হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সুস্থ, সৎ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা দরকার

আব্দুর রাজ্জাক 

অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে নির্বাচনটা শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল। বড় বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যাঁদের আমরা দেশের থিংক ট্যাংক বলে জানি, তাঁরাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। কয়েকজন উপস্থাপকসহ টক শোতে যাঁরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের রীতিমতো তটস্থ থাকতে দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটা হয়েছে, বলতে গেলে ভালোভাবেই হয়েছে। অধিক ভোট পড়া নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে অভিযোগ উঠলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। যেটুকু যৎসামান্য হয়েছে, আইনশৃঙ্খলার বিচ্যুতি ঘটেছে, তা মেনে নেওয়া যায়।

শুধু সবার চোখে বাঁধবে গোলাপি ব্যালট পেপারের ভোটের সংখ্যা সাদা পেপারের ভোটের সংখ্যার তুলনায় কিছুটা বেশি! এমনটা হওয়ার কি কোনো সুযোগ আছে? বেশ কয়েক জায়গায় ভোটারের চেয়ে গোলাপি ব্যালটে ভোট বেশি পড়েছে বলে জানা গেছে। যা হোক, নির্বাচন কমিশনার সবকিছু বিবেচনা করে, মনে হয় যুক্তিসংগত একটা ব্যাখ্যা দেবে। তবে আলী রীয়াজ যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। আবার অনেকে মেনে নিতে পারে।

আমাদের এখন উচিত হবে সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফিরে আসা। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্নভাবে অসুস্থ ধারার একটা রাজনীতি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। এই অসুস্থতাকেই আমরা স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। স্বাধীনতার পরপরই জাসদের হঠকারী রাজনীতি, সেই সময় ইপিসিপিসহ বামপন্থী ছোট ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিচ্ছিন্নভাবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, রাজনীতির নামে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাঁদাবাজিসহ অনেক অপকর্ম—মানুষের ঘুমকে হারাম করে দিয়েছিল। এইসব ছোট ছোট গ্রুপকে মানুষ ‘রাত্রি পার্টি’ বলেও অভিহিত করেছে। এরা আত্মগোপনে থাকত। রাত হলে এদের পার্টির প্রচারে নামত, লোকচক্ষুর অন্তরালে মুখে কাপড় বেঁধে। এটা কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতি বলে সাধারণ মানুষ মনে করে না। এদের পার্টির সামনে ব্র্যাকেটবন্দী হিসেবে অনেকগুলো গ্রুপের নাম লেখা থাকত। বোঝা যায় এই পার্টিগুলো প্রতিনিয়ত ভাঙাগড়ার খেলায় মেতে থাকত, নিজেদের মধ্যে খুনখারাবির বিষয় থাকত। এগুলো যত না নীতিনির্ধারণী ব্যাপার ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল কোনো একটি গ্রুপের নেতা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা!

আমাদের এখন থেকেই সৎ চিন্তাভাবনা করা শিখতে হবে। যদি চিন্তাচেতনায় আমরা সৎ না হই তাহলে কর্মক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তায় সৎ হতে হবে। বেশ কয়েক বছর যাবৎ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছিল কোনো পদ পাওয়া মানে নিজের আখের গোছানো, নিজে লাভবান হওয়া—এই ধরনের মানসিকতা। আমরা সৎ চিন্তাভাবনা করা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। সব সময় আমরা তুলনা করেছি—অমুক পার্টির অমুক নেতা কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, আমাকে সেটা অতিক্রম করতে হবে। যেসব রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় ছিলেন তাঁদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই নিজেরা লাভবান হতেন, সঙ্গে তাঁদের অনুগামী-অনুসারীদেরও অসৎ পথে আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতেন যেন অনুসারীরা তাঁদের দোষ না দিতে পারেন! এটা যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল। ব্যতিক্রম সব সময় থাকে, সেটা মূলধারায় টেনে না আনাই ভালো।

নিজে সৎ চিন্তা করতে হবে, নিজের সৎ চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে, তাহলেই অপরকে সৎ হতে বলতে নিজের কোনো কিছু দিতে হবে না। নিজে সৎ চিন্তা না করে, সৎ না থেকে অপরকে সেটা বলা খুবই কষ্টসাধ্য। একটি প্রবাদ বাক্য আছে—আপনি আচরি ধর্ম শিখাও অপরে। নিজের আচার-আচরণ দিয়ে অন্যকে শিক্ষা দিতে হয়, সেটা হতে হয় ভালোর দিকে। সৎ চিন্তা করতে দেরি করার কারণে বলতে গেলে ২০-২৫ বছর যাবৎ আমরা দুর্নীতির মানদণ্ডের সূচকের তালিকায় প্রায় সময়ই ওপরের দিকে থেকেছি।

