পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৭৪ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। গত বছরের ২০ নভেম্বর ওই রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ওই রায়কে ত্রুটিপূর্ণ ও কলঙ্কিত উল্লেখ করে তা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।
আপিল বিভাগ রায়ে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা জন্ম নিয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য থেকে; যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বারবার সৃষ্টি হওয়া সংকট দূর করা। সংবিধান যে গণতান্ত্রিক প্রাণশক্তিকে রক্ষা করতে চায়, এর (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বিলুপ্তি তাকেই দুর্বল করে দেয়। আপিল বিভাগ মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ধীরে ধীরে সংবিধানের কাঠামোর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এটি কার্যত গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করেছে, যা নিজেই সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো। তবে তা গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল, যখন এই আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনীসংক্রান্ত রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন। সংক্ষিপ্ত আদেশ ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যবর্তী সময়ে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনসভা যে হস্তক্ষেপ করেছিল, এটি বিচার বিভাগের সংকট ব্যাখ্যা করার একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আপিল বিভাগ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন এনে ভবিষ্যতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাকেই মূলত বদলে দেয়। বিশেষত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করে আনা বিস্তৃত সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার ব্যবস্থা করা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী শুধু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় থেকে বিচ্যুতই হয়নি, বরং কিছুটা কৌশলের সঙ্গে এমনভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে ত্রয়োদশ সংশোধনীসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের (যা তখনো প্রকাশিত হয়নি) মূল বক্তব্যকে আগেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
রায়ে বলা হয়, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আইনসভা বিচার বিভাগকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল, নির্দেশ দিচ্ছিল—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। যদিও তা আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনী বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের যে অংশ, তা সংক্ষিপ্ত আদেশের প্রতি অবমাননাকর হওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে উদ্বেগের বিষয় হলো—ত্রয়োদশ সংশোধনী-সম্পর্কিত রায়ের চূড়ান্ত সংস্করণে দেখা যায় যে, আদালত যেন আইনসভার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। যেখানে বলা হয়েছিল, আরও দুটি নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখা প্রয়োজন।
রায় কার্যকরের বিষয়ে আপিল বিভাগ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত হবে। তবে এই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত বিধানসমূহ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা যাবে না। এটি কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে। অর্থাৎ পুনঃস্থাপিত এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে তখনই, যখন ত্রয়োদশ সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করবে অথবা তার আগেই যেকোনো সময় বিলুপ্ত হবে। যার মাধ্যমে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮সিতে নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট পূর্বশর্ত পূরণ হবে। এই পুনঃস্থাপন ভবিষ্যতের নির্বাচনী চক্রগুলোর জন্য সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে রিট করা হয়। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট ওই রিট খারিজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বৈধ ঘোষণা করেন। এর বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারী পক্ষ ২০০৫ সালে আপিল করে। ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। পরে সংক্ষিপ্ত রায় দেওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। তবে সংক্ষিপ্ত রায়ের পরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন হলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ব্যক্তি আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আবেদন করেন। পরে বিএনপির মহাসচিব ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলও রিভিউ আবেদন করেন। এ ছাড়া নওগাঁর রাণীনগরের নারায়ণপাড়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন।
রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত বছরের ২৭ আগস্ট লিভ মঞ্জুর (আপিলের অনুমতি) করে আদেশ দেন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আপিল শুনানি হয়। শুনানি শেষে গত বছরের ২০ নভেম্বর রায় দেওয়া হয়। যাতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়।