সাত দিনে (২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ) রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে ডিলাররা তুলেছে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জ্বালানি তেল। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই পরিমাণ তেল ডিলারদের কাছে যেত ১৬ দিনে।
জ্বালানি তেল বিক্রির এই হিসাব জানাজানি হলে ঘুম ভাঙে মন্ত্রণালয়ের। লাগাম টানার পর বিপণন পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে বর্তমানে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং চালু করার প্রাথমিক আলোচনা শুরু করে। গত ৩ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে এ নিয়ে সভাও হয়। এরই মধ্যে ঘটেছে ওই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে পাওয়া তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে তিন কোম্পানি থেকে প্রতিদিন তেল সরবরাহ করা হয় ১১-১২ হাজার টন। অথচ ওই সাত দিনে ১৩-১৪ হাজার টন জ্বালানি তেল বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ডিলারদের। এটাকে অস্বাভাবিক ও নিয়মবহির্ভূত বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তেলের সংকট মাথায় রেখে যেখানে সঞ্চয়ী হওয়ার কথা, সেখানে অতিরিক্ত তেল দেওয়ার ঘটনায় তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটি কোম্পানি দিনে ৩ হাজার ৬৬৫ টন থেকে ৪ হাজার টন জ্বালানি তেল বিক্রি করতে পারে। সেখানে ওই সাত দিনে তিন কোম্পানি গড়ে বিক্রি করেছে ২৫ হাজার টন করে। এই হিসাবে প্রতি কোম্পানির হাত ঘুরে ডিলারদের কাছে গেছে দিনে ৮ হাজার ৩৩৩ টনের মতো জ্বালানি তেল।
অতিরিক্ত তেল কেন দেওয়া হলো, তা জানার জন্য ফোন করা হলে যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমির মাসুদ বিষয়টি এড়িয়ে যান।
মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত ১-৫ মার্চ পর্যন্ত মেঘনা অয়েল কোম্পানি ডিলারদের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি করে দেয় ৫০ হাজার ৪১৩ টন; যা প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার টনের বেশি। এভাবে দেদার জ্বালানি তেল বিক্রির বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছালে তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। তখন বিক্রি আবার নামিয়ে ৩ হাজার ৭১৪ টনে আনা হয়।
একইভাবে পদ্মা অয়েল কোম্পানিও ডিলারদের জন্য ওই সাত দিনে অতিরিক্ত জ্বালানি বিক্রি করে। ওই সাত দিনে ৪১ হাজার ২৫৮ টন জ্বালানি তেল ডিলারদের দেওয়া হয়, যা প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৮৭৬ টনের মতো।
অপর কোম্পানি যমুনা অয়েলও ডিলারদের কাছে একইভাবে তেল সরবরাহ করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্বাভাবিক সময়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন তেল সরবরাহ করার কথা ১৬ দিনে। কিন্তু তিন কোম্পানি এই পরিমাণ তেল সরবরাহ করে মাত্র সাত দিনে।
এই বিষয়ে পদ্মা অয়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, এটা স্পষ্ট অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কর্তৃপক্ষ এই দায় এড়াতে পারে না। সাত দিনে বিক্রি করা এত তেল গেল কোথায়?
এই বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের (মনিটরিং ও প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার ও মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
বিপিসি থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৯২ শতাংশ আমদানি করতে হয় বিপিসিকে। বাকি ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়। সরবরাহ করা জ্বালানির মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)।