প্রতিবছরের মতো এ বছরও যথানিয়মে ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট সংসদে পেশ করা, পাস করানো একটি গতানুগতিক ব্যাপার। প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ বৃহস্পতিবার বাজেট পেশ করা হয়, সংসদে ৩০ জুন পাস হয়, এটাই রীতি। এ বছর একটু ব্যতিক্রম। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম বৃহস্পতিবার না হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ বৃহস্পতিবারে সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এর কারণ কী, তা বোধগম্য নয়। তবে যেহেতু বাজেট নিয়ে আলোচনা করার জন্য শক্ত বিরোধী দল নেই, তাই হয়তো সংসদে বাজেট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, আলোচনা-সমালোচনা এসব একটু কম হবে, সময় কম লাগবে। তাই হয়তো বরাবরের রীতির একটু বিপরীত, দ্বিতীয় সপ্তাহে বাজেট পেশ হয়েছে। আর একটা ব্যতিক্রম হলো, নির্বাচিত সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, বাজেট পেশের পরপরই সরকারি দলের পক্ষ থেকে—‘সাধারণ মানুষের কল্যাণের বাজেট’, ‘যুগোপযোগী বাজেট’—এই ধরনের ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল বের হয়।
প্রথমে মনে হবে সাধারণ মানুষের জন্য যুগোপযোগী বাজেট। যেমন চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেলসহ অনেক নিত্যপণ্যের ওপরে শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। ৬০টি পণ্যের ওপরে বলতে গেলে শূন্য শুল্ক করা হয়েছে—০.৫ শতাংশ শুল্কহার—শূন্যের কাছাকাছি। এখন সবাই ভাবতেই পারেন, আগামী বছর জীবনযাত্রার মান সহজ হবে, সস্তায় ভোগপণ্য কেনা যাবে, জীবন সহজ হবে।
আরও লক্ষণীয় ব্যাপার হলো—এ বছর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট অনেক বাড়ানো হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ খাতেও। মনে হবে, আমরা চাহিদামতো স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্পন্ন শিক্ষা পাব। এটা আমাদের আকাঙ্ক্ষা, আমরা এ আশা করতেই পারি। তবে বাস্তবতা কী বলে, বিগত দিনে আমরা কী দেখেছি—তার ওপর ভিত্তি করে খুব একটা যে আশাবাদী হওয়া যাবে, তেমন মনে হয় না। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বাজেট বৃদ্ধি পেলে সেবা পাওয়া যাবে—এমন কোনো কথা নেই।
আমাদের দেশে অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে শিক্ষার মান উন্নয়ন দরকার। শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষকদের যথাযথ ট্রেনিং দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করতে হবে। আর দরকার একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা।
আমাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৬ হাজার মেগাওয়াট। গড়পড়তা আমাদের দরকার প্রতিদিন ১৫ হাজার মেগাওয়াট। এখানে দরকার বিদ্যুৎ বিভাগের যথাযথ পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যথাসময়ে মেরামত করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা। সবচেয়ে যে জিনিসটির দরকার সেটা হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানির ব্যবস্থা করা। আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রায়ই বন্ধ থাকে জ্বালানির অভাবে।
তবে একটা আশার কথা হচ্ছে, আগামী আগস্ট থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। সে ক্ষেত্রে অনেকটা লোডশেডিং কমে আসবে এবং এই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও অনেক কম।
এবার বাজেটের মূল আলোচ্য বিষয় হবে রাজস্ব আহরণ। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে হবে। গত বছরের লক্ষ্যমাত্রা এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি আছে। জুলাইয়ের ১০ তারিখের মধ্যে এই ১ লাখ কোটি টাকা আদায় হবে বলে মনে হয় না। পরিসংখ্যান বলে, প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি থাকবে। এই ঘাটতি নিয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো খুব একটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। আমাদের রাজস্ব সাধারণত পরোক্ষ কর নির্ভর। এই পরোক্ষ কর হলো ভ্যাট এবং কাস্টমস ডিউটি। যদি নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি না হয়, তাহলে কাঁচামাল আমদানি হবে না। মূল্য সংযোজন কর অর্থাৎ ভ্যাট আদায় হবে না। আবার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যদি কমে যায়, তাহলে ভোগ্যপণ্য আমদানি কম হবে, কাস্টমস ডিউটি আদায় করা কষ্টসাধ্য হবে। সে ক্ষেত্রেও রাজস্বের ঘাটতি থেকে যাবে। আয়করের ক্ষেত্রে যে অতি দ্রুত চিত্র বদলে যাবে, সে রকম মনে হয় না। মানুষের দৈনন্দিন আয় খুব একটা বাড়েনি। মানুষের আয় না বাড়লে তো আয়করের ঘাটতি থেকেই যাবে।
