দুর্নীতি দমন কমিশন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশন-শূন্যতা পাঁচ মাস পেরিয়ে ছয় মাসে পড়েছে। নতুন কমিশন গঠনের জন্য দেড় মাস আগে সার্চ কমিটি করা হয়। এখনো কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। অনুসন্ধান-তদন্ত এবং মামলা পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চলমান থাকলেও কমিশনের নেতৃত্ব ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের।
গত ৩ মার্চ দুদকের আগের কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেটি সম্পন্ন করতে ৩০ দিনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ২ জুলাই কমিশন নিয়োগের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। তবে মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবেদন আহ্বানের পর প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই, যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি, সাক্ষাৎকার বা অন্যান্য যাচাইপ্রক্রিয়া শেষে সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করতে পারে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে নতুন কমিশন গঠিত হবে।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশন না থাকলেও আইন ও বিধি অনুযায়ী নিয়মিত অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলার কার্যক্রম চলছে। তবে কমিশনের অনুমোদন বা সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, এমন বিষয়গুলোতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ করে বড় দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ কমিশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফলে দীর্ঘ কমিশন-শূন্যতা শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশন পদ শূন্য হলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দুদকের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় কমিশন-শূন্য থাকার নজির নেই। প্রায় পাঁচ মাস কমিশন না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দুদককে কার্যকর রাখার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ আছে কি না, জনমনে সেই প্রশ্নও উঠছে।
দুদকের গঠন কর্মপরিধি নিয়েও সমালোচনা করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দুদক ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা এবং বিরোধীদের হয়রানি করে জনমনে এমন ধারণা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ নেতৃত্বশূন্যতা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, দুর্নীতি দমনের জন্য দুদকই দেশের একমাত্র সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। কমিশন না থাকায় নতুন অভিযোগ গ্রহণ, অনুসন্ধান ও তদন্তের পাশাপাশি গ্রেপ্তার, সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ, জামিনের বিরুদ্ধে আপিল এবং খালাসের বিরুদ্ধে আপিল—কোনো কার্যক্রমই স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছে না। এর সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন যাঁরা অতীতে দুর্নীতি করেছেন এবং বর্তমানে দুর্নীতি করে চলেছেন।
সাবেক এই দুদক কর্মকর্তা বলেন, সরকার চাইলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিশন গঠন করতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কমিশন গঠন না হওয়া থেকে প্রতীয়মান হয়, দুর্নীতি দমন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সার্চ কমিটির পরও কেন এত সময়: গত ২২ জুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি গঠনের পর গত ২ জুলাই সার্চ কমিটি যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে। তবে দ্রুত কমিশন গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও তা হয়নি।
এ বিষয়ে দুদকের নবনিযুক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, সার্চ কমিটির যাচাই-বাছাই শেষ করে কমিশনার নিয়োগের জন্য খসড়া তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। খুব শিগগির কমিশন গঠিত হতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত ৩ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন।