নাহ যখন গভর্নর জেনারেল তখন মন্ত্রিসভা স্বভাবতই নিষ্প্রভ হয়ে গেল। জিন্নাহই হয়ে উঠলেন মূল ক্ষমতার মালিক। এতে লিয়াকত আলী খান খুব বেশি খুশি হননি।
পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সঙ্গে প্রথম গভর্নর জেনারেলের সম্পর্ক যে খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল, সেটা বোঝা যায় জিন্নাহ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর। সে সময় জিন্নাহ জিয়ারতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জিয়ারতে দীর্ঘকাল থাকার সময় জিন্নাহকে মাত্র একবার কয়েক মিনিটের জন্য দেখতে গিয়েছিলেন লিয়াকত আলী খান। মুমূর্ষু অবস্থায় জিন্নাহকে করাচি আনা হলে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভার কোনো মন্ত্রী উপস্থিত হননি। একটি ভাঙা অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ হয়েছিল দেশটির গভর্নর জেনারেলের জন্য।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খান অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলেন। ক্ষমতার জন্যও পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানে ষড়যন্ত্রের রাজনীতির গোড়াপত্তন করেছিলেন। এবং তিনি নিজেই হয়েছিলেন তার প্রথম শিকার। প্রকাশ্যে রাওয়ালপিন্ডিতে তাঁকে হত্যা করা হলেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
পাকিস্তানের রাজনীতি এরপর পুরোপুরি চলে গেল সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের হাতে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সেই রাজনীতির বাইরে আসতে পারেনি।
৩. এই হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর কঙ্গোয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা। আধুনিক আফ্রিকার ইতিহাসে এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকাণ্ড। গান্ধী ও লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেমন উপমহাদেশের রাজনীতি জড়িত আছে, তেমনি প্যাট্রিস লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আছে বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক স্বার্থ, কঙ্গোর খনিজ সম্পদ, শীতল যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র, সিআইএ, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাতিসংঘের অবস্থান এবং কঙ্গোর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি লুমুম্বাকে একজন বেলজিয়ান কর্মকর্তা গুলি করে হত্যা করেন। কাতাঙ্গার বিচ্ছিন্নতাবাদী সেনা ও সহযোগীরাও এতে অংশ নেয়। পৃথিবীবাসী এখন জানে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ লুমুম্বাকে হত্যা করার ছক কষেছিল।
লুমুম্বা হত্যাকাণ্ড ষাটের দশকের একটি বহুল আলোচিত বিষয় বলে তার বিশদ আলোচনা করছি। যদিও লুমুম্বা সরাসরি কমিউনিস্ট ছিলেন না, কিন্তু বামপন্থী মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে বিশাল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল আফ্রিকার এই মহান নেতার নামে। বহু বাংলাদেশি প্যাট্রিস লুমুম্বা গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশেষজ্ঞ হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন।
১৯৬০ সালের ৩০ জুন বেলজিয়ামের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল কঙ্গো। সে সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী হন প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং প্রেসিডেন্ট হন জোসেফ কাসাভুবু। স্বাধীনতার অনুষ্ঠানে লুমুম্বা যে ভাষণ দেন, তা ছিল বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনের কড়া সমালোচনা। এতে শুধু তাঁর দেশেই নয়, দেশের বাইরেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। অনেকেরই মনে পড়ে যাবে, বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকটি ছিল উপনিবেশের জোয়ার ভেঙে এশিয়া ও আফ্রিকায় স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার সময়। পশ্চিমা বিশ্ব এ সময় লুমুম্বাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। দেশ স্বাধীন হলেও সেনাবাহিনীর উচ্চ পদগুলোতে প্রায় সবকিছুই তখনো ছিল বেলজিয়ান কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে। লুমুম্বা সেনাবাহিনীতে আফ্রিকানদের অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন এবং পদোন্নতির ব্যবস্থা করছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকে। মোয়িজ শোম্বে নামে এক রাজনীতিকের নেতৃত্বে কাতাঙ্গা প্রদেশ কঙ্গো থেকে স্বাধীন হওয়ার ঘোষণা দেয় সে বছরেরই ১১ জুলাই। কাতাঙ্গা ছিল কঙ্গোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল। বেলজিয়ান বাহিনীকে কঙ্গো থেকে সরানোর জন্য জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন লুমুম্বা। যদিও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়েছিল, কিন্তু কাতাঙ্গার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে সংস্থাটি কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি।
আগস্টের শেষের দিক থেকেই সিআইএ কঙ্গোয় নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন শুরু করে। লুমুম্বাকে হত্যারও পরিকল্পনা করে। যদিও লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সিআইএ সরাসরি জড়িত, এমন কোনো প্রমাণ নেই। ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট কাসাভুবু লুমুম্বাকে বরখাস্ত করেন। লুমুম্বা সে নির্দেশ না মেনে পাল্টা কাসাভুবুকেই পদচ্যুত করার ঘোষণা দেন। সাংবিধানিক সংকটে পড়া এই দেশে ১৪ সেপ্টেম্বর মোবুতু অভ্যুত্থান সংঘটিত করেন। লুমুম্বা প্রধানমন্ত্রী পদে থাকলেও ক্ষমতা হারান। এরপর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে লুমুম্বা ছিলেন গৃহবন্দী। ২৭ নভেম্বর লুমুম্বা তাঁর বাসভবন থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারেননি। ১ ডিসেম্বর মোবুতুর বাহিনী তাঁকে ধরে ফেলে। মোরিস ম্পোলা ও জোসেফ ওকিতোসহ লুমুম্বাকে ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি হত্যা করা হয়। বেলজিয়াম ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিজেদের দায় স্বীকার করেছে এবং লুমুম্বার পরিবার ও বর্তমান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
এরপরের বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে। জনপ্রিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বিশ্বব্যাপী এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়। কেউ কেউ বলে থাকেন, লি হার্ভে ওসওয়াল্ড একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মার্কিন কংগ্রেসীয় তদন্ত বলেছিল, জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড কোনো ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট সেদিন স্ত্রী জ্যাকুলিনকে নিয়ে টেক্সাসের ডালাসে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক সফরে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর ডিলে প্লাজার দিকে যাওয়ার সময় গুলির শব্দ হয়। সেই গুলি জন এফ কেনেডির শরীরে বিঁধে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দ্রুত পার্কল্যান্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। বেলা ১টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
কেনেডি হত্যার মাত্র দুই দিন পর ওসওয়াল্ডকে পুলিশি হেফাজত থেকে অন্যত্র নেওয়ার সময় জ্যাক রুবি নামের এক ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করেন। ফলে ওসওয়াল্ডকে আদালতের মাধ্যমে বিচার করা সম্ভব হয়নি।
কেনেডির হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে। সে আলাপ অন্য কোনো সময় করা যাবে। আমরা আগামী আলোচনায় চিলির প্রথম মার্ক্সবাদী প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দে হত্যাকাণ্ডের কথা বলব। এবং বলব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কথা। আগামীকাল ১৫ আগস্টই সেই শোকের দিন। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান—এই দুজন রাষ্ট্রপতি নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, সেই কলঙ্কের ইতিহাস আমরা ভুলব কী করে?
(আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব)
জাহীদ রেজা নূর, উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা