এবার কোরবানির ঈদে সারা দেশের মাঠপর্যায়ে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের বাইরে থেকে গেছে ৩০ থেকে ৩৩ লাখ চামড়া। এসব চামড়ার বেশির ভাগ নষ্ট হওয়ার আভাস মিলেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে পানির দরে বিক্রি হয়েছে গরুর চামড়া। ছাগলের চামড়ার তো অনেক জায়গায় দামই মেলেনি। তাই চামড়া বিক্রি করতে এসে মৌসুমি ও ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাদ যাননি বিভিন্ন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও এতিমখানা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে রাগে-ক্ষোভে অনেকে সেসব চামড়া রেখে গেছেন রাস্তায়, ফেলেছেন নদী-খালে, পুঁতেছেন মাটিতে।
সরকার ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, এ বছর দেশে প্রায় ৯০ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ছিল ১ কোটি ১ লাখের বেশি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ৫৬ লাখ ৭০ হাজার চামড়া। এগুলোর মধ্যে সাভারের ট্যানারিতে ৫ লাখ ২৮ হাজার কাঁচা চামড়া এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ৩৩ লাখ হাজার চামড়া সংগ্রহের বাইরে রয়ে গেছে; যা প্রায় ৩৭ শতাংশ।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিসাবের বাইরে থাকা চামড়ার একটি অংশ হয়তো এখনো সংগ্রহ করা হবে। তবে বেশির ভাগ পশুর চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে। কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও খাল-নদীতে, আবার কোথাও মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া।
এর অর্থ শুধু কয়েক লাখ চামড়া নষ্ট হওয়া নয়; এর অর্থ কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদের অপচয়।
জানতে চাইলে বিসিকের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত বছর ৬০ লাখের মতো চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল। এ বছরও সেই রকম হবে।
চামড়ার দর কেমন জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভারের ট্যানারিতে লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এ বছর সরকার চামড়া প্রস্তুতের জন্য ২০ কোটি টাকার লবণ দিয়েছে। আমরা এগুলো ট্যানারি-পোস্তা এবং এতিমখানা ও মাদ্রাসায় বিতরণ করেছি। প্রস্তুতি অনুসারে পশুর পরিমাণ কম।
পশু কোরবানির হিসাব জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক শরিফুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, মাঠপর্যায়ের প্রকৃত তথ্য এখনো হাতে আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে সাত দিনের মধ্যে তথ্য জানাতে বলা হয়েছে, যথাসময়ে জানানো হবে।
এবার দেশের বহু এলাকায় চামড়া বিক্রি করতে না পেরে কোরবানিদাতারা সেগুলো নদীতে ফেলেছেন বা মাটিচাপা দিয়েছেন।
চট্টগ্রামে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত চামড়া সড়কের পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেক চামড়ায় পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। পরে সিটি করপোরেশন সেগুলো অপসারণ করেছে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী জাবেদ উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিটি চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় কিনেছিলাম। কিন্তু আড়তদারেরা ৫০ থেকে ২০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হয়নি। এত কম দামে বিক্রি করলে পুরো মূলধনই হারাতে হতো। শেষ পর্যন্ত অনেকে চামড়া ফেলে চলে গেছে।’
একই কথা বলেছেন মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী হেলাল মিয়া ১২৫টি চামড়া কিনেছিলেন। প্রতিটি চামড়ার দাম ছিল ২০০ টাকা। বিক্রির আশায় দুই দিন অপেক্ষা করেও কোনো ক্রেতা পাননি। শেষ পর্যন্ত ১০৫টি চামড়া তিতাস নদে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
মৌলভীবাজারে বহু কওমি মাদ্রাসা এবার চামড়া সংগ্রহই করেনি। কারণ, গত বছর সংগ্রহ করে লোকসান গুনতে হয়েছে। ফলে এ বছর অনেক কোরবানিদাতা চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়ে সেগুলো মাটিচাপা দিয়েছেন কিংবা নদীতে ফেলেছেন।
বরিশালের আগৈলঝাড়ার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আলী আকবর বলেন, অনেক কষ্ট করে চামড়া সংগ্রহ করা হলেও বাজারে ক্রেতা নেই। সংরক্ষণের জায়গাও নেই। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
চামড়া সংগ্রহকারী কাওছার আহমদ বলেন, ৫০টি চামড়া বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৪ হাজার টাকায়। এতে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচও ওঠেনি।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান উপদেষ্টা মো. আফতাব খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, এ বছর অনেক পশু বিক্রি হয়নি। গত বছরের চেয়ে কম বিক্রি হয়েছে।
কোরবানির চামড়ার ১০ শতাংশ নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক উল্লেখ করে সাবেক সভাপতি বলেন, নষ্ট হওয়া পশুর মধ্যে ছাগলের চামড়া বেশি। মোট ছাগলের চামড়ার ৬০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে আফতাব খান বলেন, ‘পাচার হওয়ার শঙ্কা নেই। কারণ, আমাদের চেয়ে ভারতের চামড়ার কোয়ালিটি ভালো। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে।’
চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্যানারিমালিকেরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ নতুন নয়। ট্যানারিগুলোর কাছে ব্যবসায়ীদের বিপুল অঙ্কের বকেয়া রয়েছে। অনেক আড়তদারের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই। অন্যদিকে সংরক্ষণ ব্যবস্থাও দুর্বল। মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহের পর দ্রুত লবণ দেওয়া এবং বিপণনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর একই সংকট তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া, ট্যানারি খাতের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়। এর ৬০ শতাংশের বেশি আসে কোরবানির ঈদে। অর্থাৎ কোরবানির কয়েক দিনের মধ্যে দেশের চামড়াশিল্পের একটি বড় অংশের কাঁচামাল সংগ্রহ হওয়ার কথা। কিন্তু সেই সময়ে যদি ৩০ লাখের বেশি চামড়া নষ্ট হয়ে যায় কিংবা সংগ্রহের বাইরে থেকে যায়, তাহলে তা শুধু একটি মৌসুমি বাজার ব্যর্থতার ঘটনা নয়; এটি জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঢাকার জবাই করা পশুর চামড়ার দর ধরে রাখতে সাভারের ট্যানারিতে রক্তযুক্ত চামড়া কেনা হয়েছে। তবে দেশের অন্যান্য জায়গায় চামড়া নষ্ট হয়েছে।
সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘সিজনাল ব্যবসায়ীরা সঠিক সময়ে চামড়ায় লবণ যুক্ত করেননি। ফলে চামড়া পচে গেছে; তাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় চামড়া ফেলে দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে, তাতে আমরা মনে করি, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০। এগুলোর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। এ বছর চাহিদা ছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টির।
এর আগে ২০২৫ সালে দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছিল। বছরটিতে গরু-মহিষ কোরবানি হয়েছে ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি। আর ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য প্রাণী (উট, দুম্বা ইত্যাদি) কোরবানি হয়েছে ৯৬০টি।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]