হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ

আব্দুর রাজ্জাক 

গত চার বছরে ন্যাটো শক্তি, সামর্থ্য ও সাহায্য দিয়েও ইউক্রেনের পক্ষে তেমন কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। ছবি: সংগৃহীত

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তৎপরতা চলছিল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটানো যায় কি না। যুদ্ধ শুরুর এক মাসের মাথায় উভয় পক্ষ শান্তি সমঝোতা খুঁজতে মিলিত হয়েছিল তুরস্কে। দুই পক্ষের মধ্যে সামনাসামনি আলোচনা হয়েছিল। করমর্দন করতে না দেখা গেলেও বিশ্ববাসী দেখেছে, দুই পক্ষই হাত উঁচু করে মুষ্টিবদ্ধভাবে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে দুই পক্ষের পরনে ছিল সামরিক পোশাক। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এবার শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু শান্তি ফেরানোর জন্য চাই বৃহৎ শক্তির সদিচ্ছা। এই চার বছরের যুদ্ধের সবকিছু পর্যালোচনা করলে শুভবুদ্ধির মানুষ অবশ্যই একটা ব্যাপার লক্ষ করবেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো বা ন্যাটো কি আসলেই ইউক্রেনের ভালো চায়। এটা একটা বড় প্রশ্ন? কারণ গত চার বছরে দেখা গেছে, ন্যাটো শক্তি, সামর্থ্য ও সাহায্য দিয়েও ইউক্রেনের পক্ষে তেমন কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। আবার রাশিয়ার পক্ষ থেকে প্রথমের দিকে মনে হয়েছিল তারা কয়েক মাসের মধ্যে ইউক্রেন দখল করে নেবে, সেটাও সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি দেখা গেল, কয়েক দিন ধরে উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলা করছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাশিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে শত শত ড্রোন নিক্ষেপ করছে কিয়েভের সাধারণ জনবসতির ওপর। আবার রাশিয়াও একই অভিযোগ করছে, বেসামরিক অঞ্চলে ইউক্রেন ড্রোন হামলা করে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করছে, বিশেষ করে বেলগ্রাধ অঞ্চলে। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো, উভয় পক্ষই একে অন্যের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ওপরে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। রাশিয়াও ইতিমধ্যে কিয়েভের আশপাশে বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনার ওপর হামলা করেছে। ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছিল কিয়েভ এবং এর আশপাশের ছোট ছোট শহরে। একইভাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে তাদের জ্বালানির সরঞ্জামাদি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

গালফ অব ফিনল্যান্ডকে ব্যবহার করে লেনিনগ্রাদের জ্বালানি স্থাপনার ওপর ইউক্রেন হামলা করেছে। কিছুদিন আগে ফিনল্যান্ড ন্যাটোর সদস্যপদ পেয়েছে। এখন যদি গালফ অব ফিনল্যান্ডকে ন্যাটো ব্যবহার করে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তর শহর লেনিনগ্রাদকে আক্রমণ করে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। ইতিমধ্যে লেনিনগ্রাদে ইউক্রেন আক্রমণ করেছে, বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনার ওপরে। লেনিনগ্রাদ থেকে ফিনল্যান্ডের বর্ডার বেশি দূরে নয়। ইংল্যান্ডের সঙ্গে রাশিয়ার ১২০০ কিলোমিটার বর্ডার আছে। একসময় ফিনল্যান্ড রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে সেই ফিনল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য হয়েছে। এখন কথা চলতেছে ফিনল্যান্ডে ন্যাটোর পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করা হবে। ন্যাটোর পক্ষ থেকে যদি ফিনল্যান্ডে পারমাণবিক বোমা স্থাপন করা হয়, তাহলে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তর শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ বা লেনিনগ্রাদ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আবার লেনিনগ্রাদ থেকে মস্কোর দূরত্ব মাত্র ৫০০ কিলোমিটার। রাশিয়া এখন এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখবে, সেটা দেখার ব্যাপার। ইউক্রেন রাশিয়ার এস্কেন্দার মিসাইল যে শহরে তৈরি হয় সেই ভধকিন শহরেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

