বর্তমান বিশ্বে সবকিছুর মূলে দাঁড়িয়েছে অর্থ। অর্জন নয়, শিক্ষা নয়, শুধু স্বপ্ন একটাই—টাকা! এত টাকা দিয়ে কী হবে বা একজন মানুষের কত টাকা দরকার? তা নির্ধারণের জন্য যে সংস্কৃতি দরকার, সেটা প্রায় অনুপস্থিত। বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে দর্শকদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে, অমুক খেলোয়াড়টি কত টাকা পান?
নানা ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে আর ইসরায়েলকে সরাসরি মদদ দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সরাসরি আক্রান্ত হচ্ছে আর পরোক্ষভাবে সারা পৃথিবীও। এই পরোক্ষভাবটাও আসলে প্রত্যক্ষ। মুদ্রাস্ফীতি ডেকে আনছে। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে। জীবনযাপনে অনিশ্চয়তার ছাপ প্রতিটি মানুষের মধ্যে। বিশ্বকাপ এসব সমস্যাকে সমাধান করতে পারেনি বরং কিছুদিনের জন্য আড়াল করবে। যেমন পাকিস্তান বনাম ভারতের ক্রিকেট খেলা, পাকিস্তানে যখন রাষ্ট্রীয় সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, তখন একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হয়। তারা বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করে এবং মানুষ বিজয়ী হলে তাদের দৈনন্দিন সংকটটি ভুলে যায় বিজয় উল্লাসের মতোই।
দক্ষিণ আমেরিকার দুটি দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবলে অত্যন্ত দক্ষ। কিন্তু সম্পদের দিক থেকে এত ধনী হওয়া সত্ত্বেও সেসব দেশের মানুষ দরিদ্র। এই দরিদ্র মানুষগুলো ফুটবল নিয়ে যতটা ব্যস্ত, ঠিক ততটা শ্রেণিসংগ্রাম নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক শোষণের জাঁতাকলে তারা পিষ্ট। পুরো লাতিন আমেরিকাজুড়েই ফুটবলের ব্যাপক উন্মাদনা। কলম্বিয়ার মতো দরিদ্র দেশও ফুটবলে মাতোয়ারা, সেসঙ্গে ভয়ংকর মাদকের ছড়াছড়িও আছে। সারা লাতিন আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম একসময় তীব্র হয়ে উঠেছিল। তার মধ্যে কিউবা মুক্তি পেয়েছে, বাকিরা এখনো পশ্চাৎপদতা মেনে নিয়েছে। অথচ শিল্প-সাহিত্যে এই দেশগুলো কী পরিমাণে অগ্রসর! প্রতিটি মানুষের ব্যাপক পাঠাভ্যাস, সাহিত্যের আন্দোলন তীব্র, তবু দারিদ্র্য এবং শোষণ পাশাপাশি চলছে।
ক্রীড়া সংস্কৃতির এই প্রভাব আমাদের দেশেও চলে এসেছে। একদা ফুটবল খুব জনপ্রিয় ছিল, শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে ফুটবলের চর্চা ছিল ব্যাপক। কিন্তু কয়েক দশক ধরে ফুটবলের পতন হয়েছে এবং সেই জায়গায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ক্রিকেট। পৃথিবীর খুব কমসংখ্যক দেশ ক্রিকেট খেলে। কিন্তু ক্রিকেটে পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাইলেজ অনেক বেশি পাওয়া যায়, সারা দিন ধরেই দর্শকেরা ক্রিকেটের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনও গলাধঃকরণ করে। পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য ক্রিকেট খেলার জুড়ি নেই। অন্যদিকে ফুটবলের সময় সংক্ষিপ্ত মাত্র ৯০ মিনিট, এর মধ্যে বিজ্ঞাপনের জায়গাইবা কতটুকু? ক্রিকেটে লগ্নি বেশি আর ফুটবলে খুব কম। স্কুল, কলেজ ও গ্রামে একটা ফুটবল ম্যাচ হলেই সারা গ্রাম আনন্দে উত্তেজনায় ব্যস্ত থাকে। ব্রিটিশের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রীড়া সংস্কৃতিতে ক্রিকেট