হোম > জাতীয়

সাইবার অপরাধ বাড়লেও পুলিশের জনবলে ঘাটতি

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 

কয়েক দিন আগে এক তরুণী উদ্যোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন বুলিংয়ের প্রতিকারের জন্য তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হননি। তিনি ফেসবুকে তাঁকে আক্রমণকারী ১০ জনকে শনাক্ত করে ই-মেইলে তাঁদের কর্মস্থলে অভিযোগ করেন। অফিসগুলো ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

ওই তরুণীর কথার সারমর্ম হলো, সাইবার অপরাধের অভিযোগে মামলা করলে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, পুলিশের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও বিচার পাওয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় তিনি আইনি প্রতিকারের পথে না গিয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন।

দেশে সাইবার অপরাধ অনেক বাড়লেও এই তরুণীর মতো অধিকাংশ ভুক্তভোগীই মামলা করেন না। পুলিশেরই এক গবেষণায় উঠে এসেছে, অনলাইনে বিভিন্ন হয়রানির শিকার ৮৯ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী মামলা করে না। ডিজিটাল অর্থ লেনদেনের প্রতারণার অভিযোগে মামলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তে পুলিশের সাইবার কোনো ইউনিট নেই। এ-সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ছোট টিম। সাইবার অপরাধ আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তা দমনে পিবিআই বা সিআইডির মতো আলাদা সাইবার ইউনিট গঠন করতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া ৮৯ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী সামাজিক লজ্জা, ভয় ও পরিবারের চাপে মামলা করে না। আবার যেসব মামলা হয়, তারও ৭২ শতাংশ শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে যায়।

ওই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন কিশোরী ও তরুণীর মধ্যে তিনজন কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। দেশে গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধের মোট ৪ হাজার ৭৯৪টি মামলা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি মামলা ডিজিটাল অর্থ লেনদেনে প্রতারণা ও যৌন হয়রানির অভিযোগে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন অপরিচিত ব্যক্তি তাঁর ছবি এডিট করে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেও থানায় যাওয়ার সাহস পাননি। পরিবারও বলেছে বিষয়টি চেপে যেতে।

ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালের মামলার অবস্থা তুলে ধরে ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী আবু নোমান শাওন বলেন, নারীদের ফেসবুক আইডি ক্লোন, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, গোপনে ভিডিও ধারণ, ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে ব্ল্যাকমেলের ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পরিচয় প্রকাশ হওয়ার ভয়, সামাজিক অসম্মান ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা থেকে থানায় যেতে চান না। তিনি বলেন, সাইবার মামলা তদন্তে যেমন দক্ষ পুলিশ নেই, তেমনি দক্ষ আইনজীবীও নেই। সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে বেশির ভাগ আইনজীবীর প্রশিক্ষণ নেই। তাই আদালতে মামলা প্রমাণ হচ্ছে কম।

প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবীরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে খুলে দিয়েছে অপরাধের নতুন দরজা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা ও ডিজিটাল যোগাযোগের প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। অথচ এই অপরাধের দ্রুত বিস্তারের তুলনায় তা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা এখনো দুর্বল।

প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবী তানভীর জোহা বলেন, ভুক্তভোগী শিশু, কিশোরী ও তরুণীদের থানা-পুলিশের কাছে যেতে পরিবার নিরুৎসাহী করে। এই নীরবতাই অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধের অভিযোগে করা মামলা খারিজ হওয়ার পেছনে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বড় কারণ। ডিজিটাল আলামত সংগ্রহে দুর্বলতা, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, বিদেশি সার্ভার থেকে তথ্য সংগ্রহে জটিলতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অনেক মামলা শেষ পর্যন্ত টেকে না। অনেক অপরাধী ভিপিএন, ভুয়া পরিচয় ও বিদেশি নম্বর ব্যবহার করায় তদন্ত আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সাইবার অপরাধের শিকার কেউ থানায় মামলা করলেও থানা-পুলিশে এ ধরনের কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় কিছু করতে পারে না। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের থানাগুলো থেকে এমন মামলা মহানগর পুলিশে বা রেঞ্জে পাঠানো হয়। তাদের চাহিদা অনুযায়ী রেঞ্জ অফিস, সিআইডি সদর দপ্তর, পিবিআই সদর দপ্তর ও মহানগর পুলিশের সাইবার বিভাগের ছোট একটি দল কাজ করে। তারা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য দিলে সে অনুযায়ী থানার পুলিশ তদন্ত করে। তবে সাইবার অপরাধের সব মামলা নয়, আলোচিত মামলাগুলো তদন্তে অগ্রাধিকার পায়।