গত বছরের চিত্র বা এ বছরের শুরুতে যে রকম লক্ষণ দেখা গেছে, তাতে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যে নেই। আর তাদের কর থেকে আয়করের জোগান সামান্যই। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ সে রকম চোখে পড়ছে না। ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি আগের তুলনায় কোনোক্রমেই বৃদ্ধি পায়নি। প্রতিষ্ঠান আয়কর যদি না বাড়ে, তাহলে আয় করার ক্ষেত্রে উন্নতি খুব একটা হবে না। ব্যক্তি শ্রেণির আয়করের ক্ষেত্রে যতই চাপাচাপি করা হোক না কেন, সুফল খুব একটা আসবে বলে মনে হয় না। এদিকে মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা কিছুটা হলেও যে হ্রাস পেয়েছে, তার বড় উদাহরণ হলো এ বছর কোরবানির অনেক পশু বিক্রি হয়নি।
আমরা শুল্ককাঠামো কম রেখেছি, অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের শুল্ক হ্রাস করেছি অথচ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করেছি। এটা একটা বিপরীত চিত্র। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে, গত বছর নতুন করে ২৭ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে, এসব মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার পরেও নতুন করে যে কর্মসংস্থান হবে, সে রকম কোনো নজির এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আমাদের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হলো পোশাকশিল্প। এই পোশাকশিল্পে চলছে মৃদু মন্দাভাব। গত বছরের ২৭ লাখ মানুষকে নতুন করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে যদি আরও কমপক্ষে ৫০ লাখ মানুষকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে কোনো উন্নয়ন কিন্তু সামনে এগোবে না।
শুরুতেই শুল্কহারের কথা বলেছিলাম। শুল্কহার হ্রাস হলেই যে দ্রব্যমূল্য কমবে, এমন কোনো কথা নেই। যদি ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে খরচ বেড়ে যায়, প্রতিটি পণ্যের ভ্যালু—যার ওপর ভিত্তি করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়—তা বেড়ে গেলে শুল্কহার হ্রাস করলে কোনো কিছু আসে-যায় না। পণ্যের মূল্য তো বাড়তি আছেই।
এই অর্থবছর থেকেই সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন আরম্ভ হবে। নতুন পে স্কেলের কার্যকারিতা আরম্ভ হলেই দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। অথচ নতুন পে স্কেলের আওতায় আসবে বেশি হলে ১৫ লাখ মানুষ, গড়পড়তা হয়তো ৭৫-৮০ লাখ মানুষ এর সুফল পাবে—পরিবারপ্রতি চার-পাঁচজন মানুষ যদি একজন চাকরিজীবীর ওপর নির্ভরশীল হয়। বাকি ১৭ কোটি মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে এই বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির বেতন বাড়ানোর ফলে।
আমাদের দেশের প্রতিটি সেক্টরেই কমবেশি দুর্নীতি আছে। দুর্নীতি লাঘব করতে না পারলে মানুষের জীবনের কষ্ট লাঘব হবে না। যে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের কথা বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর আদায়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা। মোটামুটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত একটি কর প্রশাসনের দরকার হবেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। একটা প্রচলিত কথা আছে—কর্মকর্তারা যত অঙ্কের টাকার দুর্নীতি করেন, তার ১০ গুণ নাকি কর ফাঁকি হয়। অতএব, কর কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। উচ্চ আশা থাকা ভালো, এ বছরের বাজেট দেখে তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখার দরকার সেই প্রবাদ বাক্যটি—তোমার কোটটি সেভাবেই বানাও, যতটুকু তোমার কাপড় আছে। লক্ষ্যমাত্রা সেই রকম নির্ধারণ করতে হবে, যেটা আমরা অর্জন করতে পারব।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সব ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। প্রথমেই বন্ধ করতে হবে বন্ডের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের অবচয়। পণ্যের আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং বন্ধ করতে হবে। না পারলে রাজস্ব আদায় হবে না, ওভার ইনভয়েসিং বন্ধ না করতে পারলে মানি লন্ডারিং ঠেকানো যাবে না। যে ৬০টি পণ্যের শুল্কহার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, এই ৬০টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে ওভার ইনভয়েসিং হয় কি না। এইসব পণ্যের ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং হওয়ার আশঙ্কা বেশি, অর্থাৎ মানি লন্ডারিং হওয়ার আশঙ্কা আছে। আন্ডার ইনভয়েস উচ্চ শুল্কহারের পণ্যের ক্ষেত্রে বেশি হয়। এটা বন্ধ করতে না পারলে রাজস্ব পাওয়া যাবে না।
বাজেটের এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে বছরের প্রথম থেকে চিন্তাভাবনা করে স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। আন্তরিকতা থাকলে শতভাগ সফল না হলেও কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছানো যাবে। কাছাকাছি পর্যায়ে যদি পৌঁছানো যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ ভালো, পরের বছর আমরা আরও ভালো করব।
লেখক: প্রকৌশলী