কমিশনহীন দুদক
অভিযোগের স্তূপ জমছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চিঠিপত্র শাখায়। হটলাইন নম্বরে ফোন করে দেওয়া অভিযোগও কম নয়। কিন্তু কোনো অভিযোগের বিষয়েই ব্যবস্থা নিতে পারছে না সংস্থাটি। কারণ, যেকোনো অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কমিশনের অনুমোদন লাগবে। অথচ কমিশনই নেই দুই মাস।
এ দুই মাসে দুদক কোনো অভিযোগপত্র (চার্জশিট) অনুমোদন, মামলা এবং ফাঁদ মামলাও করতে পারেনি। একইভাবে অভিযানও বন্ধ। অনুসন্ধানের জন্য অভিযোগ বাছাইও রয়েছে বন্ধ।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগের পর থেকে দুদক কমিশনহীন। এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় কমিশনশূন্য থাকায় দুদকের সার্বিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
দুদকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজকের পত্রিকাকে বলেন, দুদক আইনে সব ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত। কর্মকর্তারা কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। ফলে দুদকে আসা অভিযোগ বা হটলাইন ‘১০৬’ নম্বরে আসা ফোনকলের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেও কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন।
দুদকের তথ্যমতে, গত বছর সারা দেশে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৮৬৫টি অভিযান চালায় দুদক। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৭২টি এবং দিনে গড়ে ২ দশমিক ৩৬টি অভিযান চালায়। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৯৭টি অভিযান চালায় দুদক। প্রতি মাসে গড়ে ৪৮টি। কিন্তু কমিশন না থাকায় মার্চ ও এপ্রিলে কোনো অভিযান চালাতে পারেনি দুদক।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন গত ৩ মার্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করে। দুদক আইনের ১১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো কমিশনার মৃত্যুবরণ বা স্বীয় পদ ত্যাগ করিলে বা অপসারিত হইলে, রাষ্ট্রপতি উক্ত পদ শূন্য হইবার ৩০ দিনের মধ্যে, এই আইনের বিধান সাপেক্ষে, কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে শূন্য পদে নিয়োগদান করিবেন।’ তবে দুই মাস পার হলেও দুদকে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ করা হয়নি।
দুদকের সূত্র জানায়, কমিশন না থাকায় কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান হচ্ছে না। কারণ, দুদক বিধিমালায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের। যেসব অভিযোগের বিষয়ে কমিশন অনুসন্ধান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য কমিশন থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে নির্দেশ আকারে পাঠাতে হবে।
কমিশন না থাকায় দুই মাস ধরে দুদকের তাৎক্ষণিক অভিযানও বন্ধ। এ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দুদকের গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশল ‘ফাঁদ মামলা’ বা ট্র্যাপ কেসও বন্ধ রয়েছে। অপরাধীদের হাতেনাতে ধরতে ছদ্মবেশে ফাঁদ মামলা পরিচালনার এখতিয়ার রয়েছে সংস্থাটির।
দুদকের অতিগোপনীয় শাখা অভিযোগ যাচাই-বাছাই শাখা। এই শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কমিশন না থাকায় অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য যাচাই-বাছাই কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যায়নি।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, দুদক আইনের ১১ ধারায় পদ শূন্য হওয়ার দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দুই মাস পরও কমিশন নিয়োগ না দেওয়ায় দুদক কার্যত অচল হয়ে রয়েছে। এটি দুর্নীতিবাজদের জন্য বড় সুযোগ এবং তারা এর ফায়দা নিচ্ছে। তিনি বলেন, কমিশন না থাকায় কোনো গ্রেপ্তার নেই, ক্রোক বা সম্পদ জব্দ নেই। আইন অনুযায়ী কমিশন গঠিত না হওয়া স্পষ্টতই আইনের লঙ্ঘন।
দীর্ঘ দুই মাস কমিশন নিয়োগ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সরকার জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা রক্ষা করা উচিত। দুদকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে রাখা দেশের জন্য এবং জনগণের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দ্রুত কমিশন নিয়োগ দিয়ে এই সংকট থেকে উত্তরণ প্রয়োজন।’