বাংলাদেশে ঋতু ছয়টি। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। তবে এই তালিকাটি অসম্পূর্ণ। মধ্যবিত্তের সংসারের জন্য আরও একটি ঋতু আছে, হতাশার ঋতু। সেটি হলো মাসের শেষ ১০ দিন। এই ঋতুর কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর এর পূর্বাভাস দেয় না। টেলিভিশনে এর জন্য বিশেষ বুলেটিনও হয় না। কিন্তু মধ্যবিত্তের রান্নাঘর, বাজারের ব্যাগ এবং পকেটের ভেতর এই ঋতুর আগমন অত্যন্ত স্পষ্ট।
মাসের প্রথম ১০ দিন কিছুটা বসন্তময়। বেতন এসেছে। বাজারের ব্যাগে মাছ, মাংস, সবজি ঢোকে। সন্তানের জন্য কিছু কেনা যায়। কোথাও একটু ঘুরে আসার কথাও মাথায় আসে। দ্বিতীয় ১০ দিনে বাস্তবতা একটু গম্ভীর হয়। তৃতীয় ১০ দিনে ক্যালকুলেটর বের হয়। এই শেষ দশকে শুরু হয় মহাতপস্যা। তখন সংসারে একটি বাক্য সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, ‘এবার একটু দেখে খরচ করো।’ এই ‘দেখে খরচ’ কথাটির অর্থ মধ্যবিত্ত ছাড়া আর কে বুঝবে! মাছ আজ না হলেও চলবে। ডিম তো আছে। মাংস বাদ দেওয়া যাক। ডাল আছে। ফল এই সপ্তাহে না কিনলেও হবে। বাইরে খাওয়া একেবারে বন্ধ। সন্তানের নতুন জুতোটা আগামী মাসে। নিজের কোনো প্রয়োজন থাকলে সেটি আপাতত ‘পরে দেখা যাবে’। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের আর্থিক দর্শনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা সম্ভবত এই ‘পরে দেখা যাবে’।
কিন্তু সেই ‘পরে’ কখনো আসে না। কারণ, পরের মাস এলেই নতুন বিল, নতুন বাজার, নতুন স্কুল ফি, নতুন ওষুধ, নতুন কিস্তি এসে হাজির হয়। ফলে পুরোনো ‘পরে দেখা যাবে’ নতুন ‘পরে দেখা যাবে’র সঙ্গে হাত মেলায়। মধ্যবিত্তের জীবন আসলে এক দীর্ঘ ‘পরে দেখা যাবে’ প্রকল্প!
বাজারে গেলেই বোঝা যায়, দেশের অর্থনীতি কী অবস্থায় আছে। টেলিভিশনে অর্থনীতির বড় বড় সংখ্যা শুনতে ভালো লাগে। প্রবৃদ্ধি কত, মাথাপিছু আয় কত, রিজার্ভ কত, রপ্তানি কত, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজারে গিয়ে মধ্যবিত্তের প্রথম প্রশ্ন হয়, ‘আজ মাছের দাম কত?’ এই প্রশ্নের উত্তরই তার কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে বাস্তব সূচক।
চাল, ডাল, তেল, চিনি, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, প্রতিটি পণ্যের দাম আলাদাভাবে বাড়লে সরকারি হিসাবে সেটি হয়তো ছোট ঘটনা। ৫ টাকা এখানে, ১০ টাকা সেখানে, ২০ টাকা ওখানে। কিন্তু সংসারের বাজেট কোনো বিচ্ছিন্ন পণ্যের বাজেট নয়। সব মিলিয়ে মাসের শেষে এমন এক অঙ্ক দাঁড়ায় যে ক্যালকুলেটরও মাঝে মাঝে আত্মসমর্পণ করতে চায়। একসময় বাজারের ব্যাগ ভারী হতো, পকেট হালকা হতো। এখন পকেটও হালকা হয়, ব্যাগও হালকা থাকে। এটি একধরনের অভিনব অর্থনৈতিক ভারসাম্য।
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সে তার কষ্টের কোনো স্মারক তৈরি করে না। তার ঘরে ভাঙা দরজা থাকে না, খালি হাঁড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে হয় না, সাহায্যের আবেদনও করতে হয় না। সে শুধু নিজের জীবনটাকে একটু একটু করে ছোট করে। বাজারে গিয়ে মাছ কম নেয়। মাংসের পরিমাণ কমায়। ফল কেনা বন্ধ করে। বাইরে খাওয়া বাদ দেয়। ছুটি কাটানো বাদ দেয়। নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেয়। বন্ধুর মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান বাদ দেয়। তারপর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করে, জীবনযাত্রার মান কমাতে কমাতে সে নিজেকেই জীবন থেকে একটু একটু করে বাদ দিয়েছে।
অথচ মধ্যবিত্তের স্বপ্ন কখনো খুব বেশি ছিল না। খেয়ে-পরে সামান্য নিরাপত্তা নিয়ে এবং অবসরের পর কারও কাছে হাত না পেতে চলতে পারা। এগুলো ছিল স্বাভাবিক জীবনের ন্যূনতম আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নের জায়গাটা ফিকে হয়ে গেছে। পরিবহন ভাড়া, ক্রেডিট কার্ডের বিল, সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসা, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট, বাজার—এসব মেটাতেই ফতুর। ফলে মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎ এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে না, ভবিষ্যতের বিল নিয়ে চিন্তা করে। আগে মানুষ সঞ্চয় করত ভবিষ্যতের জন্য। এখন অনেকেই ভবিষ্যতের খরচ সামলাতে বর্তমানের আয়কে আগেভাগেই ভাগ করে ফেলেন। মাস শেষে সঞ্চয় হবে কি না, সেটি বিলাসী প্রশ্ন। আগে মাসটি শেষ হোক।
