কলেজছাত্র ইমাম হাসান তায়িম পুলিশের গুলিতে নিহত হলেও সুরতহালে গুলি উল্লেখ না করে ওপরের নির্দেশে ছিদ্র ও কালো স্পটের কথা লিখেছেন বলে সুরতহাল করা পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালকে এ কথা বলেছেন তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন ভূইয়া। তিনি নিজেও পুলিশের উপপরিদর্শক। গতকাল বুধবার তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জবানবন্দি দেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তায়িম হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান ও সাবেক উপপরিদর্শক শাহাদাত আলী। গতকাল তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পলাতক আসামিরা হলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন এসি নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।
ময়নাল হোসেন জবানবন্দিতে বলেন, তাঁর তিন ছেলের মধ্যে ইমাম হাসান তায়িম ভূইয়া ছোট। সে নারায়ণগঞ্জের আদমজী এমডব্লিউ কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অংশ নেয় সে। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই তায়িম তার বন্ধু শাহরিয়ারের ফোন পেয়ে বাসা থেকে চা খাওয়ার কথা বলে বের হয়। কিন্তু সে, শাহরিয়ার ও রাহাত কাজলায় অবস্থান নেয়। তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ছিলেন। দুপুরে তাঁর শ্যালিকা ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে জানান, তায়িমকে কাজলা ফুটওভারব্রিজে গুলি করে ফেলে রেখেছে।
ময়নাল হোসেন বলেন, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ছেলেকে খোঁজেন। একজন সাংবাদিক মর্গে কিছু বেওয়ারিশ লাশ পড়ে থাকার কথা জানালে তিনি মর্গে গিয়ে ২০-৩০টি লাশ দেখেন। সেখানে না পেয়ে নতুন ভবনের ইমার্জেন্সি মর্গে গিয়ে আরও অনেক লাশের সঙ্গে ছেলের লাশ দেখেন। তার বুকে, পেটে এবং পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখেন।
লাশের সুরতহাল এবং ময়নাতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক শাহদাতকে। পরদিন দুপুর ১২টার দিকে লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য যান এসআই শাহদাত। বিকেল সাড়ে ৪টার সময় তিনি লাশ বুঝে পান। পরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে নিয়ে গোসল করানো হয়। তখন লাশের কোমরের বাঁ পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়। দাগ দেখে বোঝা যায়, এটা পিস্তলের গুলি। সেখানে জানাজার পর কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
তায়িমের বাবা বলেন, ছেলের বন্ধু রাহাত, শাহরিয়ারসহ অন্যদের কাছে শুনতে পান, পরিদর্শক (অপারেশন) মামুন ও উপপরিদর্শক সাজ্জাদ গুলি করেছেন। ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে পরিদর্শক জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করেন। তিনি বলেন, সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলির চিহ্ন না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন উপপরিদর্শক শাহদাত। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লেখার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহদাত বলেন, এটা ওপরের আদেশ। গুলির কথা লিখতে পারবেন না। এই বলে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে তাঁকে স্বাক্ষর করতে বলেন। তিনি চিন্তায় পড়ে যান। ছেলে মারা গেছে এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কাও আছে। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে। এই চিন্তা করে তিনি সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
ময়নাল হোসেন আরও বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশে যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার, ডিসি ইকবাল, এডিসি শামীম, এডিসি মাসুদ, এসি নাহিদ, ওসি আবুল হাসান যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অবস্থান করছিলেন। ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন, ওসি (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদ তাঁর ছেলেকে নির্মমভাবে গুলি করলে বিনা চিকিৎসায় সে মারা যায়। সুরতহাল প্রস্তুতকারী এসআই শাহদাত ছেলের মৃত্যুর দায় অন্য কারও ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাই তিনি সবার সর্বোচ্চ শাস্তি চান।