জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীতে হওয়া মামলাগুলোর তদন্তে অভিযোগপত্রের তুলনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার হার বেশি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৮টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও ২৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগপত্রের তুলনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন তিন গুণের বেশি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের ঘটনায় ঢাকায় মোট ৭৮৯টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৭৯ এবং অন্যান্য মামলা ৩১০টি। এসব মামলার মধ্যে ৫৯৯টির তদন্ত করছে ডিএমপি; যাতে হত্যা মামলা ৩২০টি এবং অন্যান্য মামলা ২৭৯টি। রাজধানীর আরও ১৫৫টি মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অন্যান্য ইউনিট।
ডিএমপি সদর দপ্তরের গত ৩০ জুন পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট ৭৮৯ মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৮টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি হত্যা মামলা এবং ৪টি অন্যান্য মামলা। অন্যদিকে, ২৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি হত্যা মামলা এবং ৫টি অন্যান্য মামলা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে অভিযোগপত্রের তুলনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে হত্যা মামলায় ২২টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪টিতে। অর্থাৎ পুলিশের তদন্ত শেষে আদালতে যেগুলোর প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে অব্যাহতির সংখ্যাই বেশি।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান আজকের পত্রিকাকে বলেন, অনেকগুলো মামলা নিয়ে অভিযোগ ছিল। হয়রানির অভিযোগ ছিল। অনেক মামলার বাদীকে পাওয়া যাচ্ছে না, ঘটনাস্থল ভুল—জুলাই মামলা নিয়ে এ রকম অনেক অভিযোগ আসছিল। বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। সেসব মামলায় পুলিশের তদন্তে সঠিক তথ্য বের হয়ে আসছে। তাই অনেক মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিচ্ছে পুলিশ।
ডিএমপির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতিটি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, ফরেনসিক তথ্য এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি যাচাই-বাছাই করে তদন্ত কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র অথবা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করছেন। ফলে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগপত্র ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন—উভয় সংখ্যাই আরও বাড়তে পারে।
জুলাইয়ের মামলার তদন্তের বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ যদি মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ডিবিপ্রধান বলেন, ডিএমপিতে হওয়া জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত মামলার মধ্যে ৫৯টি মামলা বর্তমানে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মামলার তদন্তই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতি ১৫ দিন পর পর এই মামলাগুলো নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনা সভা করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরও এই মামলাগুলো তদারকির জন্য একটি আলাদা মনিটরিং সেল কাজ করছে বলে তিনি জানান।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি মামলার তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হবে না।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশে ১ হাজার ৮৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ২৫৪টির। অর্থাৎ মামলা তদন্তে নিষ্পত্তির হার মাত্র ১৩ শতাংশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সারা দেশে ৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে মাত্র ১০০ মামলার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ। এর মধ্যে অভিযোগপত্র দিয়েছে ৬৩টির এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে ৩৭টির। হত্যা মামলা তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ।
অপরদিকে, সারা দেশে হত্যা মামলা ছাড়া অন্যান্য মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৩টি। এর মধ্যে পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে ১৩৬টির এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে ১৮টির। অন্যান্য মামলা তদন্ত হয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ।