হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

এপস্টেইন ফাইলস

আলোকিত পৃথিবীর অন্ধকার দিক

রাজিউল হাসান

এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট বাকি নথিপত্র প্রকাশ হলে যে কী হবে, তা এখনো কল্পনা করা কঠিন। ছবি: এএফপি

বিশ্বজুড়ে এখন ভূমিকম্প চলছে। সেই ভূমিকম্পের উৎস যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত এক ব্যক্তি। এমন ‍ভূমিকম্পে এর আগেও একাধিকবার কেঁপে উঠেছে বিশ্ব। প্রথমবার ভূমিকম্পটা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে উইকিলিকসের তথ্য ফাঁসের কারণে। তবে সেই ভূমিকম্প ভয়ানকভাবে বিশ্বটাকে নাড়িয়ে দেয় ২০১০ সালে ইরাক যুদ্ধসহ বিভিন্ন নথি ফাঁস করে। এর পরের ভূমিকম্পটা আঘাত হানে ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল, পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি নামে।

এই দুই ভূমিকম্পের পরাঘাত আজও অনুভূত হয়। এর মধ্যেই নতুন করে এক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, এপস্টেইনের নথিপত্র প্রকাশ নামে। বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া আগের দুই ঘটনার সঙ্গে এবারের ঘটনার অবশ্য বড় পার্থক্য আছে। প্রথম ঘটনায় জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের হাত ধরে উইকিলিকস মার্কিন কর্তৃপক্ষের লুকিয়ে রাখা তথ্য ফাঁস করেছে। দ্বিতীয় ঘটনায় ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) ও শতাধিক সংবাদমাধ্যম একযোগে বিশ্বজুড়ে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশ করেছে। আর এবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নির্দেশে নথিগুলো প্রকাশ করেছে খোদ মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

এপস্টেইনের নথিপত্র প্রকাশের ঘটনায় আমরা এখন জানতে পেরেছি ক্ষমতার জন্য মানুষ কী করতে পারে! পুরো দুনিয়ার ক্ষমতাধরদের দালাল হয়ে ওঠা একজন ব্যক্তি কীভাবে বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থায় প্রভাব রাখতে পারেন, সেই সুযোগে তিনি কীভাবে যৌন কেলেঙ্কারি করতে পারেন, কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে যৌনতার জন্য শিশু পাচার করতে পারেন। সেই কাজটি তিনি করেছেন গণতন্ত্র, মানবাধিকার চর্চা সমুন্নত রাখতে দুনিয়াজুড়ে প্রচার চালানো খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বসে। এটা ঠিক যেন আলোকিত পৃথিবীর এক অন্ধকার দিক।

জেফরি এপস্টেইন ছিলেন যৌন সহিংসতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত একজন আসামি। ২০০৮ সালে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়ায় গিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের মামলার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকার যদি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিত, তাহলে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারত। কিন্তু আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফারফা করে তিনি ১৮ মাসের জন্য কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। সেই কারাদণ্ডেও তিনি সপ্তাহে ছয় দিন ১২ ঘণ্টার জন্য অফিস করার সুযোগ পেতেন। এভাবে ১৩ মাস কাটার পর এপস্টেইনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে এই লোকদেখানো কারাদণ্ড এপস্টেইনকে শোধরাতে পারেনি। বরং তাঁকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। ফলস্বরূপ ২০১৯ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। এবার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যৌনতার জন্য শিশু পাচার। এ দফায় আর রেহাই পাবেন না অনুধাবন করেই হয়তো ওই বছরই ম্যানহাটানের কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন।

এপস্টেইনসংশ্লিষ্ট নথিগুলো প্রকাশ করা হবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলছে। অবশেষে আদালতের নির্দেশে নথিগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। এর পর থেকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত পরিসরসহ সব জায়গায় এ নিয়েই আলোচনা চলছে। এসব নথিপত্রে কার নাম আসেনি, সেটাই যেন এক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ধনকুবের ইলন মাস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—সবার নামই যেন আছে এসব নথিতে।

অবশ্য এপস্টেইন নথিতে নাম থাকা মানেই যে তিনিও শিশু পাচার কিংবা যৌন সহিংসতার অপরাধে অপরাধী, তা কিন্তু নয়। আবার সবাই যে ধোয়া তুলসী পাতা, সেটাও নয়।

এপস্টেইন ফাইলের ঘটনাগুলো কিংবা সেখানে স্পষ্ট হওয়া শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা বা নৃশংসতা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এসব বিষয় নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এরই মধ্যে বহু প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, আরও হবে। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াজুড়ে ক্ষমতাধরেরা কেন এমন একজন দাগি আসামিকে প্রশ্রয় দিলেন, তাঁকে ‘দালাল’ হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন প্রশাসনের বদান্যতা আদায়ের চেষ্টা করলেন, তার ওপর আলোকপাত করা।

