রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আজ রোববার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন।
সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে তাঁর নিজ দপ্তর থেকে প্রথাগত প্রটোকল ভেঙে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের উদ্দেশে রওনা হন। প্রধানমন্ত্রীর এই সাধারণ চলন দেখে রাস্তার দুই পাশে উৎসুক সাধারণ মানুষ ভিড় করেন এবং তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারির ওপর কঠোর দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, ‘শুধু পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারির সঙ্গে আপস করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাময়িকভাবে হয়তোবা লাভবান হতে পারেন। তবে সেটি সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনের দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সব পদেই কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব সময় নিজেদের পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই জনপ্রশাসনকে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অপেশাদার করে তোলার অন্যতম একটি কারণ বলে আমার মনে হয়। আমার ধারণা, আমার এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আপনারা একমত। সুতরাং আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদকেই “গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য” ভাবুন। দেশের যেকোনো স্থানেই যেকোনো সময় জনপ্রশাসনের যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনাদেরকে মনে রাখা জরুরি, একটি সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।’
প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো পদে দেশের স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পেশাদারির ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি প্রমাণিত হয়েছে যে জনপ্রশাসন চাইলে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দিয়েছিল।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
বাজার সিন্ডিকেট দমন: কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারি সহ্য করা হবে না। নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
খাল খনন ও কৃষি বিপ্লব: প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচিতে জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। এটি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করা।
ডিজিটাল ও স্মার্ট প্রশাসন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি সেবাকে আরও দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করা।
সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী: কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডের সঠিক বণ্টন এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন।
মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা: খাদ্যে ভেজাল, বাল্যবিবাহ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টকে আরও নিয়মিত ও দৃশ্যমান করা।
মাদক ও আইনশৃঙ্খলা: মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ: সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষ যেন কোনো অনিয়মের শিকার না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা।
স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনগণের শহরমুখিতা হ্রাস করতে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা।
জাতীয় ঐক্য ও সেবা: রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দল-মতনির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির জানান, এবারের সম্মেলনে ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত থাকছেন। ৪ দিনে ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে ৩০টিই হলো সরাসরি কার্য অধিবেশন। মাঠ প্রশাসন থেকে এবার ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বাছাইকৃত ৪৯৮ প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব এসেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ-সম্পর্কিত।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।
৬ মে পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। এর মাধ্যমে সরকারের কর্মপরিকল্পনা ও মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।