সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হুমকির মুখে। এর বিরুদ্ধে দরকার ঐক্য, পেশার ঐক্য। সেই পেশার ঐক্যটা নেই।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার: স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ এসব কথা বলেন।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান বলেন, ‘শুধু যে সরকারি দলই আমাদের সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য হুমকি হবে, তা কিন্তু না; বিরোধী দলও হতে পারে। অরাজনৈতিক যেকোনো গোষ্ঠী বা বাণিজ্যিক-অবাণিজ্যিক দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীর দ্বারাও হতে পারে, তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা কেউ আমাদের মুখে তুলে দেবে না। এটা কখনোই দেয়নি। ভবিষ্যতেও দেবে না। সে কারণে আমাদেরই এটা আদায় করতে হবে এবং আদায় করার কথা বলে যেতে হবে।’
ঐক্য গড়ে তুলতে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কামাল আহমেদ বলেন, এই শিল্পে যাঁরা যথাযথভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সম্পাদনার দিক থেকে সম্পাদক পরিষদ, তাঁরাও এ ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা নেবেন।
গোলটেবিল আলোচনায় গণমাধ্যম সংস্কারে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত, দমনমূলক আইন সংশোধন, স্বাধীন কমিশন গঠন ও সাংবাদিক সুরক্ষা, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম বছরে অগ্রাধিকারে প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালী করা, ভুল তথ্য ও গুজব মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা নিয়ে ১৯ জন আলোচক বক্তব্য দেন।
ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, সাধারণত ‘মব’ বিশৃঙ্খল জনশক্তি হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তিনি দেখেছেন এটি সুসংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করেছে। তাঁর মতে, এই সুশৃঙ্খল হামলার পৃষ্ঠপোষকতা সরকারের কাছ থেকে এসেছে।
শুধু অর্থের অভাবে সাংবাদিকেরা দুর্নীতিগ্রস্ত হন না উল্লেখ করে নূরুল কবীর বলেন, অর্থের অভাবে সাংবাদিকেরা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, এটি সত্য নয়। অনেক ধনী সাংবাদিক ও সম্পাদকও দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকেন। প্রকৃত সাংবাদিক হলেন তাঁরা, যাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, আর যাঁরা তা করেন না তাঁরা হলেন পাবলিক রিলেশন অফিসার (জনসংযোগ কর্মকর্তা)।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দীন খান বলেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মধ্যে গড়ে ওঠা সাংবাদিকেরা হেনস্তার শিকার হন না; কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকেরা হেনস্তার শিকার হন। প্রেস কাউন্সিল নিষ্ক্রিয় দাবি করে তিনি বলেন, প্রেস কাউন্সিল ও প্রেস ইনস্টিটিউট ভালোভাবে সক্রিয় করা প্রয়োজন।
সাংবাদিক মো. মুক্তাদির রশীদ বলেন, ‘স্বাধীন কমিশন বা কোনো নতুন ব্যবস্থা আমি বিশ্বাস করি না; বরং মিডিয়াকে অ্যাকাউন্টেবল (জবাবদিহি) হতে হবে।’
বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ কে এম মনজুরুল ইসলাম বলেন, যখন থেকে ওয়েজ বোর্ডের বাইরে সাংবাদিক নেওয়া শুরু হলো, তখনই ওয়েজ বোর্ড ভাঙা শুরু হলো। গণমাধ্যমে দালালের সংখ্যাও বেড়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে রাখতে সংসদ ও গণমাধ্যমের কার্যকর জবাবদিহি জরুরি।
অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, প্রথম আলো ইংরেজি ওয়েব বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. সাজেদুল হক রুবেল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, জি ৯-এর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ, দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ রিপোর্টার জায়মা ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।