দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি বোঝার জন্য গ্র্যান্ড বাজারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে এ বাজারটি ছিল ইরানি শাসনব্যবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সামাজিক স্তম্ভ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেও এই ব্যবসায়ী শ্রেণি ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। সেই বাজার যখন আজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষোভ নয়; এটি শাসকগোষ্ঠীর সামাজিক সমর্থনভিত্তি ভেঙে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
তবে এই বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ধস। মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানি রিয়ালের মান ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের দাম এক বছরে ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই সংকটের জন্য দায় কোথায়? এটি কি কেবল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উদ্ভূত, নাকি অভ্যন্তরীণ শাসন ও নীতি দুর্বলতার ফল? বাস্তবতা হলো, উভয় কারণেই হয়েছে।
ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবে, ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশটির অর্থনীতি কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের নেতৃত্ব, বিশেষত খোমেনি মতাদর্শের ভিত্তিতে, সিদ্ধান্ত নেয় যে এই বিপ্লব কেবল ইরানের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা পুরো মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই বিপ্লবী আদর্শ রপ্তানি নীতির মাধ্যমে ইরান পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে সমর্থন এবং বিভিন্ন দেশে শিয়া রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী সংগঠিত করার পথে এগোয়। এভাবেই আদর্শগত লড়াই ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কৌশলে রূপ নেয়। যে কৌশলের বিস্তৃত রূপ হলো তেহরানের তথাকথিত স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ। যার মূল ধারণা হলো, ইরানের যুদ্ধ নিজস্ব সীমান্তে নয়, বরং সীমান্তের বাইরে পরিচালিত হবে। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় আসাদ সরকার, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী এবং ফিলিস্তিনে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে। ফলে ইরানের প্রভাববলয় বিস্তৃত হলেও দায়ভার বাড়তে থাকে বহুগুণে।
এই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মূল্য দিতে গিয়ে ইরানের অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। এসব গোষ্ঠী ও যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, বেতন, লজিস্টিক সহায়তা ও পুনর্গঠনে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়, যা আসে রাষ্ট্রীয় বাজেট, তেল আয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জনগণের কর থেকে। ফলে যে অর্থ দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা ব্যয় হচ্ছে বাইরের যুদ্ধ ও প্রক্সি রাজনীতিতে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হয়, রিয়ালের মান পড়ে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে। উপরন্তু, এই আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইরানের ওপর কঠোর ব্যাংকিং ও তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় সাধারণ ইরানি নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগে, তেহরানে যখন চাকরি নেই, জীবনযাপন কঠিন, তখন তাদের অর্থ কেন লেবানন বা সিরিয়ার যুদ্ধে ব্যয় হবে? এই ক্ষোভ থেকেই ব্যবসায়ী ধর্মঘট, শ্রমিক বিক্ষোভ, ছাত্র আন্দোলন এবং ক্রমবর্ধমান সরকারবিরোধী স্লোগান দেখা যাচ্ছে। এককথায়, আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ইরান স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ অর্জন করলেও এর ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত চুক্তিও বাস্তবে ইরানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারেনি। কারণ, এই অংশীদারত্বগুলো নিষেধাজ্ঞা ভাঙার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি; বরং ইরান ধীরে ধীরে কাঁচামাল সরবরাহকারী ও স্বল্পমূল্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের পর সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমে যাওয়া এবং নতুন সরকার কর্তৃক ঋণ পরিশোধে অস্বীকৃতি এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট করেছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। একদিকে শীর্ষ নেতা স্বীকার করছেন যে নীতিগত ব্যর্থতাই সংকটের মূল, অন্যদিকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখনো বিদেশি ষড়যন্ত্র দাবি করছে। এ দ্বৈত নীতি রাষ্ট্রীয় বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং বিক্ষোভকে আরও তীব্র করছে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব কমেছে। সিরিয়া কর্তৃক ঋণ ফেরত না পাওয়া এবং প্রভাবশালী প্রক্সি গোষ্ঠীর দুর্বল অবস্থার কারণে ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাও সীমিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করছে।
এইসব পরিস্থিতি কি কেবল সরকারবিরোধী ক্ষোভ, নাকি প্রকৃত অর্থে রেজিম চেঞ্জের পূর্বাভাস? মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। কোথাও নিরাপত্তা বাহিনী শুরুতে নীরব থেকেছে, আবার কোথাও কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করেছে। ইন্টারনেট বন্ধ, ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার এবং প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ফলে ক্ষোভ আরও গভীর হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই একাধিক বার্তা দিয়েছে যে তারা ইরানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে মনিটর করছে এবং প্রয়োজন পড়লে সামরিক বা কৌশলগত হস্তক্ষেপ করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি নজর রাখছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলও যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনা বা আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে।
ইরান নিজেও সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড স্পষ্টভাবে রেডলাইন নির্ধারণ করেছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ রেজিম পরিবর্তনের চেষ্টা বা শহর দখলকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে, ইরান এবং আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি সাধারণ ধর্মঘট এবং শহর দখলের আহ্বান দিয়ে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপই বাড়াচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকেও ত্বরান্বিত করছে।
সব মিলিয়ে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক চাপ একত্র হয়ে ইরানকে এক ঐতিহাসিক মোড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে; যদি শাসকগোষ্ঠী কাঠামোগত সংস্কারের দিকে না যায়, তবে রেজিম চেঞ্জের সম্ভাবনা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
লেখক: মো. শাহিন আলম শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়