রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় গত বছরের ২৬ অক্টোবর মেট্রোরেলের পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন পথচারী নিহতের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিয়ারিং প্যাডের মানসংক্রান্ত গুরুতর ত্রুটি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে নকশাগত ত্রুটির কথাও বলা হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি এ ঘটনায় কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের যোগসাজশ পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্ঘটনায় এই তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কনটেন্ট প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে দেশের বাইরের ল্যাবরেটরিতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বিয়ারিং প্যাডগুলো কিছুটা ঢালু অবস্থায় (০.৮ শতাংশ স্লোপ) সন্নিবেশিত করা হয়েছিল, যা বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুতির ক্ষেত্রে আংশিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনটির উভয় প্রান্তেই বৃত্তাকার (কার্ড) অ্যালাইনমেন্ট রয়েছে।
কমিটির অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে, ভায়াডাক্টের সোজা অ্যালাইনমেন্ট ও বৃত্তাকার অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে কোনো ধরনের ট্রানজিশন কার্ড ব্যবহার করা হয়নি। এ কারণে মেট্রোরেলের অ্যালাইনমেন্ট নকশায় ত্রুটি থাকতে পারে বলে কমিটির ধারণা। প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্ভ অ্যালাইনমেন্টের জন্য আলাদাভাবে মডেলিং ও অ্যানালাইসিস করা হয়নি; বরং সোজা অ্যালাইনমেন্টের মডেলিং ও অ্যানালাইসিস দিয়েই কার্ড অ্যালাইনমেন্টের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ট্রেন চলাকালীন কমিটি যে কম্পন পরিমাপ করেছে, তাতে দেখা গেছে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাড সংশ্লিষ্ট পিয়ারসমূহে—বিশেষ করে পিয়ার নম্বর ৪৩০ ও ৪৩৩-এ—অন্যান্য পিয়ারের তুলনায় কম্পন অনেক বেশি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কার্ভ অ্যালাইনমেন্টে নকশাগত সম্ভাব্য ত্রুটির কারণে এ অংশে অযাচিত পার্শ্ববল ও সংশ্লিষ্ট কম্পনের সৃষ্টি হচ্ছে, যার সঙ্গে বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে দেখা যায়, কার্ভ অ্যালাইনমেন্ট ও নিকটস্থ স্টেশনে রেলট্র্যাকের নিচে নিওপ্রিন রাবার ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও দুর্ঘটনাস্থল সংশ্লিষ্ট মধ্যবর্তী ট্র্যাক অংশে রিজিড ট্র্যাক রাখা হয়েছে। কমিটির ধারণা, এসব স্থানে ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলে ভাইব্রেশন কমানো সম্ভব হতো।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—কার্ভ অ্যালাইনমেন্টের সংশ্লিষ্ট স্থানে বিয়ারিং প্যাড যাতে সরে যেতে না পারে, সে জন্য জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ, যা ইতিমধ্যে ডিএমটিসিএল কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ ছাড়া বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার কারণ সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য থার্ড পার্টি ইনডিপেনডেন্ট কনসালট্যান্ট দিয়ে ভায়াডাক্টের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও ট্র্যাক ডিজাইনের বিস্তারিত অ্যানালাইসিস ও গভীর পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটি আরও সুপারিশ করেছে, মেট্রোরেলের সার্বিক প্রকল্প নকশার ওপর একটি থার্ড পার্টি সেফটি অডিট পরিচালনা, নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত একটি কার্যকর ও যথাযথ স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন এবং সর্বোপরি মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশি পরামর্শকের কাছ থেকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করতে জোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।
এদিকে, ২০২৪ সালে ফার্মগেটে মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে পর্যালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড প্রথমবার খুলে পড়েছিল। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও ট্রেন চলাচল ১১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। গত বছর ২৬ অক্টোবর একই এলাকায় পুনরায় বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এক যুবকের মৃত্যু হয় এবং পুনরায় মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রাণহানির ওই ঘটনার পর সরকার এই তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।