রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই কিশোর গ্যাং এখন বিষফোড়া। গ্যাংগুলোর প্রকাশ্যে হত্যা, ছিনতাই, দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এলাকায় এলাকায় সৃষ্টি করেছে আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক মাসের অভিযানে কয়েক হাজার কিশোর অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে লাগাম টানা যায়নি। বরং দিন দিন বেড়েছে গ্যাং ও গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রমতে, সারা দেশে কিশোর গ্যাং বর্তমানে ২৩৭টি। এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য অন্তত ৫০ হাজার। নির্বাচনের পর কিশোর গ্যাংগুলো স্থানীয় রাজনীতিকদের আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আয়ের হাতছানি, সামাজিক যোগাযোগ- মাধ্যমে গ্যাং সংস্কৃতির প্রচার, আইন প্রয়োগের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন কারণে কিশোরেরা অপরাধে জড়াচ্ছে।
পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে। পুলিশ এ জন্য ইমাম, শিক্ষক ও এলাকার মুরব্বিদের নিয়ে কাজ করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে রাজধানীসহ সারা দেশে ১২৭টি কিশোর গ্যাং ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েক দিন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে ২৩৭টি হয়। কোনো কোনো সংস্থার মতে, বর্তমানে এই সংখ্যা তিন শতাধিক। সারা দেশে এসব গ্যাংয়ের অন্তত ৫০ হাজার সক্রিয় সদস্য বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে তাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।
পুলিশের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে মোট অপরাধের ৪০ শতাংশের সঙ্গে কিশোর অপরাধীরা জড়িত। এসব অপরাধের মধ্যে ছিনতাই, অপহরণ, খুন, মাদক, দখল, চুরি, ডাকাতি, হুমকি ও ইভ টিজিং উল্লেখযোগ্য।
কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংসতা আঁতকে দিচ্ছে মানুষকে। গত রোববার বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে প্রকাশ্যে অ্যালেক্স ইমন নামের এক কিশোর গ্যাং লিডারকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের সদস্যরা। কুপিয়ে তাঁর হাত-পা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে সন্ত্রাসীরা। নিহত অ্যালেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র বলছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে আরমান-শাহরুখ গ্যাংয়ের সদস্যরা।
রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বেশি দৌরাত্ম্য মোহাম্মদপুর, বছিলা ও আদাবরে। এসব এলাকায় অভিযান চালিয়েও লাগাম টানতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারের কয়েক মাস পরই অপরাধীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে। এই তিন এলাকা থেকে গত দেড় বছরে অন্তত চার হাজার কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত রমজান মাসেই দেড় হাজারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা বলেন, ‘আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে আমরা আরও ভালো করার চেষ্টা করছি।’
কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিকবার সারা দেশে তালিকা করেছে। কিছু এলাকায় যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযানও চালানো হয়েছে। তবে গ্যাংগুলোর তৎপরতা কমেনি। বরং আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ডিএমপির সূত্র বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে রাজধানীতে ৩ থেকে ৫ হাজার কিশোর গ্যাং সদস্য ছিল, যা বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার। এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃহত্তর মোহাম্মদপুর ও পল্লবীতে। এর কারণ মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ক্যাম্প ও অর্ধশত বস্তি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার পর কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বেশি চট্টগ্রাম মহানগরে। সেখানে অন্তত ৫৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। ৩ এপ্রিল নগরের জামালখান এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ ‘ডেঞ্জার’ নামের কিশোর গ্যাংয়ের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও কিশোর গ্যাং দ্রুত বাড়ছে। ৩ এপ্রিল কুমিল্লার ধর্মসাগরপাড়ে বেড়াতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলার শিকার হন এক পুলিশ দম্পতি। স্ত্রীকে ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় কনস্টেবল স্বামীকে ছুরিকাঘাত করে পালায় তিন কিশোর। পরে হামলার সঙ্গে জড়িত কুমিল্লার কালিয়াজুড়ির মো. রিফাত এবং আদর্শ সদর উপজেলার ভুবনঘরের সিয়ামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক মো. শামসুল আলম শাহ বলেন, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামিরা কারাগারে রয়েছে।
কুমিল্লায় ছুরিকাঘাতের এক দিন পর নোয়াখালীর সদর উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের গৌরীপুর গ্রামে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে মো. সেলিম নিহত হন। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করে পুলিশ। কিশোর গ্যাংয়ের এমন উৎপাত প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে কিশোর গ্যাংয়ের দ্রুত বিস্তার ঘটে। একটি অস্থিতিশীল সময়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছোট ছোট গ্রুপ এখন সংগঠিত অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে।
সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে ব্যবস্থা নিতে গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নোয়াখালী-২ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন, বেকারত্ব, পারিবারিক অবহেলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং সংস্কৃতির প্রচার—এসব কারণ কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং ধীর বিচারপ্রক্রিয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, কিশোর গ্যাংগুলো ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কিছু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এসব চক্রের সদস্যদের আশ্রয়ও দিচ্ছেন।
সারা দেশে কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে। পুলিশ ইমাম, শিক্ষক ও এলাকার মুরব্বিদের নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।