জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। আজ রোববার জাতীয় সংসদে বিল দুটি পাস হয়। এর মধ্যে গুমের ফলে মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার কিংবা পাঁচ বছর পার হলেও জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও আমলযোগ্য এবং জামিন ও আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গুমের সাধারণ অপরাধের জন্য অন্যূন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কিংবা কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে এবং স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করে অথবা তাঁর অবস্থান গোপন রাখলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।
গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বিলে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালতে গুমের অপরাধের বিচার হবে। অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনী কিংবা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দিতে পারবে।
বিলে বলা হয়েছে, এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কোনো অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচারযোগ্য বলে প্রতীয়মান হলে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাতে হবে। প্রয়োজনে চিফ প্রসিকিউটর অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারবেন।
গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার ও ডিজিটাল সাক্ষ্য নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে।
ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দেবে। গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।
পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি গুমসংক্রান্ত তথ্যের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিলে গুমের মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আদালতের কাছে অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক বলে প্রতীয়মান হলে অভিযোগকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন আদালত। একই সঙ্গে অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।
বিল পাসের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আগের অধ্যাদেশকে শক্তিশালী করে এই বিল আনা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটিও শক্তিশালী করে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আমরা গুমের এই প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে এসেছি।’
এদিকে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পাস হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে তোলেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
বিলে ২০০৯ সালের আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। কমিশন স্বাধীন ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে মানবাধিকার সুরক্ষা ও এর উন্নয়ন সাধন করবে।
একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন নারী ও একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকবেন।
চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি বাছাই কমিটি থাকবে। এতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য; মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক; রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি; জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তাঁর মনোনীত সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি থাকবেন।
বিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদা পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।
প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট হলে আর কোনো উদ্যোগ নেবে না। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ করতে পারবে। ওই সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে জানাবে।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে কমিশন এক বা একাধিক তদন্ত দল গঠন করতে পারবে।