হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সভ্যতার অভিশাপ শিশুশ্রম

লাবনী আক্তার কবিতা

ছবি: সংগৃহীত

শিশুরা হলো ফুলের মতো কোমল। ফুলকে যেমন যত্নে বড় করতে হয়, শিশুদেরও তেমনি যত্ন আর আদরে বড় করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সব শিশু কি যত্নে বড় হয়? বরং অনেক শিশু অবহেলা ও অনাদরে বড় হয়!

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর এক তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন শিশুশ্রমে জড়িত। তার মধ্যে আবার আফ্রিকা মহাদেশে ৮৭ মিলিয়ন শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত, যা পুরো পৃথিবীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। শিশুরা যে শুধু সাধারণ কাজ করছে, ব্যাপারটা এমন নয়, বরং আইএলওর এক তথ্যমতে, প্রায় ৫৪ মিলিয়ন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, যা তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও বিকাশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এক পরিসংখ্যানমতে, ৬২ শতাংশ শিশু কৃষি, ২৭ শতাংশ সেবা/ডোমেস্টিক ও ক্ষুদ্র-ব্যবসা খাতে এবং ১৩ শতাংশ শিল্প খাতে কাজ করছে। অর্থাৎ শিল্পের কনস্ট্রাকশন, ম্যানুফ্যাকচারিং, মাইনিংয়ের মতো ভারী এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের অনুন্নত দেশগুলোতে।

কিন্তু এর পেছনের কারণ কী? যেখানে শিশুশ্রম একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, সেখানে এসব দেশে শিশুশ্রমের হার এত বেশি কেন? আর রাষ্ট্র ও পরিবারের ভূমিকা কী?

শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ হলো, চরম দারিদ্র্য বা অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শিশুশ্রম কিন্তু উন্নত দেশে নেই বললেই চলে। শিশুশ্রম রয়েছে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে, অর্থাৎ যেসব দেশে জনগণের জীবনমান খুবই নিম্ন, উপার্জনের ক্ষমতা তেমন নেই। দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভর করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তাই এসব দেশের পরিবারের অভিভাবকেরা যখন নিজেরা কাজ করে সম্পূর্ণ ভরণপোষণ মেটাতে পারেন না, তখন তাঁদের সঙ্গেই কাজ করতে হয় ওই কোমলমতি শিশুদের।

আর যে দেশের সরকার মুদ্রাস্ফীতি কমাতে পারে না, শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন শিশুরা পরিবারের জন্যই বোঝা হয়ে যায়। শিশুদের লালনপালন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্রের চাহিদা মেটানো পরিবারের পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়ে। শিশুকে যখন স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয় না, তখন ঘরে বসিয়ে রাখার চেয়ে কাজে পাঠানোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ ছাড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষার অভাব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিশুরা কাজ করতে বাধ্য হয়।

অনুন্নত দেশে শিক্ষার হার কম থাকায় মানুষের মধ্যে সচেতনতার হারও কম। ফলে তারা শিশুশ্রমকে অন্যায় বা অনৈতিক হিসেবে দেখেই না বরং তাদের কাছে এটি একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কেউ যখন কোনো অন্যায়কে অন্যায় বলে গণ্য করতে পারেন না, তখন তিনি অন্যায়টিই করতে থাকেন, যা শিশুদের সঙ্গে হয়ে আসছে।

এসব দেশের পরিবারগুলোর উপার্জনের ক্ষমতা যেহেতু কম, সেহেতু তারা শিক্ষাকে একটা বাড়তি ব্যয় হিসেবে দেখে থাকে। অনেক দেশে সরকার বিনা মূল্যে বই দিলেও শিক্ষার বাকি আনুষঙ্গিক খরচ বহন করার ক্ষমতা এসব পরিবারের নেই অথবা অনেক পরিবার শিক্ষাকে শিশুর বেড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় দিক হিসেবে মনেই করে না। ফলে শিক্ষার অভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশুশ্রমের শিকার হয়।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানেও শিশুশ্রমের শোচনীয় অবস্থা বিরাজমান। আমরাও কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিরাট হুমকির মধ্যে আছি। প্রতিবছরই আমাদের দেশে কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া ছিন্নমূল ও নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলো টিকে থাকার জন্য সন্তানদের কাজে লাগাতে বাধ্য হয়।

এ জন্য শিশুশ্রম প্রতিরোধ করতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শিশুশ্রম কমানোর জন্য প্রয়োজন ওই সব পরিবারের আর্থিক সহায়তা করা, প্রতিটি দেশের সরকারের অবশ্যকীয় কর্তব্য। এর পাশাপাশি শিক্ষা অর্জনের ব্যয় কমানো, দুর্যোগে স্বল্পকালীন সাহায্যের পাশাপাশি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে শিশুশ্রম হ্রাস করা সম্ভব।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুশ্রম দেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ফেলে দেয়। তাই প্রতিটি দেশের সরকারের উচিত শিশুশ্রম প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়িত্বশীলতার নতুন চ্যালেঞ্জ

সব জন-আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি: সৈয়দ নিজার

বিশ্বজুড়ে লবণাক্ত জলাভূমি যখন সংকটের মুখে

পাকিস্তান কি আবারও ভাঙনের পথে

আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা-জগৎ

জুলাই কি সফল নাকি ব্যর্থ

স্মৃতির পাতায় সপ্তম মাস

মুখস্থ করাই প্রকৃত শিক্ষা নয়

ক্ষমতা, নৈতিক স্খলন ও নারীর মর্যাদা