১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তবে ’৬৬ সালের ৬ দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন একে একে পটভূমি তৈরি করে রেখেছিল। সব মিলিয়ে একাত্তরের পুরো মার্চ মাসই ছিল অগ্নিগর্ভ। আজ ক্যালেন্ডারের পাতায় সেই অবিস্মরণীয় মার্চের প্রথম দিন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ মাস এক অসামান্য গৌরবের সময়। পূর্ব পাকিস্তান তথা তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষ এই মাসেই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ ও অন্তত ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম নিজের ভূখণ্ড আর পতাকা। এ বছর জাতি উদ্যাপন করবে স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫ বছর। এ উপলক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার মাসের প্রথম দিন থেকে সারা দেশে শুরু হচ্ছে সভা-সমাবেশ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজন।
পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকেরা বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন হঠাৎ স্থগিত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দেন এবং এর প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করেন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তিনি। ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। মার্চজুড়ে আন্দোলন চলতে থাকে। এদিকে আলোচনার নামে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর গণহত্যার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
২৫ মার্চের কালরাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। সে রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকাসহ কয়েকটি স্থানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ঢাকার রাজপথে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়। বস্তিসহ অনেক জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানার বিজিবি সদর দপ্তরে (তখন নাম ইপিআর) হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চলে। পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে শত শত ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মীকে হত্যা করে। ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর জেনে বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতের দিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ২৬ মার্চ তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস।