হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

‘দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’

সেলিম জাহান, অর্থনীতিবিদ

বাংলাদেশকে চিহ্নিত করতে হয় তার মানুষের উদ্যম দিয়ে। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

গান ছেড়ে দিয়ে লিখতে বসেছিলাম। লোপামুদ্রা মিত্রের গান। আমার প্রিয় শিল্পী। লিখতে লিখতে টের পাই, পরিচিত গানগুলো শিল্পী গেয়ে ফেলেছেন। এই যেমন ‘মালতী বালিকা বিদ্যালয়’ কিংবা ‘সাঁকো’ অথবা ‘দুবোনের গল্প’। শুনতে থাকি, তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন ‘যে যায়, সে যায়’ কিংবা ‘তর্কে মাতো, তর্কে মাতো’ অথবা ‘এ ঘর যখন ছোট্ট ছিল’। গানগুলোর কথা, সুর আর শিল্পীর গায়কি আচ্ছন্ন করে রাখে আমাকে।

তারপর লোপামুদ্রা গাইতে শুরু করেন ‘ঠিক যেখানে দিনের শুরু, অন্ধ কালো রাত্রি শেষ’। নাহ্, এটা শুনিনি আগে, মনে মনে নিজেকে বলি আমি। তাই কথাগুলো জানা নয়, তবে সুরটা ভারি ভালো লাগে। কিন্তু অন্তরায় এসে কান খাড়া হয়ে যায় আমার—‘এই কাঁটাতার, জঙ্গি বিমান, এই পতাকা রাষ্ট্র নয়, দেশ মানে বুক আকাশ জোড়া ইচ্ছে হাজার সূর্যোদয়।’ কিন্তু তারপরেই সারা গায়ে আমার কাঁটা দিয়ে ওঠে যখন লোপামুদ্রা গেয়ে ওঠেন, ‘এ মানচিত্র জ্বলছে জ্বলুক, এ দাবানল পোড়াক চোখ, আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’।

আমার চারপাশ যেন বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমি চোখের সামনে যেন দেখতে পাই ‘একাত্তরের বাংলাদেশ’। জ্বলছে সারা দেশ শত্রুর দেওয়া আগুনে। ছারখার হয়ে যাচ্ছে গ্রাম-জনপদ। মরছে মানুষ শত্রুর হাতে, অনাহারে, বুভুক্ষায়। জ্বলছে দেশ আর তার মানুষ। পুড়ছে মানচিত্র। তবু ওই তো সারা জায়গায় লোকের পাশে লোক দাঁড়িয়ে—যুদ্ধক্ষেত্রে এক মুক্তিযোদ্ধার পাশে আরেকজন, যশোর রোডের দীর্ঘ সারিতে এক শরণার্থীর পাশে আরেকজন, গ্রামে-গ্রামে এক গ্রামবাসীর পাশে শহর থেকে পালিয়ে আসা এক শহরবাসী। সেখানে ধর্ম বড় নয়, ধনসম্পদ বড় নয়, সেখানে মানুষ বড়। আবেগে আমার চোখ ভরে জল এল, ইতিহাস কথা কয়ে উঠল আমার মনে, আর লোপামুদ্রা তখন গেয়ে চলেছেন, ‘আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’।

আসলেই দেশ মানে তো শুধু একটা ভূখণ্ড নয়, শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, শুধু একটি নাম নয়, শুধু একটি পতাকা নয়, শুধু একটি সংবিধান নয়, শুধু একটি জাতীয় সংগীত নয়। ওগুলো একটি দেশের স্বাধীনতার প্রতীকী নিদর্শন, ওগুলো দেশ নয়। চূড়ান্ত বিচারে একটি দেশ হচ্ছে তার মানুষ, তার জনগণ। মানুষ দিয়েই তো আমরা দেশ চিনি।

একটি দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা, কর্ম দিয়েই একটি দেশ চিহ্নিত হয়। আমরা জানি, কম্বোডিয়া খুব গর্বিত দেশ, কারণ দরিদ্র হলেও দেশটির মানুষের আত্মসম্মানবোধ বড় প্রখর। যদিও ইতালির সবাই নিশ্চয় ঠগবাজ নয়, কিন্তু তার অনেক মানুষের ফন্দি-ফিকিরের কারণে আমরা বলি, ‘ইতালি চোর-চোট্টার দেশ’। ইংরেজদের ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রায়ই মন্তব্য, ‘ইংল্যান্ড হচ্ছে শীতল মানসিকতার দেশ’। মানুষই তো দেশ চেনায়। মানুষের ব্যবহার, আচার-প্রকারই তো একটি দেশের পরিচয়।

এই যেমন, বাংলাদেশকে শুধু নদী-নালার দেশ বলি, তাহলে তার স্বাতন্ত্র্য তেমন করে বেরিয়ে আসে না। অমন ডজনখানেক নদী-নালার দেশের নাম একনিশ্বাসে বলে দেওয়া যাবে। বাংলাদেশকে যদি শুধু দরিদ্র দেশ বলি, তাহলে তার অর্জনকে খাটো করে দেখা হবে এবং তার সম্ভাবনাকেও উপেক্ষা করা হবে। বাংলাদেশকে চিহ্নিত করতে হয় তার মানুষের উদ্যমের দ্বারা, তার সাহসের দ্বারা, তার সংনম্যতার দ্বারা। বাইরের বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে চেনায় যে বাঙালিরা প্রবাসে আছে, তাঁরা। তাঁদের কথাবার্তা, চলা-বলা, আচার-আচরণ দিয়েই বিদেশের লোকজন বাংলাদেশকে চেনে। আমাদের ভালো কাজে যেখানে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়, তেমনি আমাদের খারাপ কাজে দেশ নিন্দিত হয়। আর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে চিহ্নিত হতে হবে তার নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতার দ্বারা, স্বপ্নের দ্বারা, বিশ্ববীক্ষণের দ্বারা।

মানুষ শুধু দেশই চেনায় না, মানুষ মানুষের সঙ্গে থেকে বিন্দু থেকে যে সিন্ধু গড়ে তোলে, সেটাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ধনসম্পদ নয়, পাহাড়-নদী নয়, ইমারত-অট্টালিকা নয়, চূড়ান্ত বিচারে মানুষের সঙ্গে মানুষের সৌহার্দ্য, মানুষে-মানুষে সখ্য, মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। ধর্মের কথা বলে, জাতের কথা বলে আমরা যখন মানুষে মানুষে বিভাজনের দেয়ালটা তৈরি করি, তখন ওই মানবিক বন্ধনটা নষ্ট হয়ে যায়। ওটা নষ্ট হয়ে গেলে দেশ গড়া যায় না। বিভাজিত জনগোষ্ঠী সমাজকে, জাতিকে, দেশকে দুর্বল করে দেয়। আমরা প্রায়ই বলি, দেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশ নষ্ট হয় না, নষ্ট হয়ে যায় দেশের মানুষ। যখন দেশের মানুষ নষ্ট হয়ে যায়, তখনই নষ্ট হয়ে যায় দেশ, সমাজ, জাতি।

যেহেতু সমষ্টিগত মানুষই হচ্ছে দেশের প্রাণ, তাই মানুষই হচ্ছে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, শুধু মাথাপিছু আয়ের বাড়তি নয়, শুধু শিল্পায়ন নয়, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়। উন্নয়ন মানে হচ্ছে সব মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, তাদের সুযোগের সৃষ্টি, সমতার নিশ্চিতকরণ—তাদের সক্ষমতা ও সুযোগের ক্ষেত্রে, তাদের চয়নের ক্ষেত্রটির বিস্তার। চূড়ান্ত বিচারে উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন, মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। সেই মানব উন্নয়নেরই তো আকাঙ্ক্ষা আমাদের, আশা করি উত্তরণের, স্বপ্ন দেখি পরিবর্তনের। বলি মৌসুমী ভৌমিকের মতো, ‘স্বপ্ন দেখবো বলে, দু’চোখ পেতেছি’।

জানি, এই আকাঙ্ক্ষা এক দিনে পূর্ণ হবে না। আমার জীবনকালেও হয়তো হবে না। তবু অনাগত ভবিষ্যতে একদিন হবে। এ-ও জানি, আমাদের কিংবা তার পরের প্রজন্ম দিয়ে এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে না। আমরা নষ্ট হয়ে গেছি। কিন্তু যারা শিশু-কিশোর, যারা এখনো নষ্ট হয়নি, তারা নিশ্চয় এটা পারবে। আমাদের কোনো শিক্ষা হয়নি, কিন্তু তাদের যদি এখনই সঠিক মূল্যবোধ দিয়ে সঠিক পথে পরিচালনা করা হয়, তারা ঠিকটাই শিখবে। জয় গোস্বামীর মতো বলি, ‘বোন, তোকে বলি, এ অস্থি পোড়াবো না, গাছের কোটরে রেখে যাবো এই হাড়, আমরা শিখিনি, পরে যারা আছে তারা, তারা শিখবে না এর ঠিক ব্যবহার।’ এই কাজই আমাদের প্রজন্মের মানুষদের করতে হবে। আমরা যেন হতাশাগ্রস্ত হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থাকি, শুধু ‘সমালোচনার সংস্কৃতি’তে নিজেদের আবদ্ধ না রাখি। আসলে চূড়ান্ত বিচারে নিরাশার কোনো ইতিবাচক দিক নেই।

কোনো এক স্বপ্নের ঘোরে কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেলাম। শুনি এবং টের পাই, ততক্ষণে লোপামুদ্রা গানের শেষ কলি দুটোতে চলে গিয়েছেন, গাইছেন দরাজ গলায়, ‘সব মানুষের স্বপ্ন তোমার চোখের তারায় সত্যি হোক, আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক।’

যুদ্ধ কলঙ্কিত করে বিজ্ঞানীদের অর্জন

মাছের শরীরে বিষাক্ত ধাতু

নিউমুরিং নিয়ে সরকার এখন কী করবে

পাহাড়ের সবুজে স্বপ্নের খামার

তাহলে গোলামিই আমাদের পছন্দ!

শিক্ষায় দুর্নীতি দমনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত

বিজেপি বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয়কেই ভাগ করতে চায়: স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

পয়লা বৈশাখ: সংকোচনের বিপরীতে অসংকোচের শক্তি

বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নই অধিক জরুরি

হরমুজ সংকটে আমাদের করণীয়