হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সংস্কৃতির বহমানতায় বাধা টিকবে তো

আজাদুর রহমান চন্দন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটি নজিরবিহীন। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রীতিমতো পণ্ড করে দিয়েছে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।

১৮ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে অনুষ্ঠান চলাকালে মাদ্রাসার একদল শিক্ষার্থী তাতে বাধা দেয়। এর জের ধরে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও বাধে। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ ঘটনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। দেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার ঘটনা নতুন না হলেও খোদ পুলিশের নিজস্ব এলাকায় তাদেরই অনুষ্ঠানে এমন আক্রমণ নজিরবিহীন। বাধা দানকারীরা শুরুতে মধ্যরাতে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর অজুহাত দেখালেও পরে দাবি তোলে, ভবিষ্যতেও পুলিশ সেখানে এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি যতটা না অবাক হওয়ার মতো তার চেয়ে ঢের বেশি

অবাক হওয়ার মতো মন্তব্য পাওয়া যায় এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ২২ আগস্ট ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এ রকম যে গানবাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আরকি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার সেটা নিয়েছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর অনেককে প্রশ্ন করতে শুনেছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি তবে ‘বাংলাদেশের কান্দাহার’ হয়ে গেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি মেনেই নিয়েছেন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তালেবানি শাসন চলবে?’ প্রশ্ন ওঠে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গানবাজনা বা সংস্কৃতিচর্চা নিষিদ্ধ কে করেছে? ‘বহু বছর’ বলতে মন্ত্রী কোন সময়কে বোঝাতে চাইছেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যের সমালোচনা হয় জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও।

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি কালচারাল জেলা, সেখানে গানবাজনা-সিনেমা বন্ধের মতোই।’ হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্য ঘিরে ফুঁসে ওঠে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। অবস্থা বেগতিক দেখে পরে হাসনাত নিজেই স্বীকার করেছেন, নৌকাবাইচ বন্ধের স্থান হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম বলাটা তাঁর তথ্যগত ভুল ছিল। প্রকৃত স্থান ছিল সিলেট। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করে হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যে অনেক সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ কিংবা বিচলিত হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ সম্পর্কে যাঁরা ওয়াকিবহাল, তাঁরা এতটুকু বিস্মিত হননি। কারণ সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়েছিল, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দল হলো জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে এই দলটির এক নেতাকে জোটের মনোনয়ন দেওয়ায় রুমিন ফারহানার মতো নেত্রী দল ছাড়তে বাধ্য হন। যদিও নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হন রুমিন ফারহানা। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম আবার হেফাজতে ইসলামেও আছে। কাজেই দলটিকে বিএনপি খুশি রাখতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেদিন পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেওয়া হয়, তার পরদিনই বিকেলে কয়েকটি ব্যান্ডের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল কিশোরগঞ্জে পুরোনো স্টেডিয়ামে। কয়েকটি ব্যান্ডের কনসার্ট স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’র আপত্তির কারণে কনসার্টটি স্থগিত করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। কনসার্টটি বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আগের দিন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিল ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’। যদিও কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন যুক্তি দেখিয়ে বলে, কনসার্টটি হওয়ার কথা ছিল স্থানীয় আলিশান রেস্তোরাঁর আয়োজনে। তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, হোটেল নিবন্ধন আইন অনুযায়ী তারা কোনো আবেদন করেনি, হোটেলের লাইসেন্সও নেয়নি। যে প্রতিষ্ঠান বৈধ না বা অনিবন্ধিত, তাদের কোনো কাজে সম্মতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমন যুক্তির পর আর কোনো কথা চলে!

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধ করার দাবি নিয়েও সম্প্রতি কিছু লোক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখির পাশাপাশি সভা করে তারা এ দাবি জানায়। বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নে লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এবারও বার্ষিক নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। ২৮ আগস্ট এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। চলতি বছর নৌকাবাইচের বিষয়টি প্রচার হওয়ার পরপরই এক সপ্তাহ ধরে ‘লাউতা ইউনিয়ন তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে কিছু লোক প্রতিযোগিতাটি বাতিল করার দাবি জানিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালাতে থাকে। পাশাপাশি একই ব্যানারে স্থানীয় বারইগ্রাম বাজার মসজিদে একটি সভা করেও তারা এ দাবি জানায়। যা হোক, শেষে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এবারের মতো নৌকাবাইচটি সম্পন্ন হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, শুধু গানবাজনা, নাটক-পালাই নয়; যা কিছু বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, তার প্রতিটির বিরুদ্ধেই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে একদল মানুষ নানা ব্যানারে ধর্মকে শিখণ্ডি করে। সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই প্রতিবন্ধকতা অবশ্য এ দেশে নতুন নয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে রবীন্দ্রচর্চায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছিল। যেসব অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতা থাকত, সেখানেই হামলা ও ভাঙচুর চালাত পাকিস্তানি শাসক চক্রের দোসরেরা। পাকিস্তানি শাসকদের মনে হয়েছিল, পাকিস্তানে আর যা-ই থাক রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই তারা একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছিল বাঙালির ওপর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই যে ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তখনকার সেনাশাসক আইয়ুব খান ও তাঁর অনুচরেরা পাকিস্তানে বিশেষ করে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনে বাধা দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর এ দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সে সময় পাকিস্তান সরকার রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর গান নিষিদ্ধ করে দেয়; কিন্তু বাঙালিরা তবু নানাভাবে তা প্রচার করতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যতই বাধার প্রাচীর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে, বাঙালি তত বেশি প্রতিবাদী হয়েছে।

ষাটের দশকে আইয়ুব খানের তাঁবেদার গভর্নর মোনায়েম খানের কিছু কথাবার্তা হাসির খোরাক জুগিয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে তাঁর শুচিবাই ছিল অত্যন্ত প্রবল। কোনো বিধিনিষেধেও রবীন্দ্রচর্চা বন্ধ করতে না পেরে মোনায়েম খান নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল হাইকে অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, ‘আপনারা রবীন্দ্রসংগীত লিখতে পারেন না?’ সে সময় রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রকাব্য আর রবীন্দ্রসংগীত হয়ে উঠেছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহের এক উজ্জীবনী শক্তি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা উচ্চারিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে কণ্ঠে।

বাধার মুখে জনতার প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি নজির কিন্তু দেখা গেছে অতি সম্প্রতিও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও বিজয়নগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর শোভাযাত্রায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর প্রতিবাদে বিজয়নগরে একপর্যায়ে সাধারণ জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ধাওয়াও দেয় কওমিপন্থীদের। সিলেটে নৌকাবাইচ আয়োজনে বিরোধিতার খবর যত ছড়িয়েছে ততই বেশি করে নানা স্থানে নৌকাবাইচ আয়োজনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকেরা রাজনীতির ক্ষুদ্র স্বার্থে যতই মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করুন না কেন, এ দেশের সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষ অতীতে যেমন সব ধরনের অন্যায়-অবিচার ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে, ভবিষ্যতেও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। সংস্কৃতির বহমানতায় যত বেশি বাধা আসবে, ততই তা আরও বেগবান হবে।