ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর দীর্ঘ দুই দশক পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা আগামী আজ শপথ গ্রহণ করবেন। সংবিধান অনুযায়ী এই নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আগামী পাঁচ বছর আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবেন।
তবে নতুন সরকারের আগমনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে জনমনে বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের পেছনে ঠিক কত টাকা ব্যয় হয়? ১৯৭৩ সালের ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রিমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট’ (সর্বশেষ ২০১৬ সালে সংশোধিত) এবং সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত অর্ডার অনুযায়ী তাঁদের বেতন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধার একটি বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
১. মাসিক বেতন ও প্রটোকল সুবিধা
একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মাসিক মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন পান। সংসদ সদস্যদের জন্য মাসিক বেতন নির্ধারিত আছে ৫৫ হাজার টাকা। তবে এই মূল বেতনের বাইরেও তাঁরা বড় অঙ্কের বিভিন্ন ভাতা পেয়ে থাকেন। যেমন—একজন সংসদ সদস্য প্রতি মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনী এলাকা ভাতা এবং ৫ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা পান।
২. আবাসন ও সাজসজ্জা বরাদ্দ
সরকার মন্ত্রীদের জন্য রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সুসজ্জিত বাসভবন দেয়। এই বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিফোন বিলের সম্পূর্ণটাই রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়। যদি কোনো মন্ত্রী সরকারি বাসভবনে না থেকে নিজ বাড়িতে বা ভাড়া বাড়িতে থাকেন, তবে তিনি প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকা ঘরভাড়া পান (প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে ৭০ হাজার টাকা)। এ ছাড়া সরকারি বাড়ি সাজসজ্জা বা আসবাবপত্রের জন্য একজন মন্ত্রী বছরে ৫ লাখ টাকা এবং প্রতিমন্ত্রীরা ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারেন।
৩. বিলাসবহুল গাড়ি ও জ্বালানি সুবিধা
মন্ত্রীদের জন্য সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি এবং একজন চালক বরাদ্দ থাকেন। বিশেষ প্রয়োজনে তাঁরা অতিরিক্ত একটি জিপ গাড়িও ব্যবহারের সুযোগ পান। জ্বালানি বাবদ মন্ত্রীরা দৈনিক ১৮ লিটার তেলের সমপরিমাণ অর্থ পান। অন্যদিকে, সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির বিশেষ সুবিধা পান, যা সাধারণ নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যাতায়াত ভাতা হিসেবে সংসদ সদস্যরা মাসে ৭০ হাজার টাকা এবং নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াতের জন্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ট্রাভেল পাস বা ভাতা পেয়ে থাকেন।
৪. চিকিৎসা ও বিমা সুবিধা
মন্ত্রিসভার সদস্যরা অসুস্থ হলে তাঁদের দেশি-বিদেশি যাবতীয় চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করে। সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা ছাড়াও মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। এ ছাড়া দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের জন্য ১০ লাখ টাকার সরকারি বিমা সুবিধাও রাখা হয়েছে।
৫. নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন ও দাতব্য তহবিল
জনসেবার জন্য জনপ্রতিনিধিদের হাতে থাকে বিশাল অঙ্কের তহবিল। নিজ এলাকার মসজিদ, মন্দির বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য একজন মন্ত্রী বছরে ১০ লাখ টাকা এবং সংসদ সদস্যরা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন। এ ছাড়া টিআর, কাবিখা ও বয়স্ক ভাতার মতো প্রায় ৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের সুবিধাভোগী কারা হবেন, তা নির্ধারণে সংসদ সদস্যদের মতামতই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।
৬. বিদেশ ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা
রাষ্ট্রীয় কাজে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা বিশেষ প্রটোকল পান। যাতায়াতের জন্য তাঁরা সর্বোচ্চ শ্রেণির (ফার্স্ট ক্লাস) ভাড়া এবং দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০-৮০ হাজার টাকা) ভ্রমণ ভাতা পান।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হওয়া কিছু চুক্তির দায়ভারও এখন এই নির্বাচিত সরকারের ওপর পড়বে। এ অবস্থায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের মন্ত্রী-এমপিদেরও বিলাসিতা কমিয়ে সাইকেলে চড়া বা গণপরিবহন ব্যবহারের নজির স্থাপন করা উচিত। মন্ত্রিসভাও যথাসম্ভব ছোট রাখা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ইশতেহারে দেওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। সাধারণ জনগণ এখন কেবল শপথের অপেক্ষা নয়, বরং জনপ্রতিনিধিদের রাষ্ট্রীয় খরচের লাগাম টানার বাস্তব পদক্ষেপও দেখতে চায়।