মুক্তবুদ্ধির বিকাশ ঘটাতে হবে। মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ না ঘটলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে, প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে। শিল্পকর্মে, সাহিত্যে, শিক্ষায় সর্বত্রই পরিবর্তন হচ্ছে। বলতে পারেন বিবর্তন হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলি, এখন আর আমরা আগের টাইপিং মেশিনে টাইপ করি না, এমনকি হাতের আঙুল ব্যবহার করেও টাইপ করি না। মুখে বলি, সঙ্গে সঙ্গে টাইপ হয়ে যায়। কোনো একটি ভাষায় কোনো কিছুর রচনা করে আপনি গুগল ট্রান্সলেশনের মাধ্যমে অনুবাদ করতে পারেন মুহূর্তের মধ্যে। মহাকাশ বিজ্ঞান, সমুদ্র গবেষণা বিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞানসহ অতি দ্রুত যেসব পরিবর্তন হচ্ছে, তা ভাবাই যাচ্ছে না! এখানে যদি আমরা মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণা নিয়ে পড়ে থাকি, এই বিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে না পারি, তাহলে অবশ্যই আমরা পেছনে পড়ে থাকব। সারা পৃথিবী এগিয়ে যাবে, আমরা যথারীতি পশ্চাৎপদ জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে কোনোরকমে ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকব। মেধার বিকাশ ঘটাতে হলে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে হবে। সব বিষয়ে মেধা বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, নিজ নিজ শিক্ষার বিষয়ের ওপরে মেধার যেন বিকাশ ঘটে সেদিকেই কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দিতে হবে। মেধাবী মানুষদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুদান দিয়ে অথবা বিনিয়োগ করে মেধাবীদের মেধার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ করে দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলাম অনুযায়ী লেখাপড়া ছাড়াও গবেষণাসহ উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে হবে। মুক্তবুদ্ধির চর্চার মাধ্যমেই জাতি উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে পারবে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা না থাকলে মেধা বিকাশ হবে না, কোনো ক্ষেত্রেই আমরা সাফল্য অর্জন করতে পারব না। কথাটি সবারই মনে রাখতে হবে। এই সময়ে সুস্থ, সৎ ও মুক্তবুদ্ধির মানুষের খুবই প্রয়োজন। আশা করি বর্তমান নেতৃত্ব এই ধরনের ধ্যানধারণা নিয়ে জাতিকে সামনের দিকে অগ্রসর করে নেবেন।

এবার দেখা যাচ্ছে অনেক তরুণ মেধাবী মানুষ সংসদে যাচ্ছেন। এইসব মেধাবী সংসদ সদস্য যেন চিন্তাচেতনায় তরুণ হন, গতানুগতিক পশ্চাৎমুখী ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন। উল্লিখিত কাজগুলো করতে হলে প্রথমেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে সবার সামনে। সেটা করতে হলে নিজেকে অবশ্যই সততার মানদণ্ডে ১০০-তে ১০০ পেতে হবে। দেশপ্রেম থাকতে হবে সবার আগে, দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে ১০০-তে ৯৯ পেলে কিন্তু ফেল!

আমরা গুজবে খুবই বিশ্বাস করি। এই গুজবে বিশ্বাস করার প্রবণতা আসে অশিক্ষা থেকে, সঠিক তথ্য ও ডেটা বাছাই করার কোনো পদ্ধতি না জানার কারণে। একটা উদাহরণের কথা না বলে পারছি না। একবার অভিযোগ উঠল, পার্শ্ববর্তী দেশের ২৬ লাখ মানুষ আমাদের দেশে কাজ করে। যেহেতু আমাদের শ্রমঘন সমাজ, অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে বেকার, তাই অনেকেই এই কথা বিশ্বাস করে নিল। বাস্তবে গত দেড় বছরে দেখলাম, ২৬ লাখের পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী দেশের ২৬ জন বেআইনিভাবে কাজ করার লোক খুঁজে বের করতে। মাঝখান থেকে যুবসমাজ প্রতারিত হলো, পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলো। এখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা থাকলে মানুষ এইসব গুজব বিশ্বাস করত না। তাই মুক্তবুদ্ধি চর্চার কত যে প্রয়োজন, সেটা বোধ হয় আপনারা অনুভব করছেন। তাই আসুন, আমরা এখন থেকে সবাই সুস্থ, সৎ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার দিকে এক ধাপ অগ্রসর হই।

লেখক: প্রকৌশলী

স্টারমার ও ৫০ ব্যবসায়ীর চীন সফরের অর্থনীতি

শুরু হয়ে গেছে

আর কবে জামায়াত এমন সুযোগ পাবে

বন্ধ মুখ খোলার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল

যেমন বাংলাদেশ চাই

সহিংসতা

শিল্পকারখানার বর্জ্যদূষণ বন্ধ করা দরকার

অপরাপর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বাঙালিদের উপেক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি আছে

মাত্র সাত

বামদের রাজনীতি কি মুমূর্ষু