দেশবাসীর অফুরন্ত শুভকামনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। দেশ-বিদেশের সকল পর্যায় থেকে গ্রহণযোগ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বিএনপি দেশবাসীকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। এই প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে এখন একটু হিসাব-নিকাশের সময় এসেছে।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান বিষয় ছিল দেশের চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া; কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা; বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন সুবিধাসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ বাড়ানো; ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান; বেকার ভাতা; বিনা মূল্যে নারীশিক্ষার ব্যবস্থা করা; জনবহুল স্থানে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা প্রবর্তন প্রভৃতি। এর মধ্যে যদি শুধু চার কোটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের কথাই ধরা হয় তাহলে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারকে মাসে এক হাজার টাকা করে দিলেও বছরে দরকার হয় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর ওপর কৃষক কার্ড এবং অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য আরও বিপুল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা প্রয়োজন হবে। প্রশ্ন হলো, এই টাকার সংস্থান করার মতো অর্থনৈতিক অবস্থায় কি আমরা আছি?
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে তা একটি স্থির অবস্থানে দাঁড়ালেও এখন পর্যন্ত সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। বর্তমান সরকার যখন যাত্রা শুরু করেছে, তখন সরকারের কাঁধে ২৩ লাখ কোটি টাকা ঋণের দায়। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০২৫ সালেও ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সরকারকে বিরাট এক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে নিট বৈদেশিক ঋণ এসেছে ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এই হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৭৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। সব মিলিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে তুলবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা এক অসম বাণিজ্য চুক্তি। ওই চুক্তিটি প্রকাশ করেছে মার্কিন ইউএসটিআর। তাতে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই রকম শর্তসাপেক্ষ চুক্তি নেই। এই চুক্তিতে বাংলাদেশ তুলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের দেড় হাজার পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও উড়োজাহাজ আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি কমানোর শর্তও। উপরন্তু অন্য দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিনিময়ে শুল্কহার কমেছে ১ শতাংশ।
জনপরিসরে বিপুল সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে একমাত্র যুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানি ধরে রাখা। এ-সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশে দেখা যায়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে মোট রপ্তানির ১৯ শতাংশ। এই ১৯ শতাংশ ধরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করতে হবে। তাতে বর্তমানে আফ্রিকা অঞ্চল, চীন ও ভারত থেকে আমদানির তুলনায় প্রতি পাউন্ড তুলায় দাম পড়বে ১০ থেকে ১২ সেন্ট করে বেশি। এই হিসাবে ওই ১৯ শতাংশ পোশাক তৈরির জন্য তুলা আমদানি করলেও তাতে মোট ব্যয় বেশি হবে ৭০০ কোটি (৭ বিলিয়ন) ডলারের বেশি। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিবহনের খরচও পড়বে অনেক বেশি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি উন্মুক্ত হলে এখন পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির মূল খাত কৃষি খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানিতেও আমাদের ব্যয় বেশি হবে। দেশীয় পণ্যের ওপর দেওয়া সরকারি ভর্তুকি কমানো এবং অন্য কোনো দেশ থেকে কী আমদানি করা যাবে এবং যাবে না, সে সম্পর্কেও যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও খবরদারি থাকবে। আবার এই চুক্তি করার দুই দিন আগে জাপানের সঙ্গেও একটা গোপন চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
আগামী দিনে অর্থনীতি, বাণিজ্য ছাড়াও সরকারের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বেশ বড় ধরনের থাকবে বলেই ধারণা করা যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিনই দেশ একটি সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটি উত্থাপন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য হিসেবে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়; আর যেহেতু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধানটি নেই এবং সংবিধানের তফসিলেও এ রকম কোনো পদে শপথের কোনো ফরম নেই—অতএব তাঁরা এখনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারছেন না। যদি জাতীয় সংসদ সংবিধান সংশোধন করে এ রকম একটি বিধান যুক্ত করে, তাহলে তখনই কেবল তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্য যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং যখন জুলাই সনদ চূড়ান্ত হলো; বিশেষ করে যখন জুলাই সনদের ওপর গণভোটের সিদ্ধান্ত হলো, তখন কেন এই জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নটি তোলেননি? বিষয়টিকে জামায়াত ও এনসিপি জুলাই সনদের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে দেখছে। শুধু তা-ই নয়, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেছে। প্রশ্ন সেখানেও রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) যে ওই পদে তাঁদেরকে শপথ পড়ালেন, সেই অধিকার তিনি পেলেন কোথায়? তিনি যে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন, তা তো নির্দিষ্ট একটি বিধানের বলে। কিন্তু এমন কোন আইন কিংবা বিধানবলে তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ পড়ালেন, তার কিন্তু কোনো গ্রহণযোগ্য জবাব নেই।
এ ধরনের আরও অনেক রাজনৈতিক বিষয় বিএনপিকে এবং সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। নির্বাচনের প্রাক্কালে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বিবেচনায় রেখেই সরকারকে এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।