সমবায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করতে সমবায় সমিতিগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের কার্যকর বাজারজাতকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজ রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘সমবায় সমিতিগুলোর মধ্যে দুর্নীতির কারণে বেশির ভাগ সমিতি নষ্ট হয়ে গেছে এবং তাদের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি সমিতি মাত্র সফলভাবে কাজ করছে। অথচ সমবায় আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সমবায় আন্দোলনকে সফল করতে হলে সংগঠনগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।’
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সমবায়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সমবায় আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯০৪ সালে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এ আন্দোলন চলেছে। জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে সমবায়কে সম্পৃক্ত করে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান ষাটের দশকে বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত ড. আখতার হামিদ খানকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁকে বার্ডের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে সমবায় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এতে সমবায় আন্দোলন অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি সমবায় উন্নয়নে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উল্লেখযোগ্য অবদান ও কার্যক্রম তুলে ধরেন। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে সমবায় খাত আরও দ্রুত গতিশীল হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি অতীতের সফল সমবায়ের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমবায়ের সেই অবস্থান এখন আর নেই। ধীরে ধীরে সমবায় আন্দোলন একেবারে নিচের দিকে চলে গেছে। এখন আর আগের মতো এই আন্দোলনের প্রতি গুরুত্ব বা মনোযোগ দেখা যায় না।’
সমবায় খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের উপযোগী করে বিদ্যমান সমবায়-সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন ও যুগোপযোগী করার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
সমবায় সমিতিগুলো যাতে দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ধারণা অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়েছে। এসব সংস্থার কার্যক্রমের কারণেও সমবায় আন্দোলন পিছিয়ে পড়েছে। ফলে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সমবায় সমিতিগুলো প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে টিকে থাকতে পারে।
সমবায় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ বাজারজাতকরণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এ ক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে পারে। সমবায়ভিত্তিক কোম্পানি গঠন করা যেতে পারে, যারা এসব পণ্য বাজারজাতকরণে সমবায় সমিতিগুলোকে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। পণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে এ ঘাটতি দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সমবায়ের মূল ধারণা হলো একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা। নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য যেসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি সমবায়ীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা এখনো সমবায় আন্দোলনকে ধরে রেখেছেন। তবে শুধু ধরে রাখলেই হবে না, এটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য সমবায় আন্দোলনকে আরও ব্যাপকভাবে দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।’
সমবায় অধিদপ্তর আয়োজিত এ বছরের সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘করবো সমবায়, গড়বো দেশ। সবার জন্য বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক সেলিম ফকির।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বক্তব্য দেন এ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের সভাপতি মো. আবদুস সালাম।
অনুষ্ঠানে সফল সমবায়ীদের হাতে পুরস্কার ও ক্রেস্ট তুলে দেন রাষ্ট্রপতি। এর আগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন তিনি।