এত কিছুর পরেও রাশিয়া কিন্তু তার অগ্রযাত্রা থেকে পশ্চাৎপদ হয়নি। রাশিয়া ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাশিয়া দানেস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলকে অনেক আগেই নিজের অংশ করে নিয়েছে। এখানে গণভোটের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের মানুষ যে রাশিয়ার পক্ষে থাকতে চায়, ওই অঞ্চল দুটি রাশিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার প্রমাণও দিয়েছে। সেখানে গণভোটে ৯০ শতাংশের বেশির ভাগ মানুষ রাশিয়ার সঙ্গে থাকার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এখন রাশিয়ার সৈন্যরা ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র থেকে জাপোরিঝিয়ার দিকে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চাইছে। ইতিমধ্যে জাপোরিঝিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল রাশিয়া দখল করে নিয়েছে। পুরোপুরি দখলের জন্য রাশিয়া এখন পরিকল্পনা করছে।

ইউক্রেনের সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী অঞ্চল হলো দানেস্ক, জাপোরিঝিয়া, খারকভ ও লুহানস্ক। বলতে গেলে ইউক্রেনের একমাত্র সমুদ্রবন্দর ওদেসা, সেটিও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। ন্যাটোর শত চেষ্টাও রাশিয়ার অগ্রগতি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।

২ জুলাই ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় পরাজয় হয়েছে, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ শহর কনসটান্টিনভকার পতনের মাধ্যমে। ছয় মাস যাবৎ এই শহরের দখল নিয়ে লড়াই চলছিল। ইউক্রেন কোনোভাবেই এই শহরকে তাদের হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না। রাশিয়াও ছিল নাছোড়বান্দা। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছয় মাস যুদ্ধ করে এই শহর তাদের দখলে এখন। কনসটান্টিনভকা এমন একটি শহর, এটা দখলে থাকলে, পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তর শহর খারকভ দখলে নেওয়ার পথ সুগম হবে। অন্যভাবে বলা যায়, কনসটান্টিনভকা যার দখলে থাকবে, খারকভের ওপর দখলদারির পথ তাদের জন্য সহজ হবে। এ শহর দখলের পরে রাশিয়া আশপাশের বেশ কয়েকটি ছোট ছোট গ্রাম দখল করে নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে এই কনসটান্টিনভকা শহরের দখল ও বেদখল নিয়ে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অনেক সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ইউক্রেনের পক্ষে সৈন্য হারানোর সংখ্যা অনেক বেশি হয়েছে, যেহেতু তারা পরাজিত হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ইউক্রেনের মৃত সৈন্যদের রাশিয়া ইউক্রেনে ফেরত পাঠাতে চাইছে। কিন্তু ইউক্রেন তাদের মৃত সৈন্যদের ফেরত নিচ্ছে না অথবা নিতে পারছে না। কারণ, অনেক সৈন্য ইউক্রেন এই কনসটান্টিনভকা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। রাশিয়া বারবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, ইউক্রেন যেন তাদের মৃত সৈন্যদের ফেরত নেয়। কিন্তু ইউক্রেন তাতে কোনো সাড়া দিচ্ছে না। রাশিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেন সরকারের কাছে তাদের সৈন্যদের কোনো মূল্য নেই। মৃত সৈন্যদের বিষয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে কোনো জবাবদিহি করছে না, কোনো মৃত দেহ ফেরত দেওয়ারও আশ্বাস দিচ্ছে না। এটা কিন্তু খুবই একটি ভয়ানক ব্যাপার। অর্থাৎ এ ঘটনায় তাদের সামর্থ্যের অভাবই দেখা যাচ্ছে। ভ্লাদিমির পুতিন নিজে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের মহান বিজয় হয়েছে, আমরা কনসটান্টিনভকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। এটা আমাদের অভূতপূর্ব বিজয়।’

