হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

স্বাগত ২০২৬: উত্তরণের পথে যাক দেশ

কামরুল হাসান, ঢাকা 

নতুন বছর ২০২৬-কে সুস্বাগত। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে গেল, সময় এগিয়ে গেল আরেক ধাপ। পৃথিবীর কাছে যদি জিজ্ঞাসা করো সে কবি নাজিম হিকমতের ভাষায় হয়তো বলবে, একটি বছর অণুমাত্র কাল। তবে মানুষের জীবনে একটি বছর মিনিট-সেকেন্ডের এক বিশাল ব্যাপ্তি। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে একটি বছর কেবল একটি তারিখ নয়—এটি আত্মসমালোচনার সুযোগ, দিকনির্দেশনা ঠিক করার সময় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার মুহূর্ত।

বাংলাদেশ আজ এমনই এক বাস্তবতায় নতুন বছরে পা রাখছে, যেখানে একদিকে সংকট ও উদ্বেগ, অন্যদিকে সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা পাশাপাশি অবস্থান করছে। এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝেই জাতির সামনে প্রশ্ন—আমরা কি অস্থিরতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাব, নাকি সংস্কার ও গণতন্ত্রের পথে দৃঢ়ভাবে এগোব?

বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তে এসে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তাঁর মা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা। খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনীতির একটি মানবিক বাস্তবতা, যা দল-মতের ঊর্ধ্বে সহমর্মিতার জায়গা পেয়েছিল। ৩৭ দিন হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মঙ্গলবার সকালে তিনি হার মেনেছেন। মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন। নতুন বছরে প্রত্যাশা—রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন এই মানবিক সীমারেখা অতিক্রম না করে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন যে রাজনীতিতে নতুন করে গতি এনেছে, তা যেন সংঘাত নয়, সংলাপ ও অংশগ্রহণের পথেই পরিচালিত হয়। নতুন বছর বাংলাদেশের রাজনীতিকে সেই পরিণত অবস্থায় নিয়ে যাবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।

কিন্তু এই আশার বিপরীতে আমাদের হতবাক করেছে হাদি হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্য রাজনৈতিক সহিংসতায় একজন মানুষ প্রাণ হারানো মানে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি সমাজ ও রাজনীতির গভীর অসুখের বহিঃপ্রকাশ। নতুন বছরে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষ স্পষ্টভাবে দেখতে চায়—রাজনীতি আর সহিংসতা যেন একই পাত্রে আশ্রয় না পায়। একইভাবে বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ড কিংবা মাইলস্টোন স্কুলের ওপরে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনা আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। দুর্ঘটনা ও নাশকতার ভেদরেখা যখন অস্পষ্ট হয়, তখন জনমনে ভয় আরও বাড়ে, আর ভয় হলো গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা।

নতুন বছরের প্রথম প্রত্যাশা তাই হওয়া উচিত—আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় মোড়। এই রায় কারও কাছে স্বস্তির, কারও কাছে অস্বস্তির কারণও। বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা টিকে থাকবে তখনই, যখন রায় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। নতুন বছরে এই আস্থা পুনর্গঠন করা রাষ্ট্রের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এবং ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনীতির ভেতরে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিকল্প কাঠামো তৈরি না হলে শূন্যতা তৈরি হয়। ইতিহাস বলে, শূন্যতা কখনো ভালো শক্তিতে পূরণ হয় না। এখানেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। দীর্ঘদিন পর নিয়মিত ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে তা শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতিকে স্থিতিশীল করবে না; বরং জাতীয় রাজনীতির জন্য দায়িত্বশীল নেতৃত্ব তৈরির একটি প্রশিক্ষণভূমি হয়ে উঠতে পারে। নতুন বছরে এটি বাস্তবায়িত হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।

নতুন বছরের আরেকটি বড় প্রত্যাশা—বাস্তব সংস্কার। সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি অতীতে আমরা অনেকবার শুনেছি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের ব্যবধানই মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে সবচেয়ে বেশি। বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বহুদিনের। এটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন সবাই মনে করছে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা বাড়বে। নতুন বছরে যদি এই সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়, তবে তা শুধু বিচারব্যবস্থার নয়, পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর জন্যই আশাব্যঞ্জক হবে।

অর্থনৈতিক সংস্কার নতুন বছরের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিদায়ী বছরে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আয়বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। নতুন বছরে মানুষ কেবল পরিসংখ্যানের উন্নতি নয়, বাস্তবজীবনে স্বস্তি চায়। অর্থনৈতিক সংস্কার মানে শুধু কৃচ্ছ্র বা ব্যয়সংকোচন নয়; মানে দক্ষতা বাড়ানো, দুর্নীতি কমানো, করব্যবস্থাকে ন্যায্য করা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। এই সংস্কার যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

এই অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনও। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই এই সম্পর্কের প্রভাব পড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। নতুন বছরে প্রত্যাশা থাকবে—কূটনীতিতে উত্তেজনার বদলে সংলাপ, সন্দেহের বদলে পারস্পরিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রও শক্ত ভিত্তি পায় না।

এই সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—ভোটের পথে দেশ কতটা সঠিকভাবে এগোচ্ছে? নতুন বছরে একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন আয়োজন করা এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিক আস্থার পুনর্নির্মাণের একটি সুযোগ। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ না করলে সেই আস্থা ফিরবে না।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুলের পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ নেই। একদিকে পুরোনো সংকট, অবিশ্বাস ও সহিংসতার ঝুঁকি; অন্যদিকে সংস্কার, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের বাস্তব সুযোগ। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে তার মূল্য দিতে হয় দীর্ঘদিন।

নতুন বছরের প্রথম দিনে তাই প্রত্যাশা একটাই— বছরটি যেন প্রতিহিংসার নয়, দায়িত্বের রাজনীতির বছর হয়। বিচার হোক আস্থার প্রতীক, সংস্কার হোক বাস্তব ও দৃশ্যমান, অর্থনীতি হোক মানুষের জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত, আর নির্বাচন হোক জনগণের সত্যিকারের উৎসব। সংকট আছে, কিন্তু সম্ভাবনাও আছে। নতুন বছরে সেই সম্ভাবনাই বাস্তবে রূপ পাক—এই কামনা আজকের দিনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। সবার জন্য শুভ হোক নতুন খ্রিষ্টীয় বছর।

হ্যাপি নিউ ইয়ার।

শুভ নববর্ষ

আসুন, উল্টো করে ভাবতে শিখি

নাইজেরিয়া: মার্কিন হামলার ফল হবে হিতে বিপরীত

এক অন্তর্দীপের নিভে যাওয়া

সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি

খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী

ফিরে দেখা ২০২৫ সাল

বিদায়ী বছর ভালো কাটেনি, এবার আশা নতুন ভোরের

বিএনপির ৩১ দফা: স্বাস্থ্যসেবায় চাই নতুন সামাজিক চুক্তি

কুয়াশা