ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে গাজীপুর, আবদুল্লাহপুর, বাইপাইল ও চন্দ্রা এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। এসব এলাকায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, অস্থায়ী কাউন্টার ও অনিয়মিত পরিবহন নিয়ন্ত্রণে এবার ৬৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
আজ সোমবার বিকেলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ আয়োজিত ঈদের প্রস্তুতিমূলক এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বাস মোতায়েন, পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি এবং ফেরিঘাট ও সদরঘাটে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সড়কমন্ত্রী জানান, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে রেল, নৌ ও সড়ক পরিবহন খাতে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে গত ঈদের ভোগান্তি এবং দুর্ঘটনার কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে পরিবহনমালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি, বিআরটিএ, বিআরটিসি, হাইওয়ে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, এলজিআরডিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, গত ঈদে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছিল পোশাক খাতের (গার্মেন্টস) শ্রমিকদের একই দিনে বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে। বিজিএমইএর সঙ্গে তিন ধাপে ছুটি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা যায়নি। ফলে গাজীপুর ও এর আশপাশের এলাকায় এক দিনেই ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ার চেষ্টা করেন। অনেক যাত্রী বাস কাউন্টারে না গিয়ে সরাসরি সড়কে নেমে যানবাহনে ওঠার চেষ্টা করায় তীব্র যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
সড়কমন্ত্রী আরও বলেন, এবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও ঈদযাত্রার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বৃষ্টি হলে যানজট বাড়ে, পুলিশের তৎপরতা ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে কোরবানির পশু পরিবহনের বাড়তি চাপ। গত ঈদে মহাসড়কে ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি।
তবে এবার পরিস্থিতি মোকাবিলায় গাজীপুর এলাকায় বিআরটিসির পাশাপাশি বেসরকারি বাস রাখারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গতবার ২৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হলেও এবার তা বাড়িয়ে ৬৯ টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, আবদুল্লাহপুর, বাইপাইল, গাজীপুর ও চন্দ্রা এলাকায় অস্থায়ী কাউন্টার এবং অনিয়মিত পরিবহন কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে। সেখানে স্থায়ীভাবে মোবাইল কোর্ট, পুলিশি নজরদারি ও পরিবহনমালিকদের প্রতিনিধি রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গত ঈদে ১১ দিনে নিহত হন ১৭০ জন। এর মধ্যে মহাসড়কে নিহত হন ৪৩ জন, অন্যরা স্থানীয় সড়কে।
মন্ত্রী আরও বলেন, মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, ব্যাটারিচালিত যান চলাচল ও স্থানীয় সড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দুর্ঘটনার বড় কারণ। অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যান মহাসড়কে চালানো নিরুৎসাহিত করতে হাইওয়ে পুলিশকে আরও সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জনবল-সংকটও রয়েছে। মন্ত্রী জানান, প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়কের জন্য মাত্র তিনজন হাইওয়ে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।
সড়কমন্ত্রী বলেন, দেড় কোটির বেশি মানুষকে দুই-তিন দিনের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এবং প্রায় এক কোটি কোরবানির পশু পরিবহন নিশ্চিত করা বর্তমান অবকাঠামো ও সক্ষমতার মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরিচা ঘাটের দুর্ঘটনার উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, সেখানে একটি বাস ফেরিতে ওঠার আগেই চলতে শুরু করে নদীতে পড়ে যায়। তদন্তে দেখা গেছে, বাসটির ব্রেক ও হ্যান্ডব্রেক ঠিকমতো কাজ করছিল না।
এবার ফেরিতে বাস ওঠানোর ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে ফেরিতে ওঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ফেরিতে ওঠার আগে ব্যারিকেড বসানো হচ্ছে, যাতে ফেরি পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত কোনো যানবাহন এগোতে না পারে। ফেরির পন্টুনেও অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সদরঘাটের দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, এবার স্পিডবোট ও ছোট নৌযান থেকে সরাসরি লঞ্চে ওঠা বন্ধ থাকবে। যাত্রীরা পন্টুন ব্যবহার করে ওঠানামা করবেন। এ জন্য নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং নৌ পুলিশ সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, মহাসড়কের পাশে বা ওপরে কোথাও পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।