এ দিকে দুই পক্ষই বিদেশি সৈন্যদের ব্যবহার করছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের দু-তিনজন মানুষ রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়ায় যাঁরা কাজ করতে যান, তাঁদের রাশিয়ানরা এই বলে অফার দেন যে স্বেচ্ছায় যদি কেউ সৈনিকের খাতায় নাম লিখিয়ে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করেন, যুদ্ধ শেষে তাঁরা রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাবেন। এ ছাড়া বেতন পাবেন বাংলাদেশি টাকার ৩ লাখ টাকার ওপরে। তবে এটা হতে হবে স্বেচ্ছায়, রাশিয়া এতে কোনো জোরজবরদস্তি করবে না। আমাদের মতো দেশগুলোর কিছু মানুষ অর্থের লোভে হয়তো রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছেন।

আবার ন্যাটোর উসকানিতে বা সহযোগিতায় বিভিন্ন দেশ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। কয়েক দিন আগে কলম্বিয়ার এক নাগরিক ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছেন। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ন্যাটো দেশভুক্ত বেশ কিছু দেশের কিছু সৈন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গিয়েছেন অথবা রাশিয়ার হাতে বন্দী হয়েছেন।

সবকিছু বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় যে ন্যাটোসহ পশ্চিমা পরাশক্তি যেখানে আমেরিকা আছে, সবাই মিলে ইউক্রেনকে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়ে পেছন থেকে সাহায্যের হাত সাধ্যমতো বাড়াচ্ছে না। আবার রাশিয়ার ইতিহাসেও তেমন কোনো নজির পাওয়া যায় না যে তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ঘরে ফিরে এসেছে। ইতিমধ্যে বিদায়ী যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার্ক তাঁর উত্তরসূরিদের কাছে অনুরোধ করেছেন, ইউক্রেনকে সর্বাত্মকভাবে সমর্থন দেওয়াসহ সাহায্য-সহযোগিতা যেন অব্যাহত রাখা হয়। এককথায় বলতে গেলে ইউক্রেনকে তার নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে চলতে দেবে না পশ্চিমা দেশগুলো। তাহলে কি এভাবেই অস্ত্রের মাধ্যমে ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহারের মাধ্যমে কি শেষ হবে এই যুদ্ধ। এ রকম যদি চলতে থাকে, একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, রাশিয়া ইউক্রেনের অর্ধেকের বেশি দখল করে নেবে। রাশিয়ার মূল শক্তি হলো রাশিয়া যেসব জায়গা দখল করে নেয়, সেসব জায়গার মানুষও রাশিয়ার পক্ষে থাকে, কেননা তারা সবদিক থেকেই সচ্ছলতা ফিরে পেতে চায়। এর কারণ হলো, একই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ চলছে, রাশিয়া দখল করে নিচ্ছে সেসব অঞ্চল, যেসব অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষই রাশিয়ার পক্ষে থাকতে পছন্দ করে। তাই দখলকৃত অঞ্চল থেকে রাশিয়া তেমন অভ্যন্তরীণ কোনো প্রতিরোধ পাচ্ছে না, বরং সব জায়গা থেকেই রাশিয়ানদের স্বাগত জানানো হচ্ছে। এখন দেখার ব্যাপার এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হয়? এই যুদ্ধ বন্ধ করতে বিশ্বের সব পরাশক্তি মনে হয় ব্যর্থই হচ্ছে।

লেখক: প্রকৌশলী

ফুটবলে কেপ ভার্দের অর্জন, আমাদের শিক্ষা

প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে কি রেয়াত মেলে

শিরদাঁড়া সোজা রাখার শিক্ষা

ডাইরেক্ট কানেকটিভিটির প্রস্তাবটুকুই এ সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক

জলবায়ু পরিবর্তনে হাওরের মাছের ভবিষ্যৎ

একসময় আড্ডায় ‘জীবন’ খুঁজে পাওয়া যেত

মাঠ থেকে বিমানবন্দর: বিশ্বকাপ ফুটবলে বৈষম্যের বহুমুখী চেহারা

প্রধানমন্ত্রীর চীনযাত্রা: কোনো গতানুগতিক সফর নয়

অর্থনীতির অদেখা ভুবন: পুষ্টি, পুঁজি ও মানুষের শ্রম

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: একটি রাজনৈতিক পর্যালোচনা