একজন মানুষ আগের চেয়ে বেশি আয় করেও যদি আগের চেয়ে কম জিনিস কিনতে পারেন, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত উন্নয়ন কোথায়? একজন মা যদি নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে সন্তানের স্কুলের বেতন দেন, তাহলে অর্থনীতির কোন সূচক তাঁকে সান্ত্বনা দেবে? একজন চাকরিজীবী যদি মাসের শেষ সপ্তাহে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে তাঁর আর্থিক নিরাপত্তা কোথায়? পরিসংখ্যান তখন খুব সুন্দর থাকে। শুধু সংসারের খাতাটাই সুন্দর থাকে না।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন মাপার একটি সহজ পদ্ধতি আছে—একজন সাধারণ মানুষ মাসের শেষে কতটা স্বস্তিতে থাকেন। এই জায়গায় রাজনীতির কথাও আসে। কারণ বাজারদর, কর্মসংস্থান, আয়, করব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, এসব ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়। এগুলো রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক দলের কাছেও প্রশ্ন আছে। মাসের ২৫ তারিখে যে মানুষটি বাজারে গিয়ে পাঁচটি প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে দুটি বাদ দেন, তাঁর পাশে রাজনীতি কতটা দাঁড়ায়? যে পরিবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিতে গিয়ে নিজের চিকিৎসা বন্ধ রাখে, তাদের কথা কতটা রাজনৈতিক আলোচনায় আসে? রাজনীতি যদি মানুষের রান্নাঘরে ঢুকতে না পারে, তাহলে মানুষের জীবনে তার গুরুত্বও একসময় কমে যায়।
মধ্যবিত্ত খুব বেশি কিছু চায় না। সে বিপ্লব চায় না। প্রতিদিন সরকারের কাছে হাতও পাততে চায় না। সে শুধু চায় আয় ও ব্যয়ের মাঝখানে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। সে চায় বাজারে গিয়ে প্রতিবার কিছু বাদ দিতে না হয়। সে চায় সন্তানকে পড়াতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখতে না হয়। সে চায় অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চয়ের শেষটুকু ভাঙতে না হয়। সে চায় মাস শেষে হাতে কিছু টাকা থাকুক। শুধু পরের মাসের অপেক্ষা নয়।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, মধ্যবিত্ত নিজের দাবিগুলোও ছোট করে ফেলছে। এখন কোনো রকমে বেঁচে থাকাটাই মধ্যবিত্তের জীবনে বড় স্বপ্ন। মধ্যবিত্তের সংকট সাধারণত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আসে না। সে নিঃশব্দে আসে। প্রতিদিন একটু একটু করে আনন্দ কমায়, সঞ্চয় কমায়, চিকিৎসা পিছিয়ে দেয়, প্রয়োজন কমায়, স্বপ্ন ছোট করে। তারপরও মানুষটি সকালে উঠে অফিসে যায়। সন্তানকে স্কুলে পাঠায়। বাজার করে। বিল দেয়। কর দেয়। হাসে। সামাজিক অনুষ্ঠানে যায়। ফেসবুকে ছবি দেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সব ঠিকঠাকই তো চলছে।
হ্যাঁ, চলছে। শুধু মানুষগুলো একটু একটু করে টেনে নিয়ে চলছে।
মধ্যবিত্তের এই নীরব সংকটই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, যে মানুষ চিৎকার করে না, তার কষ্টকে সহজেই অদৃশ্য বলে ধরে নেওয়া যায়। যে রাস্তায় হাঁড়ি বাজায় না, তার হাঁড়ির শব্দও কেউ শুনতে পায় না। অথচ সেই হাঁড়ির শব্দেই দেশের অর্থনীতির আসল হিসাব লুকিয়ে আছে।
মাসের শেষ ১০ দিন তাই নিছক ক্যালেন্ডারের ১০টি দিন নয়। এটি মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময়। এই ১০ দিন বলে দেয়, আয় কতটা, ব্যয় কতটা, সঞ্চয় কতটা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা কতটা। মাছ বাদ গেল। মাংস বাদ গেল। ফল বাদ গেল। বেড়ানো বাদ গেল। বিনোদন বাদ গেল। তারপর নিজের প্রয়োজনও বাদ গেল। প্রশ্ন হলো, আর কত বাদ যাবে?
রাষ্ট্র তাহলে নাগরিকদের দিচ্ছেটা কী? কেবল হতাশা, টানাটানিই যদি সার হয়, তাহলে এত পথ হেঁটে, এত জল ঘেঁটে আমরা কী পেলাম? আমাদের জীবনে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন হচ্ছে, নাকি শুধু তার খরচের তালিকাটাই কেবল বড় হচ্ছে?
আর মাসের শেষ ১০ দিন যদি মধ্যবিত্তের জন্য ক্রমেই একটি আলাদা দুর্যোগ ঋতু হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের ক্যালেন্ডারে যত জোয়ারই আসুক, সংসারের ক্যালেন্ডারে কিন্তু তখনো লেখা থাকবে, ‘বেতন আসতে আর কত দিন?’
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট