হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বৃদ্ধ বয়সে কার সঙ্গে কোথায় থাকবেন?

হাসান আলী

খুব কম মানুষই বৃদ্ধ বয়সে কার সঙ্গে কোথায় থাকবেন, এ নিয়ে ভেবেছেন। মানুষ কঠিন বাস্তবতা মানতে পারেন না বলে কল্পনার রং মাখিয়ে স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখেন, বৃদ্ধ বয়স সম্মানের এবং আনন্দের হবে। বেশির ভাগ মানুষই বৃদ্ধ বয়সের জন্য তেমন কোনো প্রস্তুতি নেন না।

আমাদের দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ ৩০ থেকে ৩৫ বছর কর্মজীবনে থাকেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবেশ করতে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত লাগে। আর ৬০ বছর বয়সে অবসর নেন। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এবং আর্থিক সংগতির ফলে গড় আয়ু আরও বাড়বে।

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ২০ বছর। অদূর ভবিষ্যতে গড় আয়ু ৮০ বছর হবে। জীবনের শেষ দিনগুলো স্বস্তিদায়ক কর্মক্ষম শান্তিপূর্ণ করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নামমাত্র। কেউ কেউ ভাবেন প্রবীণ বয়সে সন্তানসন্ততির সঙ্গে কাটাবেন। ধর্মকর্ম করবেন। ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন করে পুণ্য লাভ করবেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন কিংবা সহযোগিতা করবেন। জমানো ধনসম্পদ দিয়ে ভালোভাবে দিন কাটাবেন।

আরেক দল ভাবেন, সারা জীবন দুঃখ-কষ্টে কেটেছে, আরাম-আয়েশ দূরের কথা, ঠিকমতো খেতে পাননি। শেষ জীবন কেমন হবে, তা নিয়ে চিন্তা নেই। বৃদ্ধ বয়স জীবনের উপহার। জীবনের শেষ ধাপে পৌঁছাতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার। বৃদ্ধ বয়সে সুস্থ থাকতে চাইলে যৌবনেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যেমন পরিমিত আহার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম করতে হবে। ধূমপান, তামাক, অতিরিক্ত চর্বি-লবণ-চিনি পরিহার করতে হবে। আপনি শরীরকে কষ্ট দিলে শরীর আপনাকে কষ্ট দেবে। বেশি খাবার আপনার শরীরের ওজন বাড়িয়ে রোগের বাসা বানিয়ে দেবে। আপনার ধনসম্পদের অংশীদার হতে অনেকেই চাইবে; কিন্তু রোগের যন্ত্রণা নিতে কেউই রাজি হবে না। আপনার শারীরিক কষ্ট আপনাকে একাই বহন করতে হবে। কেন ইচ্ছে করে আপনি এই কষ্ট নেবেন? শরীরের রোগ যত বেশি হবে, তত আর্থিক ক্ষতি হবে। হাসপাতালে আসা-যাওয়া, চিকিৎসা নেওয়া বিরক্তিকর হবে স্বজনদের কাছে। টাকাপয়সা বেশি খরচ হতে শুরু করলে সন্তানদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসবে। কাজের অজুহাত দিয়ে সেবাযত্ন করা থেকে বিরত থাকবে ছেলেমেয়েরা।

যাঁদের টাকাপয়সা আছে তাঁরাই অসুস্থ প্রবীণকে হাসপাতালে রাখবেন অথবা বাসায় ‘সেবাকর্মী’ রাখবেন। দীর্ঘ অসুস্থতা আপনাকে ঘরে আটকে দেবে। এটা আরও কষ্ট এবং বিরক্তির। যেসব প্রবীণ দরিদ্র, তাঁদের দুর্দশার শেষ নেই। ওষুধপথ্য দূরে থাক, আশ্রয় পর্যন্ত মেলে না। অবহেলা, অপমান, অসম্মানের মধ্য দিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করতে হয়। প্রবীণ বয়সে মানসিক সুস্থতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রস্তুতিহীন একজন মানুষ বৃদ্ধ বয়সকে মেনে নিতে চান না।

বয়স লুকানোর চেষ্টা করেন। বৃদ্ধ বয়সের শারীরিক অক্ষমতাগুলোকে মানতে চান না। জীবনের হিসাব মেলাতে পারেন না। অভিযোগ-অভিশাপ-নালিশ করতে থাকেন। নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ের অবহেলা সহ্য করতে পারেন না। সহায়-সম্পত্তি হারানোর আতঙ্ক তৈরি হয়। নিজেকে বোঝা মনে করতে শুরু করেন। পরিবারের সদস্যদের মনোযোগে ঘাটতি হলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। দূরের ঘটনা মনে করতে পারলেও কাছের ঘটনা ভুলে যান।

জিনিসপত্র খুঁজে পান না। পথঘাট ভুলে যান। টাকাপয়সার হিসাব মেলাতে পারেন না। অহেতুক সন্দেহ করার প্রবণতা বাড়ে। এখনকার ছেলেমেয়েরা খারাপ বলে মন্তব্য করেন। বাজারে জিনিসপত্রের অনেক দাম বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যিনি প্রবীণ হবেন তাঁকে এই বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে।

প্রবীণ বয়সে মানসিক সুস্থতা অনেক বেশি জরুরি। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলা এবং নতুন চিন্তাভাবনা যুক্তিসংগতভাবে গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রবীণ বয়সে আপনি কার সঙ্গে কোথায় থাকবেন?

প্রথমত, আপনাকে ভাবতে হবে আপনি একা। পৃথিবীতে আসার সময় একা ছিলেন এবং যাওয়ার সময় একাই যেতে হবে। কারও ওপর নির্ভর করবেন না। কারও আশায় বসে থাকবেন না। প্রত্যাশা যত কম হবে, কষ্ট তত কম হবে।

নিজের সহায়-সম্বল কাউকে দেবেন না। সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণ করুন। অপরের মঙ্গল করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করুন। প্যাঁচ লাগানো এবং ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকুন। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখুন। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতা করুন। নিজের দৈনন্দিন কাজকর্ম নিজের হাতে করতে চেষ্টা করুন। একা থাকার জন্য মানসিক শক্তি ও সাহস বাড়িয়ে তুলুন। কারও অনুগ্রহ-কৃপা-দয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। প্রবীণ মানুষের ক্লাব, সংঘ, ডে-কেয়ার সেন্টার, বৃদ্ধনিবাস, হাসপাতাল গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখুন। প্রবীণের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হোন। উন্নয়ন ও আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে নিজের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে তুলুন।

আপনার বার্ধক্য আপনাকে সামলাতে হবে। অতএব সময় থাকতে নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিন। 

লেখক: সভাপতি, এজিং সাপোর্ট ফোরাম

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কি অস্বস্তিগুলো কাটল

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও মেধাবীদের দীর্ঘশ্বাস

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে কিছু কথা

পথের শেষ কোথায়, খেয়াল নেই

জাতীয় নির্বাচন এবং দুটি কথা

বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে

অনেক কিছুই নির্ভর করছে সেনাবাহিনীর ওপর

আজকের জগৎটি অবিশ্বাস আর অনাস্থার

তিমিসমাজ যা শেখাতে পারে

ভ্যাপের বিরুদ্ধে আরও প্রচার প্রয়োজন