অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে ‘নতুন উদ্ভাবন ও দৃষ্টান্ত স্থাপন’ করবে বলে মনে করছে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। সিডিএফের মতে, এ ধরনের ব্যাংক হলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোর ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।
আজ শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এমনটি জানায় তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে সিডিএফ জানায়, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক নিয়ে এর মধ্যে যেসব প্রশ্ন বিতর্কের সৃষ্টি করছে, তা হলো—ক্ষুদ্রঋণবান্ধব নয়, এটি মুনাফার জন্য করা হচ্ছে। দ্বিমুখী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হলে সমস্যা হবে ইত্যাদি। এ বিষয়ে সিডিএফ বলে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আইন পাস হলে এটা হবে একটি দৃষ্টান্তমূলক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং এতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোর ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে। প্রস্তাবিত ব্যাংকের আওতায় সেসব কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হবে, তা হলো ডিপোজিট সবার কাছ থেকে নেওয়া যাবে, এতে ঋণের মূলধনের চড়া সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার দরকার হবে না।
এ ছাড়া ঋণ কার্যক্রম, ইনস্যুরেন্স সার্ভিস, রেমিট্যান্স, দেশি-বিদেশি অনুদান ও ঋণ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্প এবং কৃষি খাতে ঋণের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে বলেও মনে করে সিডিএফ।
সিডিএফের মতে, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি সামাজিক ব্যবসা হিসেবে চলবে, যার মূল লক্ষ্য ব্যক্তিগত মুনাফা নয়, বরং সামাজিক সমস্যার সমাধান। বিনিয়োগকারীরা তাঁদের মূলধনের অতিরিক্ত কোনো লভ্যাংশ নিতে পারবেন না বলে এখানে অনৈতিক চর্চা বা অতিরিক্ত মুনাফার লোভের সুযোগ নেই। ফলে এই ব্যাংক নিয়ে সুশাসন-সংকটের যে আশঙ্কা রয়েছে, তা মূলত অমূলক।
সিডিএফের মতে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক করার সুযোগ তৈরি হলেও কোনো প্রতিষ্ঠানকে এতে রূপান্তর হতে বাধ্য করা হবে না। কোনো এনজিও চাইলে তাদের পুরো প্রতিষ্ঠান অথবা আংশিক বা নির্দিষ্ট কিছু শাখা ব্যাংকে রূপান্তর করতে পারবে। তবে স্থানান্তরিত অংশটি এনজিও থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামো ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতে হবে।
কোনোভাবেই দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক পরিচালিত হবে না—এমন মত দিয়ে সিডিএফ জানায়, এনজিও চলবে এনজিওর মতো, যার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হবে এমআরএ এবং যে অংশটুকু ব্যাংকে স্থানান্তর হবে, সেটুকুর নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো এনজিও তার সম্পদের যে অংশটুকু ব্যাংকে স্থানান্তর করবে, সেই অংশটুকুরই দায়-দেনা স্থানান্তর করবে।
সিডিএফ বলেছে, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা থাকবে গরিব সদস্যদের হাতে। অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডার গরিব সদস্য হওয়ার অর্থই হচ্ছে তাঁদের ক্ষমতায়ন হবে। ব্যাংকের লভ্যাংশ তাঁদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে সাধারণ গরিব সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; বরং বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। এ ধরনের মালিকানার উদাহরণ বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকে রয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা গরিব সদস্যদের হাতে।
প্রচলিত ব্যাংক মূলত মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক হলে ক্ষুদ্রঋণ খাত মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে; দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে—এমন আশঙ্কা ঠিক নয় বলে মনে করে সিডিএফ। তারা বলছে, প্রস্তাবিত ব্যাংক মুনাফার জন্য করা হবে না, এটি হবে সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান, যার সেবা হবে বহুমাত্রিক। এ ধরনের ব্যাংকের উদ্যোক্তারা শুধু তাঁদের বিনিয়োগ করা মূলধনের সমপরিমাণ টাকা ফেরত নিতে পারবেন।
সিডিএফের মতে, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং থেকে উন্নত ও ব্যতিক্রমী। এই ব্যাংকের মালিকানার ৬০ শতাংশ সদস্যদের এবং ৪০ শতাংশ এনজিওগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে আসবে। এখানে অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় কোনো ব্যক্তি মুনাফার উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করবেন না। ফলে অর্জিত সব লভ্যাংশ ঘুরেফিরে সদস্যদের কল্যাণেই ব্যয় হবে।
সিডিএফ আরও বলেছে, ‘এশিয়া ও আফ্রিকার সব দেশেই ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আইন রয়েছে, যা মূলত মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগ। অন্যদিকে আমাদের প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক। মুনাফা মূল উদ্দেশ্য না হওয়ার বদলে মূল উদ্দেশ্য যেহেতু সামাজিক সমস্যার সমাধান করা, অর্থাৎ দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান ও নতুন নতুন উদ্যোগকে সহায়তা করা; তাই ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকগুলো হবে বিশ্বের জন্য বাংলাদেশের আরেকটি নতুন উদ্ভাবন ও দৃষ্টান্ত।’