দেশে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তে প্রধান দায়িত্ব পালন করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। এ ছাড়া ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশন এবং পিবিআইয়ের সাইবার শাখা গুরুত্বপূর্ণ সাইবার মামলা তদন্ত করে। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম গুরুতর সাইবার হুমকি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তদন্ত করে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে ৩ হাজার ৪৬৫টি আর্থিক প্রতারণা-সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে। অনলাইনে পোস্ট, মেসেজ, ছবি ও ভিডিও প্রচার করে হয়রানি-সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে ১ হাজার ৫৮৪টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাকের অভিযোগ ৪৯১টি। এর মধ্যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক ২৪৭টি ও ই-মেইল হ্যাক ১০৩টি। জিম্মি ও হুমকি-সংক্রান্ত ৪৩৮টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জিম্মির ঘটনা ৩৪৮টি। এ ছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) প্রতারণা ও হ্যাক ২২৮টি। ক্লোন-সংক্রান্ত ২১১ অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ক্লোন ১৭৪টি। পর্নোগ্রাফির ৩৯টি অভিযোগের মধ্যে ২৩টি ভুক্তভোগীর আসল ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ৮৩টি, ব্যাংক হিসাব ও কার্ড-সংক্রান্ত ৪২টি এবং অন্যান্য বিষয়ে রয়েছে ৪১৫টি অভিযোগ।

ডিএমপির সূত্র জানায়, গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে ৯০৫টি সাইবার জিডি জমা পড়েছে। এর মধ্যে টেলিগ্রাম ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, ফেসবুক জালিয়াতি, সাইবার বুলিং এবং আইডি হ্যাকের অভিযোগ বেশি ছিল। এ সময়ে দুটি মোবাইল, ১৫টি ফেসবুক ও ৭টি জিমেইল আইডি উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২৭৩ জনকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডিবির সাইবার ইউনিট ২৯০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় ১৪ সদস্যের ‘রিকভারি রেঞ্জার টিম’ কাজ করছে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার কাতারপ্রবাসী অলিফ হোসাইন মুরাদের স্ত্রী ফারজানা আহমেদের কাছে ইমুতে কল দিয়ে গত ২০ এপ্রিল ৯০ হাজার টাকা নিয়ে যায় প্রতারক চক্র। এ ঘটনায় ফারজানা থানায় করা মামলায় অভিযোগ করেন, ২০ এপ্রিল সকালে তাঁর স্বামীর ইমু থেকে তাঁকে কল করে এক ব্যক্তি জানান, তাঁর স্বামীকে কাতারের পুলিশ ধরে নিয়ে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে। ওই টাকা দিলে ছেড়ে দেবে। তিনি উদ্বিগ্ন হয় ওই ব্যক্তির দেওয়া মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে প্রথমে ৫০ হাজার ও পরে ৪০ হাজার টাকা দেন। পরে তিনি স্বামীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তাঁর কিছুই হয়নি। তিনি পুলিশ সুপারের কাছেও অভিযোগ দেন। যে নম্বরে টাকা পাঠিয়েছেন, সেই নম্বরও দিয়েছেন। কিন্তু অপরাধীরা এখনো শনাক্ত হয়নি।

ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, সাইবার অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সহজ। কারণ, সবকিছু প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে অপরাধীরা ধরা পড়বে। তিনি বলেন, ‘সাইবার অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনবল বাড়েনি। বারবার আইনের পরিবর্তন হয়েছে। নতুন আইন হয়েছে। এখন আমরা চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী হয়।’

ডিজিটাল অর্থ লেনদেনভিত্তিক প্রতারণা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি। মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে বেড়েছে ওটিপি জালিয়াতি, ফিশিং লিংক, ভুয়া কাস্টমার কেয়ার ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা। প্রতিদিনই কেউ না কেউ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হারাচ্ছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, সংঘবদ্ধ চক্রগুলো সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত অজ্ঞতাকে কাজে লাগাচ্ছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, সাইবার বুলিংয়ের প্রভাব শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি অনেক তরুণ-তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, ভুয়া গুজব ছড়ানো ও অনলাইন ট্রলিংয়ের কারণে অনেকে হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতায় এমনকি আত্মহননের প্রবণতায়ও ভুগছেন। শুধু আইন কঠোর করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তব্যবস্থা, দক্ষ ডিজিটাল ফরেনসিক টিম এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তা কাঠামো। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সাইবার সচেতনতা শিক্ষা চালু করা এবং নারীদের জন্য আলাদা সাইবার সাপোর্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিবছর ১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ আসবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী

চালু কারখানা টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা

এবার অর্থ পাচার মামলায় গ্রেপ্তার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

ফেসবুকে আওয়ামী লীগ–ভারতের বিপক্ষে লেখায় গুম

তিন ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন চলাচল শুরু

ফেনী ও পঞ্চগড়ের আলোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার

বিসিবির অ্যাডহক কমিটির কার্যক্রম স্থগিতের রিট খারিজ

বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারে ভয় পায় না: প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

তৃতীয় পক্ষ অশান্তি সৃষ্টি করে সরকারবিরোধী ক্ষোভ তৈরির চেষ্টা করছে: বিমানমন্ত্রী

ঈদযাত্রায় চন্দ্রা-বাইপাইলসহ ৪ এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ: সড়কমন্ত্রী