বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের আমন্ত্রণে দুই দিনের সরকারি সফরে আজ শুক্রবার ঢাকায় এসেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে এটিই তাঁর প্রথম সফর। এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সফরকালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে হাকান ফিদান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানাবেন। পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা শিল্প, জ্বালানি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করার বিষয়ে তুরস্কের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করবেন তিনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে বিএনপি নতুন সরকার গঠনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রদূত বেরিস একিনসি। এরপর মার্চ মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. খলিলুর রহমান তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে তুরস্কে যান এবং এপ্রিলে ‘আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে’ অংশ নেন।
এই ধারাবাহিকতায় হাকান ফিদানের সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা হবে। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, উভয় দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ছিল প্রায় ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার; যার মধ্যে তুরস্কের রপ্তানি ছিল ৪৩০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ থেকে আমদানি ছিল ৯২৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান এবং দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই নেতা মতামত বিনিময় করবেন। এর পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা শিল্প, জ্বালানি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করবেন।
হাকান ফিডানের সফরের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর ক্যাম্প পরিদর্শন। সেখানে হাকান ফিদান তুরস্কের বিভিন্ন সংস্থা যেমন—‘তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা’ (টিকা), ‘দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ (আফাদ), ‘তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট’, ‘তুর্কি দিয়ানাত ফাউন্ডেশন’ এবং তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানবিক সহায়তা প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করবেন। এছাড়া সেখানে পরিচালিত ‘তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল’-এর কার্যক্রমও তিনি খতিয়ে দেখবেন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ফিল্ড হাসপাতালে বর্তমানে ৩০ জন তুর্কি এবং ৫৫ জন স্থানীয় কর্মীসহ মোট ৮৫ জন নিয়োজিত আছেন, যা প্রতিদিন প্রায় এক হাজারজন রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশিকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছে। রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তুরস্ক ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি) ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফরের মাধ্যমে হাকান ফিদান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্বের সাথে টিকিয়ে রাখার এবং বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর পাশে থাকার ব্যাপারে তুরস্কের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবেন। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত ও গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করবেন।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে গতিশীলতা বজায় রয়েছে, তা নিয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করবেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তুরস্কের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে হাকান ফিদান জানাবেন, বিশ্বমঞ্চে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অন্যতম শীর্ষ অ্যাজেন্ডা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে আঙ্কারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সংকটের শুরু থেকেই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, খাদ্য ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে তুরস্ক যে ব্যাপক মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে, আগামী দিনগুলোতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বস্ত করবেন।
এ ছাড়া, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টিও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষভাবে তুলে ধরবেন।
তথ্যসূত্র: ডেইলি সাবাহ ও টিআরটি গ্লোবাল