হোম > জাতীয়

বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের উদ্বেগ

বেসরকারিতে গেলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে জ্বালানি খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম 

ফাইল ছবি

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের মতো কার্যক্রমে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগে বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বে আসার মাত্র ১৮০ দিনের মধ্যেই সরকার তড়িঘড়ি এই উদ্যোগ নিচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

জ্বালানির মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর খাতে বেসরকারি পক্ষকে যুক্ত করা ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খলা ও মুনাফামুখিতার পথ খুলে দিতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। সরকারের ভাষ্য, দেশে ‘নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা’র লক্ষ্যেই এই উদ্যোগের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারিভাবে তেল আমদানি ও বিপণনের উদ্যোগের খবরে অস্থিরতা শুরু হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানিগুলোতে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ এবং বিপণন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন কার্যক্রমে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। খুব দ্রুত এই নীতিমালা তৈরির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় বিপিসিকে সময় বেঁধেও দিয়েছিল।

তবে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হলে সরকার বলেছে, জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত এবং পরামর্শ গ্রহণ করেই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের এক বার্তায় বলা হয়, জনস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এই নীতিমালার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

গত ২৪ মে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ সরকারের কাছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চায়। তারা বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়েছে। আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য গত ১৪ জুলাই বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসির মাধ্যমে দেশে জ্বালানি বিপণনের কাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিনসহ বিভিন্ন রকমের ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি আমদানি ও বিপণন করা হয়েছিল। বর্তমানে সরকার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি এনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধন করে। এ ছাড়া চীন, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ভারত, ওমান, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। তবে কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারিতে পরিশোধিত জ্বালানি বিপিসির মাধ্যমে সারা দেশে বিপণন করা হয়। এই কাজে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেদের চাহিদা পূরণে ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানি আমদানি করার সুযোগ পেয়ে থাকে।

নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিগুলোকেও জ্বালানি তেল বিপণনের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাস্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জ্বালানির মতো একটি স্পর্শকাতর ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে এখানে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারবে কি না সন্দেহ রয়েছে। বিদ্যুৎ খাত আগেই বেসরকারি গোষ্ঠীর কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন জ্বালানি খাতেও বেসরকারিদের সংযুক্ত করা হলে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ ষোলোকলা পূর্ণ হবে।’

শামসুল আলম বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো বিএনপি সরকারও এমন জনবিরোধী ও ভোক্তাস্বার্থবিরোধী কাজে যুক্ত হয় কি না, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে।’

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের কিছু অংশ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার আগে ব্যাপকভিত্তিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এমন উদ্যোগ নেওয়ার আগে অংশীজনদের মতামত নেওয়া জরুরি। কারণ, জ্বালানি বিপণনের সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে আছে।’

এই বিশ্লেষক মনে করিয়ে দেন, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার অনেক সময় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে সরকার অনেক সময় ভর্তুকির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখে। বেসরকারি খাত ব্যবসায় যুক্ত হলে এই ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা বিশ্লেষণ করা দরকার।

প্রতিবেশী বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতে জ্বালানির ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে বেসরকারি খাত যুক্ত রয়েছে উল্লেখ করে বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘তাদের ব্যবসায়িক মডেলগুলো খতিয়ে দেখা যেতে পারে।’

বিপিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার প্রথমে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যেই (শেষ দিন ১০ আগস্ট) তাঁদের এ বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করতে বললেও উদ্বেগ ও সমালোচনার মুখে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এখন বলা হচ্ছে, দেশীয় বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানির ব্যবসায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে যুক্ত, সেগুলো আগে জানার চেষ্টা করা হবে।

‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এর লক্ষ্য হচ্ছে, দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যর মধ্যে আরও রয়েছে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সংকটের সময় বিদ্যমান সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অবকাঠামো এবং বিনিয়োগ সক্ষমতাকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা।

শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের তোড়জোড়

বেসরকারিভাবে তেল আমদানি ও বিপণনের ভাবনার খবরে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলোতে। আন্দোলনে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীরা। তাঁরা বিপিসি ভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি নিচ্ছেন।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়সার হামিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশে একটা পক্ষকে বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিতেই তড়িঘড়ি শুরু করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আমরা কোনোভাবেই তা মেনে নেব না। আমরা প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলব।’

জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ এই খাত ধীরে ধীরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবাধীন হয়ে পড়বে।

এ নিয়ে কথাবার্তার মধ্যে গত ২৬ জুলাই রাতে বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দু-এক দিনের মধ্যে রেজানুর রহমানকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার প্রস্তাবের বিপক্ষে মত দেওয়া এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিকারকের সংক্ষিপ্ত তালিকায় প্রভাবশালী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত না করায় তিনি চাপের মুখে ছিলেন। পরে ২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হককে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর মো. জিয়াউল হককে সচিব করা হয়েছে।

৩ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের যমুনা ভবনে বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের জরুরি সভায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিভিন্ন স্মারক এবং নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাবে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতারা।

ফেডারেশনের মহাসচিব মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠনই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি করার ষড়যন্ত্র করা হলে ফেডারেশনের নেতৃত্বে কঠোর আন্দোলন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’

পদ্মা অয়েল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে চলে গেলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা। তিনি সরকারকে এই পথ পরিহার করার অনুরোধ জানান।

সার্চ কমিটির দেড় মাস পরও হয়নি কমিশন

ইলিয়াস আলী গুমের অভিযোগে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

তথ্য গোপন করায় আইনজীবীকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা

ইন্টারনেটটা একটু স্লো করে দাও—পলককে ওবায়দুল কাদের

মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে হেফাজতের ৯ দফা দাবি

রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনে ৬ কমিটি

মির্জা ফখরুলই কি হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি

মাসব্যাপী বৃক্ষমেলায় ১৬ কোটি টাকায় ১৬ লাখ চারা বিক্রি হয়েছে: পরিবেশমন্ত্রী

মহাস্থানগড়ে নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা

রিজার্ভ চুরি: ৯৭ বার পেছাল মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