যুক্ত হয় ধনীদের খেলায়। পরবর্তীকালে মধ্যবিত্তের মধ্যেও ক্রিকেটপ্রেমীদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ক্রীড়া সব জাতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য ক্রীড়ার প্রয়োজন অপরিসীম। ক্রিকেট ও ফুটবল ছাড়াও আমরা একসময় অ্যাথলেটিকের ব্যাপক প্রচলন দেখেছি, সেই সঙ্গে আমাদের কিছু জাতীয় খেলা যেমন হাডুডু এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। স্কুল, কলেজে ক্রীড়া সংস্কৃতি একসময় খুবই প্রবল ছিল। সেখানে অ্যাথলেটিকস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যচর্চা বাধ্যতামূলক ছিল। সেই সঙ্গে ছিল সংস্কৃতিচর্চা—গান, নাটক, নাচ, আবৃত্তি, গল্পবলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এসবও মুখ্য চর্চার মধ্যে ছিল। সেসব এখন নিয়মের জালে আবদ্ধ।
প্রতিটি স্কুলে দেয়াল পত্রিকা খুবই জনপ্রিয় ছিল। দেয়াল পত্রিকার যারা লেখক ছিল, তারা একধরনের গৌরব বোধ করত এবং সেখান থেকে লিটল ম্যাগাজিনের সূত্রপাত হতো। এই লিটল ম্যাগাজিনই পরবর্তীকালে অনেক লেখকের জন্ম দিয়েছে। আজকের দিনে সিনেমা, টেলিভিশনের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি মোবাইল ফোন দিয়ে এই কাজটি করা সম্ভব। শিশু-কিশোরেরা এমনকি বয়স্ক মানুষেরা দিন-রাত ব্যস্ত থাকে এই মোবাইল ফোন নিয়ে। সেখানে ফেসবুক, ফেসবুকের রিল খুবই জনপ্রিয়। এসবই তাৎক্ষণিক একটা আনন্দের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যেসব বিনোদন যেমন একসঙ্গে সিনেমা দেখা, সবাই মিলে গান শোনা, নাটক দেখা, নৃত্যানুষ্ঠান উপভোগ করা—এসবের জায়গা দখল করেছে ওই ছোট্ট ফোনসেটটি। মানুষ এত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জ্বরে ভুগছে যে তার মনোযোগ ওই ছোট্ট জায়গাটি। আশপাশের মানুষ বা সমাজ তার কাছে কোনো ঘটনাই নয়।
আমরা জানি মানুষ বাঁচে মানুষের উষ্ণতায়, তার চারপাশের সামাজিক বৃত্তটাকে নিয়ে। এই বৃত্তটা আস্তে আস্তে বড় হয় কিন্তু বর্তমানের ইন্টারনেট সংস্কৃতি এই বৃত্তকে ছোট করে ফেলেছে। এখন মানুষ মানুষকে শোনে ফেসবুকে। জীবন্ত মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক দিনে দিনে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো বড় খেলাগুলোও আশ্রয় নিয়েছে ওই ছোট্ট ফোনসেটটিতে। মুষ্টিমেয় লোক মাঠে খেলা দেখতে যায়। কিন্তু অধিকাংশই আনন্দ পায় পর্দায় খেলা দেখতে, আর সেই পর্দাটি এত ছোট হয়ে এসেছে যে মানুষকে শুধুই সংকীর্ণ করে দেয়। একসময়ে ফুটবল, ক্রিকেট নিয়ে সাহিত্যও রচিত হতো এবং সেই সাহিত্য যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেত। আজকাল সেসব কালজয়ী ক্রীড়া লেখকেরাও নেই, বরং একজন কৃতী খেলোয়াড় কী পরিমাণ টাকা উপার্জন করেন, সেটাই আলোচনার বিষয়। অভিভাবকদেরও উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁদের সন্তানদের ক্রিকেট খেলা শেখানো। সেটা খেলাকে ভালোবেসে নয় কিন্তু। একবার সন্তান যদি ভালো খেলোয়াড় হতে পারে তাহলে কত টাকা উপার্জন করবে, সে উদ্দেশ্য থেকে।