এপস্টেইন কেমন মানুষ, তা সবারই জানা ছিল। এপস্টেইনসংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ হলে কেন কোন রথী-মহারথীর নাম প্রকাশ হবে, তা-ও জানা ছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষের। আর এ কারণেই তারা এসব নথি প্রকাশ নিয়ে গড়িমসি করেছে, করেছে নানা টালবাহানা। কিন্তু আদালতের নির্দেশে শেষ অবধি সেগুলো প্রকাশ করতে হয়েছে। অবশ্য এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। বলা চলে, এপস্টেইনসংশ্লিষ্ট অর্ধেক নথিপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। তাতেই পুরো দুনিয়া কেঁপে ‍উঠেছে। বাকি অর্ধেক প্রকাশ হলে যে কী হবে, তা এখনো কল্পনা করা কঠিন।

আমরা যদি এপস্টেইনকে নিয়ে একটু পড়ালেখা করি, তাহলে বুঝতে পারব, তাঁর এমন দানব হয়ে ওঠার পেছনে মার্কিন শাসনযন্ত্রের ভেতরকার মানুষগুলোর সঙ্গে সখ্য বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, এপস্টেইনের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এ কারণেই তাঁর সঙ্গে যেমন ডেমোক্র্যাট নেতা বিল ক্লিনটন, হিলারি ক্লিনটনদের সখ্য ছিল, একইভাবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গেও রয়েছে সখ্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পর্কে নথিপত্রে যেটুকু এসেছে, তা নিয়ে আমরা একটু ভাবলেই বুঝতে পারি, এপস্টেইন আসলে মার্কিন প্রশাসনযন্ত্রে গেড়ে বসা একটি ‘অসুখ’ ছিলেন। সেই ‘অসুখের’ কাছেই ধরনা দিতে হতো বাকি বিশ্বকে। মোদিকে যেমন ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ভাই অনিল আম্বানির মাধ্যমে এপস্টেইনের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, একইভাবে দুনিয়ার অন্যদেরও নানা কারণে এপস্টেইনের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে।

এ কারণেই এপস্টেইনকে আমরা ‘অসুখ’ বলছি। কারণ, তিনি মার্কিন প্রশাসনের নিয়োগ করা কেউ ছিলেন না। কিন্তু তিনি মার্কিন প্রশাসনের হয়ে দুনিয়াজুড়ে ‘দালালি’ করতেন। বিশ্বের সব ক্ষমতাধর নানা উদ্দেশ্যে এপস্টেইনের কাছে ধরনা দিতেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এপস্টেইনও সেসব কাজ করে নিজের ফায়দা লুটতেন।

এপস্টেইনের এই নথিপত্র প্রকাশের ঘটনা আসলে আমাদের জন্য, মানবসভ্যতার জন্য একটি সতর্কবার্তা; ক্ষমতাধরদের চরিত্র, প্রকৃত চেহারা চেনার বড় সুযোগ। এপস্টেইনদের এপস্টেইন হয়ে ওঠা ঠেকাতে হলে বিশ্বজুড়েই শাসনব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি। না হলে এক এপস্টেইনের বিদায় ঘটবে, অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো চেহারায় আরেক এপস্টেইনের আবির্ভাব ঘটবে। এই এপস্টেইন শিশুদের ওপর যে নারকীয় অত্যাচার করেছে কিংবা অত্যাচারের সুযোগ করে দিয়েছে, তার বিচার হওয়াও জরুরি। অনেকে হয়তো বলবেন, এপস্টেইন তো মরেই গেছেন, বিচার হবে কীভাবে? মরণোত্তর বিচার হওয়া সম্ভব, এপস্টেইনের কেলেঙ্কারিগুলোর সঙ্গে জড়িত কিংবা প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব। এখন দেখার বিষয় আইন ও বিচারব্যবস্থা কী করে!

নব্য-বাস্তববাদের আলোকে চির অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ

ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাব

চীনকে মোকাবিলায় বাংলাদেশকেন্দ্রিক মার্কিন পরিকল্পনার বিপদ

উন্নয়নই একমাত্র সমাধান নয়

বেহেশতের টিকিট কিংবা ফ্রি ইন্টারনেট

এ দেশে আসে না ফাগুন, আসে যে ফেব্রুয়ারি

ঢাকার যানজট কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কমিটমেন্ট: অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান

ফেব্রুয়ারি তুমি কার—ভাষার নাকি নির্বাচনের

গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি বনাম প্রক্রিয়াগত অনুমোদন

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়