বর্তমান বিশ্বে সবকিছুর মূলে দাঁড়িয়েছে অর্থ। অর্জন নয়, শিক্ষা নয়, শুধু স্বপ্ন একটাই—টাকা! এত টাকা দিয়ে কী হবে বা একজন মানুষের কত টাকা দরকার? তা নির্ধারণের জন্য যে সংস্কৃতি দরকার, সেটা প্রায় অনুপস্থিত। বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে দর্শকদের আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে, অমুক খেলোয়াড়টি কত টাকা পান? টাকার হিসাবের পাশাপাশি তাঁর অনুশীলন, তাঁর জীবনসংগ্রাম, কোথা থেকে উঠে এসেছে, তার ইতিহাস জানার আগ্রহ অত্যন্ত কম। পৃথিবীর সব কৃতী মানুষই একটা কঠোর সংগ্রামের ইতিহাস ধারণ করেন। সেই সংগ্রামকে টাকার চেয়ে বড় করে দেখলে একটা অন্য ধরনের আত্মজাগরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশ্ব ক্রিকেটে আমাদের একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে, যেহেতু অল্প কটি দেশই খেলার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু গণমানুষের যে খেলা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যেখানে যুক্ত, সেখানে আমাদের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। শুধু আমরা নই, আমাদের প্রতিবেশী দেশ যেখানে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বসবাস, সেখানেও একই পরিস্থিতি। এশিয়ার খুব অল্পসংখ্যক দেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিয়ে থাকে, এর কারণ কি আমাদের পুষ্টিহীনতা? জাতীয় স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের অবহেলা, এটাও একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একসময় বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা এশিয়ার বড় বড় ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে যেতেন। পাকিস্তানিদের প্রচুর অবহেলার মধ্যেও বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু এখন দেশে ফুটবলের অবস্থা নড়বড়ে অথচ ফুটবলই হতে পারত আমাদের দেশের জাতীয় খেলা। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা অথবা সমতলের গারোরা কী চমৎকারভাবে নারী ফুটবলে কৃতিত্ব দেখাচ্ছে। একবার আমি নিজেও চেষ্টা করেছিলাম যে বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের জন্য একটা বিশেষ ব্যবস্থা করা যায় কি না। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। প্রচুর সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। স্বজনপ্রীতি, অবহেলা ও নেতৃত্বের অভাবে ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কোনো কাজেই বেশি দূর এগোতে পারেনি।
বিশ্বকাপ আসে, আর আমরা বিদেশি খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে জয়-পরাজয়ের আনন্দ-বেদনায় হাসি-কাঁদি। কিন্তু আমরা একটি স্বাধীন দেশ, তার খেলার উন্নতির কথা ভাবি না! যদি বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে আমাদের বাংলাদেশের দল কখনো যুক্ত হয়, তাহলে এটা যে কত বড় গৌরবের বিষয় হবে, তা আমরা ভাবতেই পারি না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের এখনই একটা দ্রুত পরিকল্পনা প্রয়োজন যে সারা দেশে খেলোয়াড়দের কী করে অনুপ্রাণিত করা যায়, কীভাবে তাদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায়, এসব ভাবনার এখন খুবই দরকার। ফুটবল ক্রীড়া সংগঠকদের উচিত হবে সরকারের সঙ্গে বসে একটা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা, যার ভিত্তিতে ফুটবল নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দৃশ্যমান করা যায়।
মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব